* চিকিৎসা সেবা পেতে হাসপাতালগুলোতে ভিড়
* শিশুসহ গড়ে প্রতিদিন সেবা নিচ্ছেন ১৫০০ রোগী
* ঘন কুয়াশায় জনজীবনে স্থবিরতা ও দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা
‘শীতকালের বেশিরভাগ রোগই ভাইরাসজনিত। এতে বেশিরভাগই আক্রান্ত হচ্ছে শিশু। শিশুর জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি’
– ডা. প্রবীর কুমার সরকার, অধ্যাপক, শিশু শ্বাসতন্ত্র (পালমোনোলজি) বিভাগ, শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট
‘কুয়াশার প্রভাবে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসার পাশাপাশি আকাশ, সড়ক ও নৌ-পথে মারাত্মক দুর্ঘটনা বাড়ার ঝুঁকি ও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং সবাইকে সাবধানে চলাচল করতে হবে’
– আবহাওয়া অধিদপ্তর
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জেঁকে বসেছে শীতের আমেজ। তীব্র শীতজনিত কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ¦র-সর্দি ও শ্বাসকষ্টসহ ভাইরাসজনিত রোগবালাই। প্রতিদিনই চিকিৎসা সেবা পেতে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন নানা বয়সের রোগীরা। বিশেষ করে শীতের কারণে শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। রোগীর চাপে অধিকাংশ হাসপাতালেই ফাঁকা নেই শয্যা। অনেকেই বিছানা না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে-বসে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গড়ে প্রতিদিন সেবা নিচ্ছেন শিশুসহ ১৫০০ রোগী। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে দেশের অনেক এলাকায় দিনের বেলাতেও শীতের তীব্র অনুভূতি অনুভূত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘন কুয়াশার ফলে বিমান উঠা-নামা, দুরপাল্লার বাস ও নৌ রুটে নৌযান চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসার পাশাপাশি সড়ক ও নৌ-পথে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু শ্বাসতন্ত্র (পালমোনোলজি) বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলছেন, শীতকালের বেশিরভাগ রোগই ভাইরাসজনিত। এতে বেশিরভাগই আক্রান্ত হচ্ছে শিশু। শিশুর জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশ আংশিক মেঘলা এবং আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় এই কুয়াশা দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক পথ, অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল এবং বিমান ওঠানামায় সাময়িকভাবে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মহাসড়কে দৃষ্টিসীমা কমে আসায় চালকদের সাবধানে যানবাহন চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আজ রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে হাওর-অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের নিকলিতে, ৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়াবিদদের মতে, ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা নামলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে এখন মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল পর্যটন নগরী টেকনাফে, ২৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পরবর্তী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, কুয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতির কারণে রোদের দেখা মেলা কঠিন হতে পারে, যার ফলে শীতের অনুভূতি এখনই কমছে না। রাতের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকলেও কুয়াশার প্রভাবে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসার পাশাপাশি আকাশ পথে বিমান উঠা-নামায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। একই সঙ্গে সড়ক ও নৌ-পথে দুরপাল্লার বাস-ট্রেন ও নৌযানে দুর্ঘটনায় হতাহত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দুর্ঘটনা এড়াতে তীব্র শীতজনিত কারণে ঘন কুয়াশা চলাকালে সব ধরনের যানবাহন ও যাত্রী সাধারণকে সাবধানে চলাচল করতে হবে।

এদিকে, শীত মৌসুম শুরু হতেই ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে নবজাতক ও শিশুরা। শুষ্ক আবহাওয়া, বাড়তে থাকা বায়ুদূষণ ও ধুলাবালির কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ মৌসুমি নানা অসুখে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকদের মতে, এ সময় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং অ্যালার্জিজনিত জটিলতা এখন শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালটির শিশু বিভাগের বিভিন্ন ইউনিট ও ওয়ার্ডে একটি শয্যাও খালি নেই। প্রতিদিন বহির্বিভাগে শত শত শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে। চিকিৎসকরা জানান, প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেক শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক মৌসুমি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
শিশু হাসপাতালটির তথ্যমতে, ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২৬১ জন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। একই সময়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫৭ জন শিশু। এছাড়া সাধারণ সর্দি-কাশিতে ৮১৬ জন এবং হাঁপানিতে ১২১ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতালটিতে শুধু ২৩ ডিসেম্বর একদিনেই বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ২৩৪ জন শিশু। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পেয়েছে ২৬০ জন, মেডিসিন বিভাগে ৭৯২ জন এবং সার্জারি বিভাগে ১৮২ জন। ২৪ ঘণ্টায় সর্দি-কাশিতে ২৫৩ জন, নিউমোনিয়ায় ৪৬ জন, হাঁপানিতে ২৩ জন, স্ক্যাবিসে ১৫৩ জন, অন্যান্য চর্মরোগে ২২৩ জন এবং ডায়রিয়ায় ৫৪ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে শিশু রোগীদের কষ্ট স্পষ্ট। তিন মাস বয়সী সুপ্তা জন্মের পর থেকেই ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছে। গত অক্টোবরে সে টানা প্রায় ১৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ছাড়পত্র পাওয়ার তিন দিনের মধ্যেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং পুনরায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। দ্বিতীয়বার ভর্তির সময় তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তৃতীয় দফায় ভর্তি হয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ দিন হাসপাতালে রয়েছে সুপ্তা, এর মধ্যে কয়েক দিন তাকে আইসিইউতেও থাকতে হয়েছে।
নবজাতকরাও ডায়রিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পাঁচ দিনের শিশু আনাফকে সিজারিয়ান ডেলিভারির পর একটি শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার মা জানান, জন্মের পর থেকেই শিশুটি ডায়রিয়ায় ভুগছিল। তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসার পর এখন তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং শিগগিরই ছাড়পত্র দেওয়ার কথা রয়েছে। একইভাবে এ বছর বয়সী নুসাইবাকেও তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে। তার মা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শিশুটি সর্দি ও নাক দিয়ে পানি ঝরার সমস্যায় ভুগছিল। খেতে চাইছিল না, সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছিল এবং শ্বাসকষ্টও দেখা দেয়। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাকে নেবুলাইজেশন দেওয়া হচ্ছে। শুরুতে নল দিয়ে খাবার দেওয়া হলেও এখন অবস্থার উন্নতি হওয়ায় মুখে খাবার নিতে পারছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১৩ সেকেন্ডে একজন মানুষ নিউমোনিয়ায় মারা যান এবং প্রতি ৪৩ সেকেন্ডে মারা যায় একটি শিশু। শীতকালে শিশুদের অপ্রয়োজনে বাইরে নেওয়া থেকে বিরত থাকা, ধুলাবালি ও সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু শ্বাসতন্ত্র (পালমোনোলজি) বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, শীতকালে শিশুদের মধ্যে ফ্লু, সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এ সময়ে অভিভাবকদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিয়মিত গোসল প্রয়োজন হলেও অপরিণত নবজাতকদের ক্ষেত্রে দেরিতে ও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোসল করানো উচিত, যাতে ঠান্ডা না লাগে। নবজাতকদের সব সময় গরম রাখতে হবে এবং যেসব শিশু খেতে পারে, তাদের বাইরে খোলা খাবার বা খোলা জুস দেওয়া যাবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক অভিভাবক শিশুর নাক দিয়ে পানি ঝরার সময়ও প্যাকেটজাত পানীয় দেন। এতে অসুখ আরও বাড়তে পারে। এ জন্য চিকিৎসকরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছেন।

ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, শীতকালের বেশিরভাগ রোগই ভাইরাসজনিত। শিশুর জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।























