🔗 যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজনীতি বিশ্বকে বিষিয়ে তুলছে
🔗 কমছে ডলারের আধিপত্য
🔗 বিশ্ব ভূরাজনীতির নতুন মেরুকরণে এক হচ্ছে ভারত-চীন-রাশিয়া?
ভারতে চলছে লোকসভা নির্বাচন। বিশ্বের জনবহুল এই দেশটির নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। কারণ বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকা ভারতের নেতৃত্বে কে আসছেন, তার ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব নতুন ভূরাজনীতির নানা সমীকরণ। বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং ক্রমাগত পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তিধর অনেক দেশই এখন ভারতকে পাশে চায় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও রয়েছে। কিন্তু ভারতকে কেন পাশে চায় শক্তিধর দেশগুলো? এখানে কী স্বার্থ তাদের? এছাড়া নরেন্দ্র মোদি, ভøাদিমির পুতিন ও শি জিনপিংকে কেন প্রয়োজন বিশ্বের? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষকদের অভিমত, ভারতে আবারও ক্ষমতায় আসছেন দেশটির কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। বিজেপির বিরুদ্ধে মুসলিম বিদ্বেষের নানা অভিযোগ আছে; তার পরও বিশ্বে মোদির ভালো ভাবমূর্তি রয়েছে বলে তাদের অভিমত। তাঁরা মনে করেন, তার আমলে ভারতের অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত অনেক সাফল্য হয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেছেন মোদি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে শুরু করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিনসহ অনেক নেতার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন মোদি। এমনকি মিশর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মুসলিম দেশের সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়ন করেছে মোদি সরকার।
নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণে বৈশ্বিক নেতৃত্ব হয়ে ওঠা ভারতকে কাছে টানা এখন অনেক দেশের জন্যই লাভের। শুধু তাই নয়; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শক্তিকে টেক্কা দিতে বিশ্বের এখন মোদি, পুতিন ও শি’কে প্রয়োজন। কারণÑ বিশ্ব এখন এমন এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে যেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যে পতনের চেউ শুরু হয়েছে। বিশ্ব ব্যবস্থা এখন বহুমুখীতার দিকে যাচ্ছে, যেখানে কোনো একক দেশ নয়, অনেক দেশ ও অঞ্চলের হাতে ক্ষমতা থাকবে। বহুকাল ধরেই পৃথিবীজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন সাম্রাজ্য অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ডলারের আধিপত্যের অবসান, যার ওপর নির্ভর করে মার্কিন সমৃদ্ধি ও অগ্রাধিকারের বিষয়টি। অন্যদিকে চীনের উত্থান ঘটছে। মার্কিনিরা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, তারা সবার থেকে আলাদা- এসব কথা এখন আর ধোপে টিকছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, তাদের সাম্রাজ্যবাদের সময় ফুরিয়ে আসছে। ডলারের আধিপত্য কমে যাওয়া থেকে বিষয়টি অনেকটা অনুমেয়। গত দুই দশকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রায় ডলারের শেয়ার ৭২% থেকে কমে ৫৮% হয়েছে। নিজেদের আধিপত্য কমে যাক, তা অবশ্যই চাইবে না যুক্তরাষ্ট্র। যে কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে দেশটি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা এবং ইরান ও তার মিত্রদের কোণঠাসা করে রাখা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, জাপান ও ফিলিপিন্সের মতো এশিয়ার দেশগুলোকে ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানো। এমনকি এতে ভারতকেও প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করা। আর এই কারণেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ইউক্রেনকে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র। একই কারণে গাজায়ও মার্কিন মদদে চলছে ইসরাইয়েলের নৃশংস গণহত্যা। যুক্তরাষ্ট্রের এমন যুদ্ধবাজনীতি বিশ্বকে বিষিয়ে তুলছে। তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে সম্মান না দেখিয়ে বরং এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে। আর এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশ। সহিংস বিক্ষোভ চলছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। চলছে ধরপাকড়। ঘটছে নির্বিচার আটকের ঘটনাও।
