গাইবান্ধায় এলজিইডির আওতাধীন ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুস্ক মৌসুমে এসব সড়কে উড়ে ধুলোর ঝড়, আর বর্ষাকালে হাঁটুসমান কাঁদায় পরিণত হচ্ছে। ফলে দুই মৌসুমেই চরম ভোগান্তিতে পড়ছে পথচারীসহ স্থানীয়রা। চলাচল সচল রাখতে প্রতিবছরই নিজেদের উদ্যোগে সড়কগুলো মেরামত করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দফায় দফায় অনুরোধ জানিয়েও কোনো সুফল মেলেনি। দেশ স্বাধীনের পর কয়েক দফায় ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু সড়ক প্রশ্নে ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি এসব এলাকার মানুষের। গাইবান্ধা স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানা যায়, ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সাত উপজেলায় এ দপ্তরের আওতায় ৫ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার মোট সড়কের মধ্যে এইচবিএস (কার্পেটিং), ডব্লিবিএম (খোয়া), বিএফএস (সলিং), এইচবিবি (ডিজাইন), সিসি/আর সিসিসহ (ঢালাই) পাকা রাস্তার পরিমাণ ১ হাজার ৯৯৮ কিলোমিটার। এছাড়া কাঁচা রাস্তার পরিমাণ ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার। এর মধ্যে সদর উপজেলায় মোট ১ হাজার ২৪৬.০৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যো কাঁচা রাস্তা ৯৩১.২৮ কিলোমিটার। এছাড়া সুন্দরগঞ্জে ৮৯৯.৭২ কিলোমিটার মধ্যে কাঁচা ৫৮৪.৭২ কিলোমিটার, সাদুল্লাপুরে ৬৫৩.১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৪২২.৭৩ কিলোমিটার, পলাশবাড়িতে ৮২৩.২৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৬৩৭.৮৫ কিলোমিটার, গোবিন্দগঞ্জে ১ হাজার ২৪৬.০৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৬৮৯.১১ কিলোমিটার, সাঘাটায় ৬২১.৬৩ কিলোমিটারের মধ্যে ৩০৮ কিলোমিটার এবং ফুলছড়ি উপজেলায় মোট ৩৫৯.৮৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা রাস্তা রয়েছে ২৭৭.৭৩ কিলোমিটার। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ২০২২ সালের শেষের দিকে জেলার ১ হাজার ৩১৩টি সড়ক নতুন করে আইডি অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে দপ্তরটি। আইডি অন্তর্ভুক্ত করণের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জেলার ১ হাজার ৩১৩টি সড়ক মধ্যে বিশেষ সুপারিশে সুন্দরগঞ্জে ৮ কিলোমিটার ও সাদুল্লাপুরে ৪ কিলোমিটারসহ মোট ১২ কিলোমিটার সড়কের ইতোমধ্যে আইডিভুক্ত হয়েছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের এসকেএসইন (এসকেএস মোড়) হতে রাধাকৃষ্ণপুর কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রাস্তা। এছাড়া ওই রাস্তাটির পশ্চিমে রাধাকৃষ্ণপুর জামে মসজিদ থেকে পশ্চিম-দক্ষিণের অপর প্রান্তে রয়েছে হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অপরদিকে বোয়ালীর সীমান্ত মোড় থেকে রামচন্দ্রপুরের গোপালপুরগামী সড়কটিও অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং বোয়ালী ইউনিয়নে তিনগাছতল এলাকার আয়ান মিয়ার (বর্তমানে বন্ধ) ইটভাটা থেকে পুরাতন বোর্ডবাজারগামী আরেকটি রাস্তা রয়েছে। অন্যদিকে, একই উপজেলার বাদিয়াখালি ইউনিয়নের গোয়াইলবাড়ি (আমতলী) থেকে পলাশবাড়ি উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের কুমেদপুর বাজার পর্যন্ত দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়কের অবস্থাও খারাপ। সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তাগুলোর বেহাল দশা। এর মধ্যে এসকেএসইনের (এসকেএস মোড়) আব্দুল জলিলের বাড়ির সামনে থেকে পশ্চিম রাধাকৃষ্ণপুর বায়তুল মামুর জামে মসজিদ পর্যন্ত এক কিলোমিটার অংশে রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এলাকাবাসীর উদ্যোগে রাস্তা মেরামতে ব্যবহার করা ভাঙা খোয়া-ইটগুলো বৃষ্টির কারণে মাটি ধুয়ে গিয়ে উঁচু-নিচু অবস্থায় রয়েছে। যা পথচারীদের জন্য বিশেষ করে হেঁটে চলা পথচারীদের জন্য দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এসকেএস মোড় থেকে পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুর পর্যন্ত রাস্তা সংলগ্ন অন্তত ৬ টি পুকুরে