►নিয়মের জালে আটকানো নিয়ে জটিলতা কাটছে না
►সাধারণ মানুষ সুবিধাভোগী হলেও, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলতে পারবে বলে জানিয়েছে সরকার। তবে তিন চাকার এই যানকে নিয়মের মধ্যে আনা হবে। দুর্ঘটনা বাড়ায় ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নিম্নআয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে তা চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে বিশেষ এই যান নিয়ে জনমনেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে সড়কে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচলের কারণে এসব রিকশা যানজটের কারণ ও দুর্ঘটনা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সবশেষ সরকারের পক্ষ থেকে এসব যানের অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে রাজধানীজুড়ে দৌড়ত্ম্য বেড়েছে তিন চাকার এই যানের। তবে সরকারের পক্ষ থেকে অটোরিকশাগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকশার পরিবর্তন ও নিয়মের মধ্যে আনতে পারলে কমবে দুর্ঘটনা ও সরকার পাবে রাজস্ব।
গত শনিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যানসহ এই ধরনের থ্রি হুইলার চলাচল বন্ধে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। পরদিন রোববার পুলিশের পক্ষ থেকে অটোরিকশা বন্ধে অভিযান চালানো শুর হলেও শুরু হয় রিকশা শ্রমিকদের আন্দোলন। সেদিন মিরপুরে দিনভর সড়ক অবরোধ করে রাখে তারা। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, বাস ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় পল্লবী, কাফরুল ও মিরপুর মডেল থানায় চারটি মামলা হয়েছে, আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ৭০০ জনকে, গ্রেপ্তার হয়েছে ৪২ জন।
পরদিন সোমবার এক অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে ঢাকা সিটিতে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ি চলাচলের অনুমতি দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা যায়, সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন চালকদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করে বন্ধ করা যাবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব রিকশা চলাচল নিয়মের মধ্যে আনতে শিগগির করতে হবে নীতিমালা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানতেন না প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধান বলেছেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে চালকদের জীবিকায় হাত দেওয়া উচিত হয়নি। নীতিমালার মাধ্যমে রিকশাচালকদের নিয়মের মধ্যে আনা হবে। করা হবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। এ ছাড়া এসব যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তা এবং গতিসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে।

তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বৈধতা দিতে কীভাবে, কোন সংস্থা নিবন্ধন দেবে, এখনো তা স্পষ্ট করা হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি এমন ২ লাখ ৩৩ হাজার অযান্ত্রিক যান রাজধানীতে চলে দুই সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনে। চলছে অনুমোদনবিহীন লাখ দুয়েক ব্যাটারি ও ইঞ্জিনচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক। এসব যানবাহন বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। বিআরটিএ এসব যানের নিবন্ধন দেয় না।
এদিকে অনুমতি মেলায় রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে আগের মতোই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকেরা। সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দেখা যায়, কোনো রকম নিয়ম মানা তো দূরের কথা, আগের মতোই এলোমেলো ভাবেই চলছে এই বাহন বরঞ্চ আগের তুলনায় যেন তাদের রিকশার গতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশকে দেখা গেছে অনেকটাই অসহায় ও নীরব ভূমিকায়।
বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার পক্ষ থেকে অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে, সড়কে তিন চাকার এ ধরনের যান দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও দেওয়া হচ্ছে এর পরিসংখ্যান। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষের মৃত্যু হয়, এর ২০ শতাংশই ব্যাটারিচালিত রিকশায়।
এর আগে ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরত্ম্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পরে ২০১৭ সালে ফের আরেক দফা বন্ধের নির্দেশনা আসে। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্যাটারিচলিত রিকশা বন্ধ ও আমদানি নিষিদ্ধ করে আবারও নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। কিন্তু এসব নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে পাল্লা দিয়ে দিন দিন বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য।
