১২:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আইনের দৃষ্টিতে এখনো জীবিত আনোয়ারুল

# এখনো মেলেনি অস্ত্র-ট্রালি, সংগ্রহ হয়নি পরিবারের ডিএনএ নমুনা
# আওয়ামী লীগ নেতা গ্যাস বাবুর দায় স্বীকার
# দীর্ঘদিন ধরে এমপি হওয়ার চেষ্টায় দাপুটে নেতা মিন্টু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার নিখোঁজের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও এখনো পুরোপুরি সেই রহস্যের জট খোলেনি। এখনো মেলেনি এমপি আনারের ব্যবহৃত রক্তমাখা পোশাক, চশমা, মোবাইল সেট এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র ও রহস্যময় সেই ট্রলি। কলকাতার আলোচিত সেই সঞ্জীভা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা খণ্ডির মাংসের টুকরোগুলো মানবদেহের বলে ফরেনসিক প্রতিবেদনে উঠে এলেও বাগজোলা খাল থেকে উদ্ধার হাড়গুলো একই ব্যক্তির কিনা তা এখনো নিশ্চিত করেনি কলকাতা সিআইডি। এছাড়া মানবদেহের খণ্ডিত মাংস ও হাড়গুলো এমপি আনারের কিনা তা নিশ্চিত করতে নিহতের পরিবারের কারো ডিএনএ নমুনা এখনো সংগ্রহ না করায় তার মৃত্যু নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন উঠছে। তবে আইনের দৃষ্টিতে এখনো জীবিত রয়েছেন এমপি আনার, এমনটাই মনে করছেন আইনজীবীরা। এদিকে এমপি আনার হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ৪ জন স্বিকারোক্তিমূরক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে রয়েছে। এছাড়া এ মামলায় গ্রেপ্তার আরেক আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুল করিম মিন্টু আটদিনের রিমান্ডে রয়েছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এমপি আনারকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়কি ইস্যুতে ডেকে নিয়ে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহের খণ্ডিত দেহাংশ যাতে খুঁজে পাওয়া না যায়, সেজন্য সেই টুকরোগুলো গুম করা হয়। আর এমপি আনারের আসন শূণ্য ঘোষণা হলেই ওই আসনে এমপি হওয়ার চেষ্টায় ছিলেন কিলিং মিশনের অর্থদাতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা সাইদুল করিম মিন্টু। গতকাল শুক্রবার আদালতসহ তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনের চোখে এখনও জীবিত আনার
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমপি আনার নিখোঁজ ও খুন হাওয়ার খবর নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, কলকাতার ফ্ল্যাটে তাকে হত্যা করে মরদেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। খণ্ডিত কিছু মাংস ও হাড় উদ্ধার করা হয়েছে। মাংসের ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সেগুলো মানবদেহের। তবে তা কার তা নিশ্চিত করেনি কেউ। কিন্তু তার মরদেহ উদ্ধারের আইনি প্রমাণ এখনও মেলেনি। দেহাংশের টুকরোগুলো এমপি আনারের নিশ্চিত হতে হলে তার পরিবারের ডিএনএ পরীক্ষার আগে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যে, সেটি আনারেরই। তাই আইনগত কোনো কর্তৃপক্ষই আনারকে এখনও মৃত ঘোষণা দেয়নি। এই অবস্থায় আইনবিদদের মতে, আইনের দৃষ্টিতে আনার এখনও মৃত নয়, জীবিত রয়েছেন। আইনবিদরা বলছেন, মৃত্যু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার পদ শূন্য ঘোষণা করা সম্ভব নয়। তবে সংসদকে না জানিয়ে একটানা ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলে আসন শূন্য হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, রেকর্ড অনুযায়ী তিনি মারা গেছেন, এরকম প্রমাণ হয়নি; যেমনটি আইনের দৃষ্টিতে ঘোষণা করা হয়। তিনি যে সত্যি সত্যি মৃত, সেইরকম শক্ত কোনো প্রমাণ এখনো আসেনি। যতক্ষণ তা না আসবে, ততক্ষণ আমরা জটিলতা ও গোলকধাঁধার মধ্যে রয়ে যাচ্ছি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রেজা ই রাকিব বলেন, যদি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ হতে হবে উদ্ধারকৃত খণ্ডিত মাংস-হাড়গুলো এমপি আনারের। তবে এখনো যেহেতু এমপি আনারের পরিবারের কারও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়নি, তাতে ধরেই নেওয়া যেতে পারে, এমপি আনার জীবিত রয়েছেন। এছাড়া তার আসনও শূণ্য ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। দালিলিক কোনো ভিত্তি ছাড়া এমপি আনার খুন বা গুমের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। কিন্তু এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের ঘটনাটি বিরল ও ব্যতিক্রমী। এ নিয়ে সংবিধান বা আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। আনারের উদাহরণটি আইন সংশোধনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবরের পর সংসদের ওয়েবসাইটে ঝিনাইদহ-৪ আসনের তথ্য সরিয়ে নেয়া হলেও সেটি আবার সংযোজন করেছে সংসদ সচিবালয়।
