⦿ রাতের আঁধারে ব্যবহার হচ্ছে জল-স্থলপথ
⦿ রহস্যজনকভাবে নির্বিকার স্থানীয় প্রশাসন
⦿ সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব
⦿ বিক্রি হচ্ছে দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে
⦿ সংকটে দেশের উৎপাদকরা
কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না ভারত থেকে অবৈধভাবে চিনি আসা। নিম্নমানের ভারতীয় এই চিনি রাতের আঁধারে অবাধে দেশে ঢুকছে প্রতিদিন। চোরাচালানীরা নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে দেশের সীমান্ত এলাকার সিলেটের গোয়াইনঘাটের জল ও স্থলপথ। এতে সরকার প্রতিদিন হারাচ্ছে অন্তত ২০ কোটি টাকার রাজস্ব। দেশে এনে তা দেশীয় বিভিন্ন ব্যান্ডের মোড়কে বিক্রি করছে সংঘবদ্ধ চোরাচালানি চক্র। রহস্যজনকভাবে নির্বিকার রয়েছে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবিসহ স্থানীয় প্রশাসন। দেশীয় মিল মালিকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই গভীর সংকটে পড়ছেন দেশীয় উৎপাদকরা। এর ফলে দেশীয় চিনির বিক্রি নেমে এসেছে দিনে ৬ হাজার থেকে এক হাজার টনে। এ কারণে প্রতিদিন দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ কোটি টাকার চিনি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধভাবে ভারতীয় চিনি আনা বন্ধে প্রতিনিয়তই অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইতোমধ্যেই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতীয় চোরাই চিনি পরিবহনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ছোট নৌকা। যেসব নৌকা দিনে চোরাই বালু ও পাথর পরিবহন করে সেগুলোই আবার ভাতর থেকে নিম্নমানের অবৈধ চিনি বহন করে রাতের আঁধারে অবৈধ পথে দেশে আনছে। নৌকায় আনা এসব চিনি ঘরে পৌঁছে দেয়া হয় স্থল পথের ডি. আই. ট্রাকযোগে। একটি প্রভাবশালী মহল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সারি নদীর সারি-৩ অঞ্চল থেকে দিনে-দুপুরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে। যদিও মামলা চলমান থাকায় এখন বালু তোলা নিষিদ্ধ। নদী থেকে তোলা বালু বহন করা নৌকাগুলো যখন ভারত থেকে চোরাই চিনি আনার কাজে ব্যবহার হয় তখন এগুলো ভাড়া হয়ে যায় দিনে ২৫ হাজার টাকায়। এসব নৌকায় প্রতিবার ভারত থেকে আসে ৫০ কেজির ১০০ বস্তা চিনি। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মুক্তাপুর থেকে ডিবির হাওড় দিয়েও নৌকায় করে জৈন্তাপুরে চিনি ঢোকে। চিনি আসে গোয়াইনঘাটের নলঝুরি, তামাবিল, সোনাটিলা ও জাফলং জিরো পয়েন্ট দিয়ে। ভারতের শ্রী রেণুকা সুগার মিলের উৎপাদিত চিনি সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। শুধু শ্রী রেনুকা নয়, ভারতের অনেক মিলের অবৈধ চিনিতে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হওয়ার ভয়ঙ্কর প্রভাব এবার এনবিআর’র তথ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতীয় চিনি চোরাচালানের অন্যতম রুট হয়ে উঠেছে সিলেটের গোয়াইনঘাট। চোরাই পথে ছোট ছোট নৌকা করে দেশে আসছে ভারতীয় চিনি। এরপর স্থলপথে ট্রাকে করে সেই চিনি নেয়া হচ্ছে সিলেট সদরে। এসব চোরাই চিনি ফ্রেশ ব্র্যান্ডের বস্তায় ভরে সিলেট থেকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। চোরাচালন থেকে বস্তা বদল, সবই চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। সীমানাজুড়ে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড়। পাহাড়ের উঁচু-নিচু জঙ্গলঘেরা কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বানের পানির মতো শুধু চিনি নয়, ভারতীয় অন্যান্য চোরাইপণ্যও অবাধে দেশে প্রবেশ করছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে নলজুরি রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অটোভ্যানে প্রবেশ করছে এসব চোরাই পণ্য। সাংবাদিক দেখেই পালিয়ে যায় চোরাচালানে জড়িত কিশোরের একটি দল। ওই অটোর মধ্যেই দেখা মেলে বস্তার পর বস্তা ভারতীয় চিনি। ৫০ কেজি ওজনের মোট ৯টি বস্তা। যা আনা হয়েছিল তামাবিল সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে। সেটি তামাবিল পুলিশ ফাঁড়ির মাত্র ৫০০ গজের মধ্যে। ফাঁড়ি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বস্তাভর্তি চোরাই চিনিসহ অটো ফেলে পালিয়ে যায় চোরাকারবারিরা। পাচারকারীদের হামলা ও পুলিশি হয়রানির ভয়ে স্থানীয়রা কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। তারা এসব দৃশ্য নিত্যদিনের বলে মন্তব্য করেন।