রাস্তার অর্ধেক অংশ ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া আব্দুল কাফী শেখের বাড়ির সামনে তারা মহুরির পুকুরে গাইড ওয়াল থাকা সত্ত্বেও সেখানে অর্ধেক রাস্তা ভেঙে গেছে পুকুরে। এছাড়া শাহারুল আলমের বাড়ির সামনে আব্দুল কাফি শেখের পুকুরে ভেঙে গেছে রাস্তার অর্ধেক অংশ। অপরদিকে, বাদিয়াখালির গোয়াইলবাড়ি থেকে পলাশবাড়ির মনোহরপুর ইউনিয়নের কুমেদপুর বাজার পর্যন্ত দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। এই দুই কিলোটার কাঁচা রাস্তার বেশ কয়েকটি স্থানে হাঁটু সমান কাদায় পরিণত হয়েছে। যা সাভাবিক চলাচলে ব্যঘাত সৃষ্টি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে স্থানীয়রা। বোয়ালী ইউনিয়নের রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের স্থানীয়রা ন, এই রাস্তাটি শহরের সাথে সহজে যোগাযোগের একমাত্র পথ। এই রাস্তা দিয়ে দুটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন চলাচল করেন। এই এলাকা হতে জেলা শহর মাত্র ৩ কিলোমিটার। আর ১ কিলোমিটার পরেই পৌরসভা। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পরেও রাস্তাটি পাকা করণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে দুর্ভোগ কমাতে প্রত্যেক বছরে তারা চাঁদা তুলে ভাঙা ইট, বালি, সুরকি, খোয়া ও রাবিশ ফেলে মেরামতের চেষ্টা করে। স্থানীয় কলেজ শিক্ষক আমিনুল ইসলাম কামাল বলেন, কেবল রাস্তাটি আমাদের পিছিয়ে রেখেছে। আধুনিক যুগে এসেও আমরা সনাতনিদের মতো বসবাস করছি। শহরতলীর একটি সড়ক এখনও কাঁচা রয়েছে। প্রত্যেক বছর এলাকাবাসী চাঁদা তুলে রাস্তাটি মেরামত করে চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত পাকা করণের দাবি জানান তিনি। হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, এই রাস্তায় বর্ষাকালে কোনো যানবাহনই যেতে চায় না। শুস্ক মৌসুমে খানাখন্দের কারণে চালকরা আসতে চায় না। বর্ষায় কাদা আর শুস্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে রাস্তাটি। এমন করুণ অবস্থায় রাস্তাটি পাকাকরণ অত্যন্ত জরুরি। কলেজ শিক্ষার্থী পারভেজ বলেন, আমাদের এলাকার কোনো মানুষকে অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি হলেও ভাঙা, মাটির রাস্তার কারণে সহজে কোনো যানবাহন পাওয়া যায় না। বিশেষ করে কোনো প্রসূতিকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি হলে চরম বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়া বর্ষায় কাদায় পিছলে পড়ে কাপড় নষ্ট হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। জুতা হাতে নিয়ে চলতে হয় পথচারীদের। গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক স¤পাদক রজতকান্তি বর্মন বলেন, রাস্তা পাকা করণে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানকে প্রথম ভূমিকা রাখতে হয়। এতো দিনেও এই রাস্তা পাকা না হওয়ার পিছনে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানদেরকে দায়ী করেন তিনি। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে রাস্তাগুলো পাকা করা অত্যন্ত জরুরি। বাদিয়াখালীর গোয়াইলবাড়ি এলাকার আতিকুর রহমান আতিক বলেন, কুমেদপুর বাজার থেকে আমতলি পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তা। এই রাস্তা যানবাহনসহ অন্তত প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ মানুষ চলাচল করে। বর্ষার কারণে খানাখন্দে ভড়ে আছে সড়কটি, যা জনসাধারণের জন্য চরম ভোগান্তি। সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, তিনগাছতলা থেকে পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুরগামী রাস্তাটি বোয়ালী ইউনিয়নের অতি পুরাতন এবং জনগুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তা। রাস্তাটি পাকাকরণ অতি জরুরি। রাস্তা পাকাকরণে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। গাইবান্ধার স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ বলেন, নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে আইডিভুক্ত রাস্তাগুলো পাকাকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
নেওয়া হবে।