১২:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
অবৈধ সিট দখলের সংবাদ প্রকাশে ক্ষুব্ধ

চবি সাংবাদিককে পাহাড়ে নিয়ে হত্যার হুমকির অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে অবৈধভাবে সিট দখলের সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে হল থেকে টেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরা পাহাড়ে উঠিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চবি শাখা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সিফাতুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল স্টার নিউজ-এর চবি প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) সদস্য এম. মিজানুর রহমানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এই হুমকি দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, মো. সিফাতুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সংশ্লিষ্ট ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড ভুক্তভোগী সাংবাদিকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, যা এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

অডিও রেকর্ডে হুমকিদাতা নিজেকে ‘সালমান (আব্দুস সালাম সালমান)’ পরিচয় দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় সাংবাদিককে মারধরের হুমকি দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আপনি যে নিউজ করলেন, আপনাকে এটার অনুমতি দিলো কে?… একেবারে ভাইঙ্গা দিমু। ফরহাদ হল থেইকা টাইন্না নিয়া নীড়া পাহাড়ে টাইন্না উডামু। এমন কোনো (গালি) নাই যে আপনারে ঠেকাইবে।”

তবে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সালমান বলেন, “আমি হুমকি দেইনি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।” পরে তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন উল্লেখ করে কল কেটে দেন।

এরপর ওই রাতেই (২৬ জানুয়ারি) যে নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হয়েছিল, সেই নম্বরে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে কল রিসিভ করেন অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলাম। এ সময় তিনি বলেন, “আমি সাংবাদিকতা ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। আমারে সাংবাদিকতা শিখাইলে হবে না। তার (সালমানের) অনুমতি ছাড়া কীভাবে একটা নিউজ করে? ওর বিরুদ্ধে বারবার নিউজ হইছে। এখন ওর তো মাথা গরম হইয়া গেছে।”

সংবাদে কোনো ভুল তথ্য ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিউজটাতে মোটামুটি তথ্য গ্যাপ আছে। হলে বসে মদ্য পান করার কথা বলা হয়েছে, এগুলো ওরা কক্সবাজার গিয়ে একবার করছিল। ও মদ খায় না, শুধু সিগারেট খায়। তাও এখন হলে আর খায় না।”

ভুক্তভোগী সাংবাদিক এম. মিজানুর রহমান বলেন, “সালমান দীর্ঘদিন ধরে হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন। এর আগে হল প্রভোস্ট কর্তৃক তাকে একাধিকবার হলত্যাগের নোটিশ দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে, যার প্রমাণ আমার কাছে আছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এরপর সোমবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে সিফাত আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় আমাকে নীরা পাহাড়ে নিয়ে মারার হুমকি দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “সংবাদে অসত্য থাকলে প্রতিবাদ বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিককে এভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। আমি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”

ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, হলে অবৈধভাবে অবস্থান করা সালমান চবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক দিনাজপুর–২ আসনে বিএনপির আসনভিত্তিক সমন্বয় কমিটির সদস্য। হল প্রশাসন একাধিকবার হলত্যাগের নোটিশ দিলেও সালমান তা উপেক্ষা করেন। তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলাম সালমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সালমানকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের জেরে সিফাত নিজেই সালমান সেজে সাংবাদিককে ফোন করে হুমকি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে চবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্ত যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “এ বিষয়ে আমি এখনও অবগত নই। খোঁজ নিচ্ছি।”

চবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ শুভ্র বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ। গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হুমকিপ্রাপ্ত সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, “স্টার নিউজের চবি প্রতিনিধি মিজানুর রহমান লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে তদন্ত কমিটি গঠনের অনুরোধ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

অবৈধ সিট দখলের সংবাদ প্রকাশে ক্ষুব্ধ

চবি সাংবাদিককে পাহাড়ে নিয়ে হত্যার হুমকির অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে

আপডেট সময় : ০৭:১৯:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে অবৈধভাবে সিট দখলের সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে হল থেকে টেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরা পাহাড়ে উঠিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চবি শাখা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সিফাতুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল স্টার নিউজ-এর চবি প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) সদস্য এম. মিজানুর রহমানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এই হুমকি দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, মো. সিফাতুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সংশ্লিষ্ট ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড ভুক্তভোগী সাংবাদিকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, যা এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

অডিও রেকর্ডে হুমকিদাতা নিজেকে ‘সালমান (আব্দুস সালাম সালমান)’ পরিচয় দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় সাংবাদিককে মারধরের হুমকি দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আপনি যে নিউজ করলেন, আপনাকে এটার অনুমতি দিলো কে?… একেবারে ভাইঙ্গা দিমু। ফরহাদ হল থেইকা টাইন্না নিয়া নীড়া পাহাড়ে টাইন্না উডামু। এমন কোনো (গালি) নাই যে আপনারে ঠেকাইবে।”

তবে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সালমান বলেন, “আমি হুমকি দেইনি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।” পরে তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন উল্লেখ করে কল কেটে দেন।

এরপর ওই রাতেই (২৬ জানুয়ারি) যে নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হয়েছিল, সেই নম্বরে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে কল রিসিভ করেন অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলাম। এ সময় তিনি বলেন, “আমি সাংবাদিকতা ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। আমারে সাংবাদিকতা শিখাইলে হবে না। তার (সালমানের) অনুমতি ছাড়া কীভাবে একটা নিউজ করে? ওর বিরুদ্ধে বারবার নিউজ হইছে। এখন ওর তো মাথা গরম হইয়া গেছে।”

সংবাদে কোনো ভুল তথ্য ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিউজটাতে মোটামুটি তথ্য গ্যাপ আছে। হলে বসে মদ্য পান করার কথা বলা হয়েছে, এগুলো ওরা কক্সবাজার গিয়ে একবার করছিল। ও মদ খায় না, শুধু সিগারেট খায়। তাও এখন হলে আর খায় না।”

ভুক্তভোগী সাংবাদিক এম. মিজানুর রহমান বলেন, “সালমান দীর্ঘদিন ধরে হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন। এর আগে হল প্রভোস্ট কর্তৃক তাকে একাধিকবার হলত্যাগের নোটিশ দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে, যার প্রমাণ আমার কাছে আছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এরপর সোমবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে সিফাত আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় আমাকে নীরা পাহাড়ে নিয়ে মারার হুমকি দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “সংবাদে অসত্য থাকলে প্রতিবাদ বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিককে এভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। আমি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”

ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, হলে অবৈধভাবে অবস্থান করা সালমান চবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক দিনাজপুর–২ আসনে বিএনপির আসনভিত্তিক সমন্বয় কমিটির সদস্য। হল প্রশাসন একাধিকবার হলত্যাগের নোটিশ দিলেও সালমান তা উপেক্ষা করেন। তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলাম সালমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সালমানকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের জেরে সিফাত নিজেই সালমান সেজে সাংবাদিককে ফোন করে হুমকি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে চবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্ত যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “এ বিষয়ে আমি এখনও অবগত নই। খোঁজ নিচ্ছি।”

চবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ শুভ্র বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ। গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হুমকিপ্রাপ্ত সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, “স্টার নিউজের চবি প্রতিনিধি মিজানুর রহমান লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে তদন্ত কমিটি গঠনের অনুরোধ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এমআর/সবা