বহুল আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান (তনু) হত্যায় সন্দেহভাজন সাবেক সেনা সদস্য সার্জেন্ট মো. জাহিদুজ্জামান (৪৮) ও সাবেক সৈনিক মো. শাহীন আলমের (৩৭) বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। তনু হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অনুরোধে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি-ঢাকা) এ রেড নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলম বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। রেড নোটিশের বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানান। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলম দুজনই কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসের অদূরে একটি জঙ্গল থেকে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা ইয়ার আহম্মেদ কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ সময় সিআইডি এই মামলার তদন্ত করলেও কোনো সুরাহা করতে পারেনি। পরে ২০২০ সালে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পিবিআইকে। পুলিশ সদরের নির্দেশে ২০২০ সালের অক্টোবরে পিবিআই এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেয়। এর আগে মামলাটি একাধিক তদন্ত সংস্থার কাছে ছিল।
আলোচিত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানান, গত ২১ এপ্রিল আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে গত ৪ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। তবে এর দু’দিন পর ৬ আগস্ট তাকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। সেই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করায় পুলিশকে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন আদালত। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ আগস্ট পিবিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হাফিজুর রহমানকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল তিন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহীন আলমের ডিএনএ প্রোফাইল ক্রসম্যাচ (মেলানোর) করার জন্য আদালতের অনুমতি চান তারিকুল। আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করেন। চলতি বছরের জুনে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার একটি আদালত জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের অংশ হিসেবে তারা জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তবে দুজনই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলছেন বলে মনে করছেন তারা। আদালতের আদেশের পর পিবিআই এনসিবি-ঢাকায় একটি অনুরোধ পাঠায় এবং ওই দুজনকে শনাক্ত করতে ইন্টারপোলের সহায়তা চায়। বাংলাদেশের জমা দেওয়া তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে ইন্টারপোল দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি সোহাগী জাহান তনু। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছে একটি ঝোপের মধ্যে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ওই সময় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয় তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় পরদিন তনুর বাবা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তে একাধিক সংস্থা যুক্ত হওয়ার পর বর্তমানে পিবিআই আলোচিত এ মামলার তদন্ত করছে।