অন্যদিকে ইসরাইলকে অস্ত্র সহায়তা দেওয়া নিয়ে নতুন করে নিজ দল ডেমোক্রেটিক পার্টির চাপের মুখেও রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। দেশে-বিদেশে, এমনকি নিজ দলে এমন পরিস্থিতি বাইডেনকে নতুন এক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। যার প্রভাব পড়তে পারে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও। সব মিলিয়ে চরম বিপদেই রয়েছেন বাইডেন। ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভকারীরা তাকে ‘ জেনোসাইড জো’ বা ‘গণহত্যা জো’ বলে অভিহিত করছেন। এদিকে বিক্ষোভের পিছনে থাকা কিছু গ্রুপ অস্বাভাবিক উৎস থেকে সমর্থন পাচ্ছে। আর্থিক সহায়তা দেওয়া দাতাদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক সার্কেলের কিছু বড় নাম রয়েছে। এরা হলেন- জর্জ সোরোস, রকফেলার ও প্রিটজকার। হায়াত হোটেল এম্পায়ারের উত্তরাধিকারী – সুসান ও নিক প্রিটজকার এবং বাইডেনের সমর্থক ও বিভিন্ন ডেমোক্র্যাটিক ক্যাম্পেইনে অর্থায়ন করা একটি ফাউন্ডেশন ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভে জড়িত কয়েকটি গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চরম বেকায়দায় পড়েছে বাইডেন প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে কানাডা-ভারত দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নয়াদিল্লিকে সমর্থন দেয়া ভারত সরকারের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির একটি কৌশল। যে সময় পশ্চিমা আধিপত্য শেষ হয়ে আসছে, বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থার উত্থান ঘটছে; সেই পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ভারত স্বাধীন পথ অনুসরণ করবে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন বার্তা দেয় নয়াদিল্লি। ঠিক এখানেই ভারতকে প্রয়োজন চীন ও রাশিয়ার। বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যের আধিপত্যকে টেক্কা দিতে অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথকে নেতৃত্ব দিতে একাট্টা প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতীম দেশ চীন ও রাশিয়া। পাল্লা ভারী করতে ভারতকে জোটে ভেড়ানো উভয় দেশের জন্যই লাভের। এ কারণেই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে উঠেছে ভারত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নয়াদিল্লি-মস্কো-বেইজিং এক হলে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজনীতিকে সমর্থন করে না বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের মতো ভারতীয়ওরা। ১০ মে শান্তির পক্ষে সমর্থন জানিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছে ভারতসহ বিশ্বের ১৪৩টি দেশ। যেখানে বাংলাদেশও রয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, চেচনিয়া, হাঙ্গেরি, ইসরায়েল, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, পলাউ ও পাপুয়া নিউগিনি। ভোটদানে বিরত থাকা দেশগুলোর বেশির ভাগই ইউরোপের। এর মধ্যে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া, ফিজি, ফিনল্যান্ড, জর্জিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, রোমানিয়া ও ইউক্রেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এসব রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শক্তির উৎস যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বলে মনে করেন আন্তর্জাাতিক বিশ্লেষজ্ঞরা। বিশ্লেষজ্ঞদের অভিমত, বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই যখন যুদ্ধের বিপক্ষে শান্তির পক্ষে তখন ভারতও সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে চায়। আর এ কারণেই ভারত মার্কিন সাম্রাজ্যের বাইরে বিশ্বের আরেক পরাশক্তি চীন ও রাশিয়ার বলয়ে ঝুঁকেছে।
মোদি-পুতিনের ভূরাজনৈতিক কৌশল : রাশিয়ার ব্রিকস সম্প্রসারণ নীতি। বর্তমানে এই জোটের প্রধান হিসেবে কাজ করছে রাশিয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ব্রিকস সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিকল্প শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় মস্কো। অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও অপার সুযোগ রয়েছে এখানে। চীন-ভারতও ব্রিকসের সদস্য।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামীতে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দেয়ার লক্ষ্যে চীন ও ভারতের সঙ্গে কাজ করছে রাশিয়া। বিশ্বে এখনো প্রযুক্তির জোরে কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতে তেল বিক্রি থেকে শুরু করে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অধীনে থাকা ভারতীয় স্টার্টআপগুলোতে রাশিয়ার অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। মস্কো অবশ্যই সেই সুযোগ হাত ছাড়া করবে না।
পুতিনের দিকে ঝুঁকলেও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে খুব একটা বনিবনা নেই নয়াদিল্লির। তবে, নিজ স্বার্থ বিবেচনায় এই দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে ভবিষ্যতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা যেতে পারে রাশিয়াকে- এমন আভাসও দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। অবশ্য এমনটা হলে চীন-ভারত উভয়ের জন্যেই সুবিধা। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি হলো বহুমুখী। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন তাদের প্রধান লক্ষ্য। রাশিয়া ও চীন যদি একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে, ভালো বন্ধু হতে পারে; তাহলে ভারত কেন এই জোটে যুক্ত হতে পারে না? বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কোন্নয়ন হলে সুবিধাই হবে। পাশাপাশি চীন-রাশিয়া ও ভারতের নতুন মোর্চায় বিশ্ব ভূরাজনীতিতে পশ্চিমাসহ মার্কিন পরাশক্তিতে কিছুটা হলে নাড়া পড়বে।
























