০৮:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৩৭ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রস্তুত

২০১৯ সালে ১০ হাজার ৭৮৯ স্বাধীনতাবিরোধীর তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকাটি প্রকাশের পর নানা মহলে বিতর্ক শুরু হলে তা স্থগিত করে দেয় মন্ত্রণালয়। 

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ শান্তিপ্রিয় অসহায় মানুষকে হত্যা, নির্যাতন, বসতবাড়ি ত্যাগে বাধ্য করা এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছে, এমন ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তারা দেশে রাজাকার হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী বাঙালির কাছে আজও চরম ঘৃণার পাত্র হয়ে আছে। বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী আলবদর বাহিনীর সদস্যদেরও পৃথক তালিকা করা হচ্ছে। মহান স্বাধীনতা দিবসের আগেই এবার ৩৭ হাজার রাজাকারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এর আগে ২০১৯ সালে প্রায় ১১ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকা প্রকাশের পর নানা মহলে বিতর্ক শুরু হলে পরে তা স্থগিতের ঘোষণা দেয় মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সূত্রে জানা যায়, সক্রিয়ভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করে, তাদের পৃথক তালিকা প্রণীত হয়েছে। এদের সংখ্যা ২৭ হাজার। এরা পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিয়েছে, তাদের ঘরবাড়ির ঠিকানা দিয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের স্থানীয় নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম দিয়ে বাড়িঘর চিনিয়ে সক্রিয় সহায়তা করে। থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্রলীগ নেতাদের বাড়ি চিনিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী লোকদের ঘরবাড়িতে নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের উল্লিখিত ব্যক্তিদের বাড়িতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। তাদের হত্যা, বাস্তুভিটাচ্যুত করেছে। নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পাশবিক নির্যাতনে সহযোগিতা করে এবং নিজেরা পাশবিক নির্যাতন করে। মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতাকর্মীরা রাজাকার বাহিনী সংগঠিত করে। প্রধানত জামায়াতে ইসলামী এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। সাংগঠনিকভাবে মুসলিম লীগের তেমন শক্তি ছিল না। তবে মুসলিম লীগের জেলা, থানা পর্যায়ের নেতারা শান্তি কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন। রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলতে মুসলিম লীগ ছিল জামায়াতের প্রধান সহযোগী। জানা যায়, সক্রিয় ভূমিকা পালনকারীদের পাশাপাশি পৃথক একটি তালিকা করা হয়েছে, যারা স্বতঃপ্রণোদিত বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক হিসেবে রাজাকার বাহিনীতে সম্পৃক্ত হননি। জীবন বাঁচাতে নিরুপায় হয়ে তারা রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। এদের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি এই তালিকা করেছে। ইউনিয়ন, উপজেলা থেকে প্রাপ্ত তালিকার ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকা প্রণীত হয়েছে। জেলা, উপজেলা প্রশাসনের রেকর্ড এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে এদের নাম পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, সমাজসেবী, রাজনৈতিক কর্মী, নেতা যারা এখনো বেঁচে আছেন, তাদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে নাম সংগ্রহ করা হয়। উপজেলা ও ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহি- নীর সহযোগীদের কাছ থেকেও তাদের সহযোগীদের নাম পাওয়া গেছে। জামুকা থেকে এসব নাম দুই দফা যাচাই করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণভাবে নির্দোষ, নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম এসেছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডারদের কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্য অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়। রাজাকারদের এই তালিকা প্রকাশ করা হবে এবারের স্বাধীনতা দিবসের আগেই। তবে তাদের শাস্তিবিধান করা হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে সরকারের হাতে থাকা নথির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর বেতনভোগী ১০ হাজার ৭৮৯ স্বাধীনতাবিরোধীর প্রথম তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই তালিকাটি প্রকাশের পর নানা মহল থেকে বিতর্ক উঠে। তখন মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ ৯ মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীর মধ্যে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হলো। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হেফাজতে থাকা দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি।’ তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কোনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না। তবে জাতি প্রত্যাশা করলে এবং সরকার মনে করলে গেজেট করবে। আমরা তালিকা প্রকাশ করলাম, আগে রি-অ্যাকশনটা দেখব, জাতি চাইলে এটা হবে।’ প্রায় এক দশক আগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর রাজাকারের তালিকা তৈরির দাবি জোরালো হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, রাজাকারের কোনো তালিকা সরকারের কাছে নেই। তবে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের খুলনায় আনসার হেডকোয়ার্টার্সে পাওয়া তালিকায় ৩০ হাজারের বেশি রাজাকারের তথ্য মিলেছিল। ওই তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে। এরপর গত ২৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহে কাজ শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের বেতনভোগী রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের জন্য চলতি বছর ২১ মে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। পরে ওই তালিকা করার জন্য আবার তাগিদ দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি শাজাহান খান সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘তালিকা হাতে আসা শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ১৬ ডিসেম্বর থেকে যতটুকু আসবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।’ এরই ধারাবাহিকতায় বিজয় দিবসের আগের দিন ৬৫৯ পৃষ্ঠার প্রথম তালিকা প্রকাশ করতে এসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। ‘তৎকালীন ১৯ জেলার রেকর্ড রুমে যেসব দালিলিক প্রমাণ ছিল, সেগুলো দিতে বলা হয়েছিল; আশানুরূপ তালিকা পাইনি। তাই জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেকর্ড পাঠানোর জন্য বলেছি।’ বিভিন্ন জেলার রেকর্ড রুম এবং ওই সময় বিজি প্রেসে ছাপানো তালিকাও সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করে ধাপে ধাপে আরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।’ এক প্রশ্নে মোজাম্মেল বলেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে এই তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বিচারের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তার বিশ্বাস। ‘তবে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তালিকা নয়। তালিকাভুক্ত হলে মামলা করা যাবে বা তালিকাভুক্ত না হলে মামলা করা যাবে না এমন নয়। বাদী অভিযোগ আনলে মামলা হবে।’ মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বেচ্ছায় যারা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তারাও স্বাধীনতাবিরোধী। তবে ওই তালিকা নিয়ে তখন নানা মহলে বিতর্ক শুরু হলে পরে তালিকাটি স্থগিত করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

