❖ রেহাই পাচ্ছে না পুলিশও
❖ বাস-ট্রেন-লঞ্চ স্টেশন ও পশুর হাটে ছদ্মবেশে ঘুরছে অপরাধীরা
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বেড়েছে অপরাধীদের দৌরাত্ম। চক্রের সদস্যরা নানান কৌশলে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-চাঁদাবাজ এমনকি চেতনানাশক খাইয়ে অচেতন করে অজ্ঞান-মলমপার্টির সদস্যরা সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। আসন্ন কোরবানির ঈদ ঘিরে তৎপর হয়ে উঠেছে চক্রের সদস্যরা। এদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না পুলিশও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীদের ধরতে ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নানান কৌশলে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। তবে সাধারণ জনগণকেও আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঈদ বা জাতীয় কোনো উৎসব এলেই দেশে অপরাধীদের অপতৎপরতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যংকের পেছনে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখিয়ে ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে ইলিয়াস নামে এক ব্যবসায়ীকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এমন দৃশ্য ধরা পড়ে সিটিটিভিতে। মতিঝিল বিভাগের ডিসি হায়াতুল ইসলাম খান বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে পুলিশের বিশেষ অভিযানে অপহরণকৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকজন অপহরণকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে।
এদিকে গত ৮ জুন দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ মদনপুর এলাকায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে নগদ ২ লাখ টাকা ও মোবাইলসহ সর্বস্ব খুইয়েছেন পুলিশ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম। তিনি ঢাকার প্রশাসনিক শাখা স্পেশাল ব্রাঞ্চে কর্মরত। একইদিন দুপুরে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নাজিম উদ্দিন আল আজাদ জানান, অজ্ঞানপার্টির সক্রিয় ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে চেতনানাশক পাউডার ও ওষুধ মিশ্রিত জুস জব্দ করা হয়।
এদিকে রাজধানীর বনশ্রীতে লাজ ফার্মায় তালা কেটে চুরির ঘটনায় সিসিটিভি’র ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চোরচক্রের ২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনের এডিসি মোঃ রাশেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ২৫ মে ভোরে লাজফার্মার বনশ্রী শাখায় নগদ টাকাসহ বিভিন্ন প্রকার মালামাল চুরি হয়। এ ঘটনায় ২৬ মে রামপুরা থানায় একটি চুরি মামলা রুজু হয়। এর আগে গত ৩০ মে রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রমনার পরীবাগ এলাকায় কথিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর হামলায় চোখা হারিয়েছেন এসআই মোজাহিদ। এ ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদিকে গত ২ জুন রাতে রাজধানীর খিলগাঁও ও নারায়ণগঞ্জে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে কাপ্তানবাজার থেকে লুণ্ঠিত ৩৮ ভরি স্বর্ণালংকারসহ আন্তঃজেলা ডাকাত দলের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ওয়ারী থানা পুলিশ। এরা হলো- মোঃ মোক্তার হোসেন, মোঃ সাদেক হোসেন, মোছাঃ নাসিমা বেগম ও মোছাঃ কাজল।
এদিকে সাভার পৌরসাভার বিভিন্ন সড়কে টোকেন দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। চক্রটি টোকেনে পৌরসভার নাম ব্যবহার করে ভুয়া রসিদ তৈরি করে প্রতিদিন শত শত যানবাহন থেকে লক্ষাধিক টাকা চাঁদা আদায় করছে। অভিযোগ রয়েছে, যুবক ও কিশোরদের দিয়ে এ চাঁদাবাজি করাচ্ছে প্রভাবশালী একটি মহল। দিন শেষে এ টাকার ভাগ যায় বিভিন্ন পকেটে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এ চাঁদা আদায় করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এদিকে গত ৬ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে র্যাব পরিচয়ে একটি কারখানার কর্মকর্তাদের অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে ১৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। টাকাগুলো কারখানা শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছিল। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের উপজেলার মাঝগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে ট্রাক থামিয়ে ৪টি গরু ছিনতাইয়ের সময় দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে আসন্ন কোরবানি ঈদ ঘিরে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে সক্রিয় হয়ে ওঠায় গত ৭ জুন সাঘাটা উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল দক্ষিণ সাথালিয়া এলাকার বুগার পটল নামক চরে অভিযান চালিয়ে ১২টি চোরাই গরু উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদিকে ফেনীর সোনাগাজীতে বিভিন্ন ট্রাক, মিনি ট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশা থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়কালে আটজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গতকাল রোববার তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এদিকে গত ৭ জুন দিবাগত রাতে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের পূর্ব জয় নারায়ণপুর গ্রামের খান এগ্রো ফার্মে প্রবেশ করে শ্রমিকদের মারধর করে ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ১৩টি উন্নত জাতের শাহীওয়াল গরু লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
ঢামেক সূত্র জানায়, প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যায়। এদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন, লঞ্চ, ফেরি-ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কোথাও নিরাপদ নয় কেউ। হকার কিংবা সহযাত্রী- বন্ধু সেজে সাধারণ মানুষের সবকিছু কেড়ে নেয় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এদের দৌরাত্ম্য থামাতে পুলিশের একটি বিশেষ দল মাঠে কাজ করছে। অনেককে ধরে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে তাদের কোনোভাবেই নির্মূল করা যাচ্ছে না। এজন্য পথচারী বা যাত্রী সবাইকে সতর্ক হতে হবে। অজ্ঞান পার্টির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। ঈদের আগে ও পরে অপরাধ নিমূলে নগরবাসীর সহায়তা চেয়ে ৮টি পরামর্শ মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান।
প৫ুলিশ সদর দপ্তর জানায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি ইউনিটকে সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
