এদিকে এমপি আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের মামলায় গ্রেপ্তার ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলায় গ্রেফতার পাঁচজনের মধ্যে চারজনই দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেফতার অপর আসামি মিন্টু আট দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সাত দিনের রিমান্ড শেষে বাবুকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর বাবু ঘটনার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। পরে জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম তার জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে ৬ জুন রাতে ঝিনাইদহ শহরের আদর্শপাড়া এলাকা থেকে বাবুকে আটক করে ঢাকার ডিবির একটি দল। পরে ৯ জুন বাবুকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালত তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে গত ১১ জুন বিকেলে ধানমন্ডি থেকে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুজে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে এ ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় ১৩ জুন তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এদিন তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন তার আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে ২৩ মে সৈয়দ আমানুল¬াহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়া ও সিলিস্তি রহমানকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। দুই দফায় তাদের ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তারা তিনজনই ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে তারা কারাগারে আটক রয়েছেন। এ ঘটনায় গত ২২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন এমপি আনারকন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার ছয়দিন আগেই জেনে যান সাইদুল করিম মিন্টু। কিন্তু বিষয়টি তিনি চেপে যান। আনারের আসনে সংসদ সদস্য হতে দীর্ঘদিনের চেষ্টা ছিল ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার সাবেক এই মেয়র। পাশের একটি আসনে এমপির মৃত্যুর পর সেখান থেকেও তিনি মনোনয়নপত্র কেনেন। এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে মিন্টুর যোগাযোগ, কিলার আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম আসা, তার আগে থেকে আনারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয় সামনে এনে ঘটনার সঙ্গে তার যোগসূত্র খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ-৪ সংসদীয় আসন ও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব লাগে আনারের সঙ্গে। টানা তিনবার আনার ওই আসনটি দখল করে আছেন। এ আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল মিন্টুর। ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হাই মারা যাওয়ার পর সেখান থেকেও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন মিন্টু। কিন্তু তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। সাবেক এ মেয়রের অনেক দিনের ইচ্ছা তিনি এমপি হবেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

আইনের দৃষ্টিতে এখনো জীবিত আনোয়ারুল

আপডেট সময় : ০৬:৪৫:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

# এখনো মেলেনি অস্ত্র-ট্রালি, সংগ্রহ হয়নি পরিবারের ডিএনএ নমুনা
# আওয়ামী লীগ নেতা গ্যাস বাবুর দায় স্বীকার
# দীর্ঘদিন ধরে এমপি হওয়ার চেষ্টায় দাপুটে নেতা মিন্টু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার নিখোঁজের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও এখনো পুরোপুরি সেই রহস্যের জট খোলেনি। এখনো মেলেনি এমপি আনারের ব্যবহৃত রক্তমাখা পোশাক, চশমা, মোবাইল সেট এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র ও রহস্যময় সেই ট্রলি। কলকাতার আলোচিত সেই সঞ্জীভা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা খণ্ডির মাংসের টুকরোগুলো মানবদেহের বলে ফরেনসিক প্রতিবেদনে উঠে এলেও বাগজোলা খাল থেকে উদ্ধার হাড়গুলো একই ব্যক্তির কিনা তা এখনো নিশ্চিত করেনি কলকাতা সিআইডি। এছাড়া মানবদেহের খণ্ডিত মাংস ও হাড়গুলো এমপি আনারের কিনা তা নিশ্চিত করতে নিহতের পরিবারের কারো ডিএনএ নমুনা এখনো সংগ্রহ না করায় তার মৃত্যু নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন উঠছে। তবে আইনের দৃষ্টিতে এখনো জীবিত রয়েছেন এমপি আনার, এমনটাই মনে করছেন আইনজীবীরা। এদিকে এমপি আনার হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ৪ জন স্বিকারোক্তিমূরক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে রয়েছে। এছাড়া এ মামলায় গ্রেপ্তার আরেক আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুল করিম মিন্টু আটদিনের রিমান্ডে রয়েছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এমপি আনারকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়কি ইস্যুতে ডেকে নিয়ে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহের খণ্ডিত দেহাংশ যাতে খুঁজে পাওয়া না যায়, সেজন্য সেই টুকরোগুলো গুম করা হয়। আর এমপি আনারের আসন শূণ্য ঘোষণা হলেই ওই আসনে এমপি হওয়ার চেষ্টায় ছিলেন কিলিং মিশনের অর্থদাতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা সাইদুল করিম মিন্টু। গতকাল শুক্রবার আদালতসহ তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনের চোখে এখনও জীবিত আনার
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমপি আনার নিখোঁজ ও খুন হাওয়ার খবর নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, কলকাতার ফ্ল্যাটে তাকে হত্যা করে মরদেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। খণ্ডিত কিছু মাংস ও হাড় উদ্ধার করা হয়েছে। মাংসের ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সেগুলো মানবদেহের। তবে তা কার তা নিশ্চিত করেনি কেউ। কিন্তু তার মরদেহ উদ্ধারের আইনি প্রমাণ এখনও মেলেনি। দেহাংশের টুকরোগুলো এমপি আনারের নিশ্চিত হতে হলে তার পরিবারের ডিএনএ পরীক্ষার আগে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যে, সেটি আনারেরই। তাই আইনগত কোনো কর্তৃপক্ষই আনারকে এখনও মৃত ঘোষণা দেয়নি। এই অবস্থায় আইনবিদদের মতে, আইনের দৃষ্টিতে আনার এখনও মৃত নয়, জীবিত রয়েছেন। আইনবিদরা বলছেন, মৃত্যু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার পদ শূন্য ঘোষণা করা সম্ভব নয়। তবে সংসদকে না জানিয়ে একটানা ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলে আসন শূন্য হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, রেকর্ড অনুযায়ী তিনি মারা গেছেন, এরকম প্রমাণ হয়নি; যেমনটি আইনের দৃষ্টিতে ঘোষণা করা হয়। তিনি যে সত্যি সত্যি মৃত, সেইরকম শক্ত কোনো প্রমাণ এখনো আসেনি। যতক্ষণ তা না আসবে, ততক্ষণ আমরা জটিলতা ও গোলকধাঁধার মধ্যে রয়ে যাচ্ছি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রেজা ই রাকিব বলেন, যদি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ হতে হবে উদ্ধারকৃত খণ্ডিত মাংস-হাড়গুলো এমপি আনারের। তবে এখনো যেহেতু এমপি আনারের পরিবারের কারও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়নি, তাতে ধরেই নেওয়া যেতে পারে, এমপি আনার জীবিত রয়েছেন। এছাড়া তার আসনও শূণ্য ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। দালিলিক কোনো ভিত্তি ছাড়া এমপি আনার খুন বা গুমের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। কিন্তু এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের ঘটনাটি বিরল ও ব্যতিক্রমী। এ নিয়ে সংবিধান বা আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। আনারের উদাহরণটি আইন সংশোধনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবরের পর সংসদের ওয়েবসাইটে ঝিনাইদহ-৪ আসনের তথ্য সরিয়ে নেয়া হলেও সেটি আবার সংযোজন করেছে সংসদ সচিবালয়।
এদিকে এমপি আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের মামলায় গ্রেপ্তার ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলায় গ্রেফতার পাঁচজনের মধ্যে চারজনই দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেফতার অপর আসামি মিন্টু আট দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সাত দিনের রিমান্ড শেষে বাবুকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর বাবু ঘটনার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। পরে জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম তার জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে ৬ জুন রাতে ঝিনাইদহ শহরের আদর্শপাড়া এলাকা থেকে বাবুকে আটক করে ঢাকার ডিবির একটি দল। পরে ৯ জুন বাবুকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালত তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে গত ১১ জুন বিকেলে ধানমন্ডি থেকে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুজে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে এ ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় ১৩ জুন তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এদিন তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন তার আটদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে ২৩ মে সৈয়দ আমানুল¬াহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়া ও সিলিস্তি রহমানকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। দুই দফায় তাদের ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তারা তিনজনই ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে তারা কারাগারে আটক রয়েছেন। এ ঘটনায় গত ২২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন এমপি আনারকন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার ছয়দিন আগেই জেনে যান সাইদুল করিম মিন্টু। কিন্তু বিষয়টি তিনি চেপে যান। আনারের আসনে সংসদ সদস্য হতে দীর্ঘদিনের চেষ্টা ছিল ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার সাবেক এই মেয়র। পাশের একটি আসনে এমপির মৃত্যুর পর সেখান থেকেও তিনি মনোনয়নপত্র কেনেন। এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে মিন্টুর যোগাযোগ, কিলার আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম আসা, তার আগে থেকে আনারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয় সামনে এনে ঘটনার সঙ্গে তার যোগসূত্র খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ-৪ সংসদীয় আসন ও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব লাগে আনারের সঙ্গে। টানা তিনবার আনার ওই আসনটি দখল করে আছেন। এ আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল মিন্টুর। ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হাই মারা যাওয়ার পর সেখান থেকেও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন মিন্টু। কিন্তু তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। সাবেক এ মেয়রের অনেক দিনের ইচ্ছা তিনি এমপি হবেন।