৩৭ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রস্তুত

আপডেট সময় : ১০:২৫:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০২৪

২০১৯ সালে ১০ হাজার ৭৮৯ স্বাধীনতাবিরোধীর তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকাটি প্রকাশের পর নানা মহলে বিতর্ক শুরু হলে তা স্থগিত করে দেয় মন্ত্রণালয়। 

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ শান্তিপ্রিয় অসহায় মানুষকে হত্যা, নির্যাতন, বসতবাড়ি ত্যাগে বাধ্য করা এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছে, এমন ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তারা দেশে রাজাকার হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী বাঙালির কাছে আজও চরম ঘৃণার পাত্র হয়ে আছে। বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী আলবদর বাহিনীর সদস্যদেরও পৃথক তালিকা করা হচ্ছে। মহান স্বাধীনতা দিবসের আগেই এবার ৩৭ হাজার রাজাকারের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এর আগে ২০১৯ সালে প্রায় ১১ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকা প্রকাশের পর নানা মহলে বিতর্ক শুরু হলে পরে তা স্থগিতের ঘোষণা দেয় মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সূত্রে জানা যায়, সক্রিয়ভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করে, তাদের পৃথক তালিকা প্রণীত হয়েছে। এদের সংখ্যা ২৭ হাজার। এরা পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিয়েছে, তাদের ঘরবাড়ির ঠিকানা দিয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের স্থানীয় নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম দিয়ে বাড়িঘর চিনিয়ে সক্রিয় সহায়তা করে। থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্রলীগ নেতাদের বাড়ি চিনিয়ে সঙ্গে নিয়ে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী লোকদের ঘরবাড়িতে নিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের উল্লিখিত ব্যক্তিদের বাড়িতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। তাদের হত্যা, বাস্তুভিটাচ্যুত করেছে। নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পাশবিক নির্যাতনে সহযোগিতা করে এবং নিজেরা পাশবিক নির্যাতন করে। মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতাকর্মীরা রাজাকার বাহিনী সংগঠিত করে। প্রধানত জামায়াতে ইসলামী এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। সাংগঠনিকভাবে মুসলিম লীগের তেমন শক্তি ছিল না। তবে মুসলিম লীগের জেলা, থানা পর্যায়ের নেতারা শান্তি কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন। রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলতে মুসলিম লীগ ছিল জামায়াতের প্রধান সহযোগী। জানা যায়, সক্রিয় ভূমিকা পালনকারীদের পাশাপাশি পৃথক একটি তালিকা করা হয়েছে, যারা স্বতঃপ্রণোদিত বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক হিসেবে রাজাকার বাহিনীতে সম্পৃক্ত হননি। জীবন বাঁচাতে নিরুপায় হয়ে তারা রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। এদের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি এই তালিকা করেছে। ইউনিয়ন, উপজেলা থেকে প্রাপ্ত তালিকার ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকা প্রণীত হয়েছে। জেলা, উপজেলা প্রশাসনের রেকর্ড এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে এদের নাম পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, সমাজসেবী, রাজনৈতিক কর্মী, নেতা যারা এখনো বেঁচে আছেন, তাদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে নাম সংগ্রহ করা হয়। উপজেলা ও ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহি- নীর সহযোগীদের কাছ থেকেও তাদের সহযোগীদের নাম পাওয়া গেছে। জামুকা থেকে এসব নাম দুই দফা যাচাই করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণভাবে নির্দোষ, নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম এসেছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডারদের কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্য অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়। রাজাকারদের এই তালিকা প্রকাশ করা হবে এবারের স্বাধীনতা দিবসের আগেই। তবে তাদের শাস্তিবিধান করা হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে সরকারের হাতে থাকা নথির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর বেতনভোগী ১০ হাজার ৭৮৯ স্বাধীনতাবিরোধীর প্রথম তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ওই তালিকাটি প্রকাশের পর নানা মহল থেকে বিতর্ক উঠে। তখন মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ ৯ মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীর মধ্যে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হলো। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হেফাজতে থাকা দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি।’ তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কোনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না। তবে জাতি প্রত্যাশা করলে এবং সরকার মনে করলে গেজেট করবে। আমরা তালিকা প্রকাশ করলাম, আগে রি-অ্যাকশনটা দেখব, জাতি চাইলে এটা হবে।’ প্রায় এক দশক আগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর রাজাকারের তালিকা তৈরির দাবি জোরালো হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, রাজাকারের কোনো তালিকা সরকারের কাছে নেই। তবে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের খুলনায় আনসার হেডকোয়ার্টার্সে পাওয়া তালিকায় ৩০ হাজারের বেশি রাজাকারের তথ্য মিলেছিল। ওই তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে। এরপর গত ২৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহে কাজ শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের বেতনভোগী রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের জন্য চলতি বছর ২১ মে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। পরে ওই তালিকা করার জন্য আবার তাগিদ দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি শাজাহান খান সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘তালিকা হাতে আসা শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ১৬ ডিসেম্বর থেকে যতটুকু আসবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।’ এরই ধারাবাহিকতায় বিজয় দিবসের আগের দিন ৬৫৯ পৃষ্ঠার প্রথম তালিকা প্রকাশ করতে এসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। ‘তৎকালীন ১৯ জেলার রেকর্ড রুমে যেসব দালিলিক প্রমাণ ছিল, সেগুলো দিতে বলা হয়েছিল; আশানুরূপ তালিকা পাইনি। তাই জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেকর্ড পাঠানোর জন্য বলেছি।’ বিভিন্ন জেলার রেকর্ড রুম এবং ওই সময় বিজি প্রেসে ছাপানো তালিকাও সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করে ধাপে ধাপে আরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।’ এক প্রশ্নে মোজাম্মেল বলেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে এই তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বিচারের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তার বিশ্বাস। ‘তবে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তালিকা নয়। তালিকাভুক্ত হলে মামলা করা যাবে বা তালিকাভুক্ত না হলে মামলা করা যাবে না এমন নয়। বাদী অভিযোগ আনলে মামলা হবে।’ মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বেচ্ছায় যারা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তারাও স্বাধীনতাবিরোধী। তবে ওই তালিকা নিয়ে তখন নানা মহলে বিতর্ক শুরু হলে পরে তালিকাটি স্থগিত করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।