১২:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

লবণাক্ততায় উপকূলে বিপদ বাড়ছে

 

◉ উপকূলীয় এলাকার ৫৩ শতাংশ জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে
◉ খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমছে
◉ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয়রা
◉ লবণাক্ততা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, কৃষিব্যবস্থাপনা, মিঠা পানির মাছ ও বন্য প্রাণী। এই অবস্থার পরিবর্তনে অবিলম্বে উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারা বিশ্বে প্রায় ১২০টি দেশের ৯৫৩ মিলিয়ন হেক্টরেরও অধিক জমি ইতোমধ্যে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় ৭-৮ শতাংশ ফসলের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈশ্বিক বিশ্লেষণে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার অথবা ক্ষারীয়তার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়েছে। লবণাক্ততার পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট ঘন ঘন খরার ফলে বিশ্বে দরিদ্রতা বাড়ছে এবং ক্ষুদ্র চাষিদের জীবিকার উপায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর ২৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের ফসল নষ্ট হচ্ছে। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বে ২৩০ হেক্টর সেচ জমির মধ্যে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ জমি লবণাক্ততাপূর্ণ। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ২৯ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫৩ শতাংশ। প্রায় ৩০ শতাংশ আবাদি জমির মাটিতে লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশব্যাপী প্রায় ১২ শতাংশ জমি এই লবণাক্ততার কবলে নিমজ্জিত।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলার মধ্যে মাত্রাতিরিক্তভাবে লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ১০টি উপজেলার নদীর পানি। এগুলো হলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ, খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা, বাগেরহাটের মংলা ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া। এসব উপজেলায় এখন ১০ পিপিটি মাত্রার লবণাক্ততা বিরাজ করছে। আগামীতে তা ১৫-২৫ মাত্রায় উন্নীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩২ শতাংশ ভূমিতে বসবাস করছে প্রায় চার কোটি মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ। এ অঞ্চলের মাত্র ৩০ শতাংশ জমি এখন চাষযোগ্য। এছাড়া ১৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে মাছ চাষসহ অন্যান্য কাজে। ৫৩ শতাংশ জমি পতিত রয়েছে শুধু লবণাক্ততার কারণে। চাষযোগ্য ৩০ শতাংশ জমি আবার পরিপূর্ণভাবে উৎপাদনে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয়রা।

দেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর সাগরের নোনা পানির প্রভাব এলাকার প্রকৃতির ওপর পড়ছে। এটা তো প্রাকৃতিকভাবে হচ্ছে। কিন্তু চিংড়ি ঘেরের কারণে মানবসৃষ্ট কৃত্রিমভাবে গ্রামগঞ্জের মাটি লবণাক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের গবেষণায় জানা যায়, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের জেলা- বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। চিংড়ি চাষের জন্য নোনা পানি আনতে স্লুইসগেট ছিদ্র করে বাঁধ দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে এসব এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার।

বন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় বনের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর যা দেশের আয়তনের ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহ’র মতে, জমিতে লবণাক্ততা প্রতিরোধে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। যত দ্রুত লবণাক্ততা দূরীকরণে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় ততই মঙ্গলজনক।

জনপ্রিয় সংবাদ

লবণাক্ততায় উপকূলে বিপদ বাড়ছে

আপডেট সময় : ০৭:১৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ মে ২০২৪

 

◉ উপকূলীয় এলাকার ৫৩ শতাংশ জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে
◉ খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমছে
◉ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয়রা
◉ লবণাক্ততা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, কৃষিব্যবস্থাপনা, মিঠা পানির মাছ ও বন্য প্রাণী। এই অবস্থার পরিবর্তনে অবিলম্বে উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারা বিশ্বে প্রায় ১২০টি দেশের ৯৫৩ মিলিয়ন হেক্টরেরও অধিক জমি ইতোমধ্যে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় ৭-৮ শতাংশ ফসলের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈশ্বিক বিশ্লেষণে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার অথবা ক্ষারীয়তার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়েছে। লবণাক্ততার পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট ঘন ঘন খরার ফলে বিশ্বে দরিদ্রতা বাড়ছে এবং ক্ষুদ্র চাষিদের জীবিকার উপায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর ২৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের ফসল নষ্ট হচ্ছে। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বে ২৩০ হেক্টর সেচ জমির মধ্যে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ জমি লবণাক্ততাপূর্ণ। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ২৯ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫৩ শতাংশ। প্রায় ৩০ শতাংশ আবাদি জমির মাটিতে লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশব্যাপী প্রায় ১২ শতাংশ জমি এই লবণাক্ততার কবলে নিমজ্জিত।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলার মধ্যে মাত্রাতিরিক্তভাবে লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ১০টি উপজেলার নদীর পানি। এগুলো হলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ, খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা, বাগেরহাটের মংলা ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া। এসব উপজেলায় এখন ১০ পিপিটি মাত্রার লবণাক্ততা বিরাজ করছে। আগামীতে তা ১৫-২৫ মাত্রায় উন্নীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩২ শতাংশ ভূমিতে বসবাস করছে প্রায় চার কোটি মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ। এ অঞ্চলের মাত্র ৩০ শতাংশ জমি এখন চাষযোগ্য। এছাড়া ১৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে মাছ চাষসহ অন্যান্য কাজে। ৫৩ শতাংশ জমি পতিত রয়েছে শুধু লবণাক্ততার কারণে। চাষযোগ্য ৩০ শতাংশ জমি আবার পরিপূর্ণভাবে উৎপাদনে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয়রা।

দেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর সাগরের নোনা পানির প্রভাব এলাকার প্রকৃতির ওপর পড়ছে। এটা তো প্রাকৃতিকভাবে হচ্ছে। কিন্তু চিংড়ি ঘেরের কারণে মানবসৃষ্ট কৃত্রিমভাবে গ্রামগঞ্জের মাটি লবণাক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের গবেষণায় জানা যায়, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের জেলা- বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। চিংড়ি চাষের জন্য নোনা পানি আনতে স্লুইসগেট ছিদ্র করে বাঁধ দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে এসব এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার।

বন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় বনের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর যা দেশের আয়তনের ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহ’র মতে, জমিতে লবণাক্ততা প্রতিরোধে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। যত দ্রুত লবণাক্ততা দূরীকরণে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় ততই মঙ্গলজনক।