▶ বেসিক ব্যাংক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ তুলে নিচ্ছে
▶ আমানতকারী, স্টেকহোল্ডার, ব্যাংকার ও পরিচালকরা আতঙ্কে
একের পর এক ব্যাংক একীভূতের কারণে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সারাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা উত্তোলনের হিড়িক লক্ষ্য করা গেছে। আস্থা হারিয়ে হুড়োহুড়ি করে তুলছেন আমানতের টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতকারীদের টাকা যেন তছরুপ না হয় সেব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চয়ন করতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা দরকার। বেসিক ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহের কয়েকদিনে ব্যাংক থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বেসিক ব্যাংক একীভূত হতে চলেছে সিটি ব্যাংকের সঙ্গে। এমন খবর জানার পর থেকে আমানতকারীরা চিঠি দিয়ে আমানত তুলে নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন বলে জানান বেসিক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সম্প্রতি বেসিক ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে জমানো টাকা তোলার পরিমাণ বেড়েছে। এতে সংকটে পড়া ব্যাংক দুটির পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে। তবে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, মানুষ অনেক সময় পরিবর্তন পছন্দ করে না। তবে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি দুর্বল ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ ও পরিচালন ক্ষতির ব্যাপারে আর্থিকভাবে সহায়তা করে তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়া বা খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। সিটি ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংক এবং ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংকের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের একীভূত হওয়ার খবর প্রকাশের পর গত সপ্তাহে দুই ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকরা ভিড় জমাতে শুরু করেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় জানতে চেয়ে গত ১৮ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি দেয়। গত বছরের জুনে বেসিক ব্যাংকে আমানত ছিল ১৫ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেই পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আরেক চিঠিতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা চায় বেসিক ব্যাংককে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হোক।
বেসিক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মো. মোফাজ্জল বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান টাকা জমা দিতে বেসিক ব্যাংককে বেছে নিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকটি বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে যাওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের অর্থ তুলে নিচ্ছে। সূত্র থেকে জানা যায, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষ থেকে বিভাগীয় প্রধান (হিসাব ও অর্থ) স. ম. আব্দুল বারিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ জিয়াবুল হোসেন যৌথ স্বাক্ষরিত চিঠিতে এফডিআর সুদ-আসলসহ ১০ কোটি টাকা নগদায়নের জন্য আবেদন দিয়েছেন। ১৫ এপ্রিল বেসিক ব্যাংকের মিরপুর শাখার ব্যবস্থাপককে ওই আবেদনপত্র দেওয়া হয়। পত্রে বেসিক ব্যাংককে বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্তকে এফডিআর নগদায়নের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকরাও তাদের জমা অর্থ তুলে নিতে ভিড় করছে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান বলেন, হঠাৎ করে টাকা তোলার তাড়াহুড়ো ব্যাংকটিকে প্রচণ্ড চাপে ফেলেছে। তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন শাখায় গিয়ে আমানতকারীদের সঙ্গে কথা বলছি এবং টাকা উত্তোলন না করতে অনুরোধ করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তে আমানতকারী, স্টেকহোল্ডার, ব্যাংকার ও পরিচালকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে বিডিবিএল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিডিবিএলের খুলনা শাখা থেকে ২০ কোটি, মতিঝিল শাখা থেকে ১২ কোটি, ইসলামপুর শাখা থেকে ১ কোটি, শ্রীনগর শাখা থেকে ৩ কোটি, কাওরান বাজার শাখা থেকে ২৭ কোটি, ময়মনসিংহ শাখা থেকে ৫ কোটি, ওসমানীনগর শাখা থেকে ১০ কোটি, খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ৭ কোটি ও অন্যান্য ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত তুলে নিয়েছে আরো ১৫ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে বিডিবিএলকে একীভূত করা হবে ঘোষণা দেওয়ার পর এসব আমানত তুলে নিয়েছে বলে ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে অন্য পাঁচ সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য বলেছে। যদিও প্রথমদিকে এ সংখ্যা ১০টি ছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিডিবিএল সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হবে। সিটি ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংক এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দুর্বল ও ভালো উভয় ব্যাংকই আমানত তুলে নেওয়ার হুড়োহুড়ির মুখে পড়তে পারে। আমানতকারীদের টাকা যেন খোয়া না যায়, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।


