এ বিষয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে রাজধানীতে অন্তত ৮ লাখ রিকশা রয়েছে বলে জানান ২ সিটির কর্মকর্তারা। এর মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ব্যাটারিচলিত রিকশা।
দিনেরবেলা এসব রিকশা অলি-গলিতে বেশি চললেও রাতে গণপরিবহন কম থাকায় বেপরোয়াভাবে বেড়ে যায় বাহনটির দৌরাত্ম্য। অনেক সময় প্রধান সড়কে নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে চলতে গিয়ে বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। মূলত প্যাডেল রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি লাগিয়ে চলাচল করছে। প্রতিটি এলাকায় মোড় দখল করে নিয়ে থাকে বাহনটি। শুধু তাই নয়, যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় বাড়তি ভাড়াও।
জানা যায়, এসব যানে ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ। বিশেষ করে বাড্ডা, নয়া বাজার, শনির আখড়া, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকায় ওইসব রিকশার বেশ কয়েকটি গ্যারেজ রয়েছে। ওইসব গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ওই রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এতে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আর লাভবান হচ্ছে অসাধু অটোরিকশা মালিকরা।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক চালকের নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা। অদক্ষ চালক অনেক সময় রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। অধিকাংশ অটোরিকশা চলাচ্ছে শিশু-কিশোর এবং অন্য পেশা থেকে আসা শ্রমিকরা। এসব চালকদের বেপরোয়া ও বিশৃঙ্খলা অটোরিকশা চালনার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটেছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার পাশাপাশি প্রতিটি সড়কেও সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এতে নগরবাসী রয়েছে চরম ভোগান্তিতে। তবে যাত্রীদের কেউ কেউ বলছেন, সময় সংক্ষেপ হওয়ায় অটোরিকশার মূল সুবিধা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর নকশার পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সঙ্গে নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো সংশোধন করার পাশাপশি চলাচলেও আনতে হবে শৃঙ্খলা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান সবুজ বাংলাকে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ব্রেকিং সিস্টেম। সাইকেলে বা রিকশাতে আমরা যে ব্রেক দেখি তা হলো ‘ইউ’ ব্রেক। এই ব্রেকে চাকার দুই পাশে দুটি ব্রেক প্যাড থাকে, যা রিমকে চাপ দিয়ে গতি নিয়ন্ত্রণ করে। এই ব্রেকের কার্যকারিতা খুবই কম, ভেজা চাকায় এই ব্রেক খুবই কম কাজ করে। বিশেষ করে মোটর লাগানোতে এখানে গতি বেড়ে যায়। ইউ ব্রেকিং সিস্টেমটা পরিবর্তন করতে হবে। সেক্ষেত্রে হাইড্রোলিক ব্রেক ব্যববহার করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই রিকশাগুলোর বড় একটি সমস্যা ব্রেক করার পরও মোটর চলতে থাকে। কোনো কারণে ব্রেক থেকে হাত উঠে গেলে সহজেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া চার্জিং সিস্টেমটাও দুর্বল। এখানে চার্জিং এবং ব্যাটারি একসঙ্গে ইম্প্রুভ করতে হবে। ভালোমানের চার্জিং এডপ্টার ও ভালো মানের ব্যাটারি ব্যবহার করতে হবে। আমরা রিকশার উপর সোলার প্যানেল বসাতে পারি। এত অটো চার্জিং হবে। পাশাপাশি রিকশাচালকদের জন্য একটি ছাউনি হবে। একটা পরিবেশসম্মত রিকশা আমরা পেতে পারি।
তিনি বলেন, ব্যটারিচালিত রিকশার সঙ্গে বিশাল একটি জনগোষ্ঠির জীবন-জীবিকার বিষয় জড়িয়ে গেছে। হুট করে এসব রিকশা বন্ধ করলে অনেকেই পথে বসে যেতে পারেন। বর্তমানে একটি অটোরিকশা তৈরি করতে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এর সঙ্গে আর ২০-২৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ বাড়ালেই রিকশাগুলোকে নিরাপদ করা সম্ভব। এর ব্রেকিং সিস্টেম ও কাঠামোগত দুর্বলতার সমস্যার সমাধান করে সেগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া উচিত। তবে কোনোভাবেই এসব রিকশা মহাসড়ক বা প্রধান সড়কে চলাচলের পক্ষে নই আমি। এসব রিকশা মহল্লার ভেতরের সড়কে, কিংবা পার্শ্ব সড়কে চলতেই পারে।
বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, অনুমোদনহীন হওয়ায় এটিকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। যেহেতু বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু এর দুর্বলতা দূর করে চলাচলের অনুমোদন দেওয়া উচিত। এতে চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে, সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাবে।