রাজধানীর মৌলভীবাজার থেকেই দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ চিনি সরবরাহ হয়। চিনি শোধনাগার ও মিল থেকে চিনি এখানে আসে তারপর যায় বিভিন্ন জেলায়। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, ভারত থেকে চোরাই পথে আনা নিম্নমানের চিনি কিছু অসাধু লোক দেশীয় ব্র্যান্ডের মোড়কেই বিক্রি করছে, ফলে মৌলভীবাজারে দেশীয় চিনির বিক্রি কমেছে অন্তত ৫০ শতাংশ।
চোরাই পথে দেশে আসা মানহীন ভারতীয় চিনির আগ্রাসন ঠেকাতে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দাবি, দেশীয় মিলগুলোতেই চাহিদার দ্বিগুণ চিনি উৎপাদন স্বক্ষমতা আছে। চোরাই পথে আসা নিম্নমানের এই চিনি, বাজারে চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশই দখল করেছে। এতে সরকার বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মো. আবুল হাসেম বলেন, সিলেট তামাবিল, নেত্রকোণা, কুমিল্লার আখাউড়া বেল্ট দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ নিম্নমানের চিনি প্রবেশ করে। অবৈধভাবে মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ, সিটি গ্রুপের তীর ও আব্দুল মোনেমের ইগলু মার্কা লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে চরম সংকটে পড়েছে বেসরকারি খাতের চিনি পরিশোধন ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো। যার জন্য সাধারণ ভোক্তারা বুঝতে পারছেন না কোনটা ভারতীয় চিনি আর কোনটা আমাদের দেশীয় চিনি। এমন অবস্থায় চলতি বছরের চার মাসে দেশে অপরিশোধিত চিনি আমদানি প্রায় দুই লাখ টন কমে গেছে। তিনি বলেন, দেশীর চিনির বর্তমান খুচরা বিক্রি মূল্য প্রতি কেজি ১৪০ টাকা। আমদানিতে সরকারকে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিশোধের পর প্রতি কেজি চিনিতে শুল্ক ৪০ থেকে ৪২ টাকা। অন্যদিকে চোরাই পথে আসা চিনির শুল্ক নেই তাই দামও কম। দেশে পাঁচটি বড় চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের দৈনিকই উৎপাদন ক্ষমতা ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি। যা দেশের মোট চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ডিজিএম তসলিম শাহরিয়ার বলেন, মেঘনা গ্রুপের একটা ভালো ব্রান্ডভ্যালু আছে। এখানে আমাদের ব্যাগকে নকল করে ইন্ডিয়ান চিনি ভরে পুরো দেশে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যা আমাদের ব্রান্ডের ক্ষতি করছে। সাধারণ সময়ে মেঘনা গ্রুপের আড়াই থেকে তিন হাজার টন বিক্রি হয়। কিন্তু এখন তা কমে ৫০০ টনের ঘরে চলে এসেছে। সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিত সাহা বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা ইনভেস্ট করে আমাদের দেশীয় রিফাইনারিগুলো চিনি উৎপাদন করতে পারছে না। আমদানি করছে। এছাড়া ভারত থেকে যে চিনি আসছে, সেগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের কেউ নেই।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, প্রতিদিন দেশীয় চিনি শিল্পে উৎপাদিত ৭০ কোটি টাকার চিনি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। সরকারও দিনে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় নিন্মমানের চিনি কিনে ভোক্তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সরকারি চারটি চিনিকলের এমডির দায়িত্ব পালন করে আসা সরকারি চিনিকলের সাবেক এমডি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক আশঙ্কা করছেন চোরাচালান যেভাবে এক সময় সরকারি চিনি কলগুলোকে রুগ্ন করেছে, এবার বেসরকারি শিল্পকেও ধ্বংস করবে। সংশ্লিষ্টদের প্রতি দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দেন। এরপরও সরকারের টনক না নড়লে অর্থনীতিতে দেশীয় চিনি শিল্পে চরম মূল্য দিতে হবে বলেও মনে করেন সাবেক এই কর্মকর্তা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ বলেন, চোরাই পথে আসা চিনি ঠেকানোর দায়িত্ব যার তার কাছেই বলতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বস্তা চোরাই চিনি থেকে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ ও কানাইঘাটের ওসি নেন ১২০ থেকে ১৬০ টাকা। অভিযানের নামে যে চিনি জব্দ কারা হয়, সেগুলো চিনি আবার তার কাছেই বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে এসব থানার ওসিদের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীমান্ত এলাকার বিজিবির কোনো কর্মকর্তাই মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জৈন্তাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ওমর ফারুক বলেন, এমন অভিযোগ সত্য নয়, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। সিলেটের গোয়াইনঘাট থানার ওসি কে এম নজরুল বলেন, গতমাসেও ৫৩ বস্তা চিনি জব্দ করে আমরা একজনকে ধরে মামলা দিয়েছি। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।























