শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা গ্রহণের জন্য সন্তানদের শিক্ষার ভিত্তি বা হাতে খড়ি দেওয়া হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেই প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে তাহলে কোমলমতি সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সেটা আর বুঝতে বাকী থাকে না। রংপুর জেলার আট উপজেলার ১ হাজার ৪৫৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৬৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে একদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার আট উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে কাউনিয়া উপজেলার ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০টি, গঙ্গাচড়া উপজেলার ১৭৮টির মধ্যে ৬০টি, তারাগঞ্জ উপজেলার ৭৫টির মধ্যে ৫৬টি, পীরগঞ্জ উপজেলার ২৩৬টির মধ্যে ১২৫টি, পীরগাছা উপজেলার ১৭৮টির মধ্যে ৯৪টি, বদরগঞ্জ উপজেলার ১৭৬টির মধ্যে ১১০টি, মিঠাপুকুর উপজেলার ২৭৫টির মধ্যে ১৪৬টি ও রংপুর সদর উপজেলার ২২২টির মধ্যে ২৮টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পীরগাছা, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলার একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের জ্যেষ্ঠ দাবি করে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির দাবিতে মামলা করেছিলেন। এসব মামলার কারণে কয়েক বছর ধরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আটকে ছিল। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তির নেতৃত্ব অন্য শিক্ষকগণ সহজভাবে গ্রহণ করছেন না। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং দাপ্তরিক কাজেও নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পাঠদানেও প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানিয়েছেন। মিঠাপুকুরের শিববাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, ২০২৫ সাল থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। আনিসুর রহমান বলেন, সহকারী শিক্ষক হিসেবে তাকে ক্লাসও নিতে হয়। আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় বিদ্যালয়ের বাইরেও থাকতে হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে ঠিকমতো ক্লাস নিতে না পারায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, সরকার ভারপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দিচ্ছে না, আবার নতুন প্রধান শিক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্তের দায়িত্বে থাককে অনেক সময় অন্য শিক্ষকরা নির্দেশনা মানতে গড়িমসি করেন। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান দরকার। মিঠাপুকুরের আমাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও কয়েক বছর ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলা বিদ্যালয়টিতে খাতাকলমে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শিক্ষক সংকটের কারণে চাইলেও ঠিকমতো ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীও কমে গেছে। এ সমস্যার জরুরি সমাধান প্রয়োজন। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির মিঠাপুকুর উপজেলা শাখার সভাপতি ও ইমাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে কোনো সার্কুলার নেই। এর মধ্যে অনেকে অবসরে যাওয়ায় শূন্য পদ আরও বেড়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহকারী শিক্ষকরা যথাযথ নির্দেশনা পাচ্ছেন না। রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ডেপুটেশনে দিয়ে আমরা কাজ চালাচ্ছি। তারপরও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা একদিকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে তাদের সহকারী শিক্ষকের পদটিও সংরক্ষিত রয়েছে। তারা মূলত সহকারী শিক্ষক। হিসাবের চেয়ে বাস্তবে আরও বেশি সংখ্যক প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ কারণে শিক্ষকদের একসঙ্গে একাধিক ক্লাস নিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা জ্যেষ্ঠতা নিয়ে মামলা করেছিলেন। মামলাটি দীর্ঘ সময় আদালতে ঝুলে ছিল। বর্তমান মন্ত্রী পদক্ষেপ নিয়ে মামলাটি দ্রুত নি®পত্তির উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। চলতি দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য তালিকা পিএসসিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এরপর আদেশ হবে। আশা করি, শিগগিরই কাজটি হবে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, মামলার কারণেই এত দিন প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। এ কারণে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া রংপুর জেলায় ৩৮৭ জন সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। আগামী ১ অক্টোবর তারা যোগদান করলে শিক্ষক সংকট কিছুটা কমবে।