রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে প্রাণঘাতী হাম ও হামের উপসর্গ। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নানামুখী উদ্যোগ নিলেও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে এ রোগ! সহসাই পিছু ছাড়ছে না প্রাণঘাতী হাম ও হামের উপসর্গ। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণ হারাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। গত একদিনে হামের উপসর্গে কেড়ে নিয়েছে ৫ শিশুর প্রাণ। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে আরও ১ হাজার ২৩২ জনের শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিষেশজ্ঞরা বলছেন, প্রাণঘাতী হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার বিকল্প কিছুই নেই। অভিভাবকদের নিয়মিত শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরও দায়িত্বশীল হয়ে তৃণমূলেও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের জোর তৎপরতা চালাতে হবে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নির্মূলে টিকাদান কর্মসূচী ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ উদ্যোগ যথাযথ কার্যকর রাখতে বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শত শত কোমলমতি শিশু। এদের বয়স ২ মাস থেকে প্রায় ৫ বছর। নিজের সন্তানকে এ রোগ থেকে বাঁচাতে দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুঁটছেন অভিভাবকরা। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে জরুরি প্রয়োজনীয় সেবাও গ্রহণ করছে আক্রান্ত শিশুরা।
হামে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা নেই। ঢাকা মেডিকেলের শিশু বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনই নানা রোগে আক্রান্ত শত শত শিশু ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগে ভিড় করছে। অনেক অভিভাবক চিকিৎসকদের নির্ধারিত কক্ষের বাইরে রোগাক্রান্ত শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কক্ষের ভেতরে শিশুদের আর্তনাদ। পরম আদরে কান্নারত শিশুটিকে বুকে আগলে রেখে কোমলস্পর্শে কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন অনেক মায়েরা। সেবা নিতে আসা পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারের বাসিন্দা গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার বলেন, আমার ছেলের বয়স প্রায় আড়াই বছর। কিছুদিন ধরে আমার ছেলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘামাচির মত লালচে ফোসকা উঠেছে এবং জ¦রও রয়েছে। স্থানীয় ফার্মেসীতে দেখিয়ে ওষুধ নিয়েছি, কাজ হয়নি। তাই ওই ফার্মাসিস্ট ও প্রতিবেশীদের পরামর্শে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত কিনা, তা নিশ্চিতে ঢাকা মেডিকেলের শিশু বহির্বিভাগের এক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছি। চিকিৎসক জরুরি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে কিছু ওষুধপত্র লিখে একটি প্রেসক্রিপশন হাতে তুলে দেন। এরপর বলেছেন, পরীক্ষার রিপোর্ট তাকে দেখাতে। এছাড়া ওষুধগুলো নিয়মিতভাবে সেবন করিয়ে একসপ্তাহ পর আবার দেখা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কি সমস্যা তা চিকিৎসক তাকে জানায়নি। একই কথা জানালেন অনেক অভিভাবক।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগে কর্তব্যরত কয়েকজন চিকিৎসক ও সিনিয়র নার্সরা জানান, হাসপাতালে আগত শিশুদের জরুরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগের ধরণ দেখে রক্তসহ অন্যান্য বিষয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা সেবা প্রদানে তাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। হাম ও হামের উপসর্গ এমনকি ডেঙ্গু বা চিকনগুনিয়াসহ অন্যান্য রোগ নির্ণয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই শিশু রোগীকে জরুরি প্রয়োজনে ভর্তি করা হচ্ছে, আবার প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রম, পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক রোগতাত্ত্বিক নজরদারির সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। হাম ও হামের উপসর্গ বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিরোধ কার্যক্রমে কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকে চিকিৎসার মূল কেন্দ্রে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্মুখসারির স্বাস্থ্যসেবাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। চিকিৎসকদের মতে, হামের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হওয়া। পরে কানের পেছন থেকে শুরু করে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। রোগ জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব কিংবা কানের সংক্রমণ হতে পারে। শ্বাসকষ্টকে বিপজ্জনক লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশের ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটা। তৎকালীন সরকারের সময়ে লকডাউন, সরবরাহ সংকট এবং টিকা নিয়ে দ্বিধার কারণে সে সময় অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়।
এদিকে, সোমবার (২৪ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ২৩২ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে শুধু ঢাকা বিভাগেই ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে হামের উপসর্গে একজন করে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৯৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৮৩৯ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ১ হাজার ১৪৯ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৫২ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ১৮ হাজার ৪৮৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৯২১ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নবজাতক ও শিশু-কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বেগম বলেন, আমরা এখনও করোনা মহামারিকালীন সেই ঘাটতির ফল ভোগ করছি। এমনকি টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সের চেয়ে ছোট শিশুদের মধ্যেও এখন হাম ও হামের উপসর্গের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এই চিকিৎসক সতর্ক করে বলেন, একজন আক্রান্ত শিশু সর্বোচ্চ ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। তিনি বলেন, প্রাণঘাতী হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার বিকল্প কিছুই নেই। অভিভাবকদের নিয়মিত শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরও দায়িত্বশীল হয়ে তৃণমূলেও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের জোর তৎপরতা চালাতে হবে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নির্মূলে টিকাদান কর্মসূচী ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ উদ্যোগ যথাযথ কার্যকর রাখতে বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।