★ মোজাফফরের ফেসবুক ও ই-মেইলেই লুকিয়ে আছে রহস্য
★ আইপি অ্যাড্রেস আর ডিলিট করা মেসেজের তথ্যের অপেক্ষায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা
“সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফরের ব্যবহৃত ফেসবুক ও ইমেইলের মেসেজগুলো সব ডিলিট করে ফেলেছেন। এটা একটা খুবই রহস্যময় ব্যাপার। ওনার সঙ্গে মেসেঞ্জারে আসলে কাদের সঙ্গে কথোপকথন বা যোগাযোগ ছিল সেই তথ্যও পেয়েছি”
— তানভীর হাসান জোহা, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ
“ডিজিটাল ফরেনসিক হলো বর্তমান সময়ে অপরাধ শনাক্তকরণে এবং প্রমাণে সবচেয়ে আধুনিক টুলস। এর মাধ্যমে এক্সপার্ট অপিনিয়ন এনে ডিজিটাল ফরেনসিক করে দ্রুত অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় বা বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব”
— মো. সরওয়ার, ডিএমপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফরের ফেসবুক আর ই-মেইলের ডিজিটাল জট খুলে তদন্তকারীরা আবিষ্কার করেছেন এক নতুন সমীকরণ। এতে আলোচিত এই হত্যা মামলার নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন হতে পারে খুব শিগগিরই। ফেসবুকের কাছ থেকে কিছু আইপি অ্যাড্রেস আর ডিলিট করা মেসেজের তথ্য পেলেই পরিষ্কার হবে অনেককিছু। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজাফফরের ব্যবহৃত ফেসবুক ও ই-মেইল থেকে অনেক মেসেজ ডিলিট করা হয়েছে। এটা খুবই রহস্যজনক। তবে এর ডিভাইসগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অনেক রহস্য। ওই সময় কার কার সঙ্গে কথোপকথন হয়েছে, কাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, সেই তথ্যও পেয়েছি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরাই এ রহস্যের জট খুলবেন। এদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল ফরেনসিক হলো বর্তমান সময়ে অপরাধ শনাক্তকরণে এবং প্রমাণে সবচেয়ে আধুনিক টুলস। এর মাধ্যমে এক্সপার্ট অপিনিয়ন এনে ডিজিটাল ফরেনসিক করে দ্রুত অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় বা বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীরাও অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত ঘটনায় প্রাণ হারান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। নির্মম ও নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর মামলার ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও অবিশ্বাস্য মোড় উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। নতুন এক সমীকরণের পথে এগোচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে! তদন্ত সংশ্লিষ্টরাও নানা বিষয়কে সামনে রেখে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। প্রায় সাড়ে চার দশক আত্মগোপনে থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাজধানীর বনানী থেকে গ্রেপ্তার হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন। তাকে গ্রেপ্তারের পর কেবল অতীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তেও বেরিয়ে আসছে এক গভীর ষড়যন্ত্রের চিত্র। তদন্তকারীদের হাতে আসা মোজাফফরের একটি ফেইসবুক আইডি ও ই-মেইল ফরেনসিক বিশ্লেষণ করতেই বেরিয়ে এসেছে পিলে চমকানোর মতো ভয়ঙ্কর সব তথ্য।
রাজনৈতিক-সামাজিকসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ৫ আগস্টের গণ-অভুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়গুলোতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর কার কার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন? কেনই-বা তার ফেইসবুক চ্যাটবক্সে ঘুরেফিরে আসছিলো ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি ব্যবহৃত আইডিগুলো? দীর্ঘদিন কেন স্পর্শকারতর এ বিষয়টি সামনে আনা হয়নি?। এতে কার গাফিলতি ছিল?
ইতোমধ্যেই তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ঘটনার রহস্য খুঁজতে গিয়ে জানতে পারে, ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্টে মোজাফফরের ফেসবুক আইডি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। একটি টাইপ কোডেড আইডির মাধ্যমে মোজাফফর এমন কিছু প্রোফাইলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন, যেগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়সহ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ছবি ব্যবহার করা হতো। তবে সেই প্রোফাইলে ব্যবহৃত ছবি আদৌ সত্য নাকি ফেক, তা নিয়েও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলছে। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশকিছু তথ্য ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই চলছে। ওইসব প্রতিবেদন হাতে পেলেই খুব শিগগিরই সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্তে শিগগিরই নতুন গতি ফিরে আসবে।
ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার এক হত্যাকাণ্ডের রহস্য যখন ৪৫ বছর ধরে ধামাচাপা ছিল, তখন সিলিকন ভ্যালির সার্ভারে জমে থাকা কয়েকটি ‘আইপি ঠিকানা’ ও ‘মুছে ফেলা বার্তা’ হয়তো খুলে দিতে পারে শেখ হাসিনা সরকারের আমল এবং জিয়া হত্যা, উভয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোপন দরজাটি। টেক জায়ান্ট মেটার কাছ থেকে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আসা সেই তথ্যের অপেক্ষায় এখন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ও বিএনপি নেতৃবৃন্দসহ দেশের জনগণ ।
এদিকে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেক অথবা রিয়েল আইডির সঙ্গে ওনার ফেসবুকের কমিউনিকেশন আমরা পেয়েছি। একটা ক্লাসিফাইড হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্রে উনি নিশ্চয়ই কোনো ফেক আইডির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন না। তো আমরা ধরেই নিচ্ছি এটা রিয়েল আইডি। এসব বিষয়ে আমরা অধিকতর তদন্ত করবো। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, মোজাফফরের একটিমাত্র ই-মেইল আইডি দিয়ে অন্তত চারটি ভিন্ন ডিভাইসে লগইন করা হয়েছিল। এই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থেকেই পরিষ্কার হতে পারে দীর্ঘ আত্মগোপনকালে তিনি কখন, কীভাবে দেশে ফেরেন এবং ছদ্মবেশে কী উদ্দেশ্যে আর কতগুলো ভুয়া আইডি ব্যবহার করছিলেন।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, ব্যবহৃত ফেসবুক ও ই-মেইল আইডির মেসেজগুলো সব ডিলিট করে ফেলেছেন মোজাফফর। এটা খুবই রহস্যময় ব্যাপার। ফেক আইডির সঙ্গে যোগাযোগ হলেও-বা উনি ডিলিট করবেন কেন? আমরা ওই আইডির সঙ্গে যোগাযোগটা জুলাইয়ের পর পেয়েছি। সেক্ষেতে উনি জুলাই-আগস্টের পর দেশে ঢুকেছেন কি না, ওই ডিভাইস অ্যাকটিভ হয়েছে জুলাই-আগস্টের পর। ওনার সঙ্গে মেসেঞ্জারে আসলে আওয়ামী সমর্থিত বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনও সবকিছুই পর্যালোচনায় রয়েছে। এটি পরিস্কার হতে আরও কিছু সময় লাগবে।
মেজর মোজাফফরের এই ডিজিটাল যোগাযোগ জিয়াউর রহমান হত্যার পুরনো নথি ও পেছনের চক্রান্তকারীদের ওপর এক নতুন আলোকপাত করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি বড় প্রশ্ন, জিয়া হত্যার পর নেপথ্যের সুবিধাভোগী বা মাস্টারমাইন্ড কারা ছিলো এবং সেই পরিকল্পনার রেশ ধরে মোজাফফরদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়েছিলো কি-না? এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ডিএমপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, ডিজিটাল ফরেনসিক হলো বর্তমান সময়ে অপরাধ শনাক্তকরণে এবং প্রমাণে সবচেয়ে আধুনিক টুলস। এক্সপার্ট অপিনিয়ন দেয়ার ক্ষমতা আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কয়েকটি সংস্থার আছে। ওইসব সংস্থা থেকে এক্সপার্ট অপিনিয়ন এনে ডিজিটাল ফরেনসিক করে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যদি মামলাগুলো পরিচালনা করা হয়, তাহলে অপরাধীরা দ্রুত শনাক্ত হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীরা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকবে।