◉ এ বছর ৭০টি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে
◉বিশ্বের ৪৯ শতাংশ নাগরিক ভোট দিচ্ছে এবছর
⮞ বৈশ্বিক নির্বাচনে জনগণের আগ্রহ কম: আফসান চৌধুরী
⮞ এসব নির্বাচনে কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়েনা: মুন্সী ফয়েজ আহমেদ
নির্বাচনের বছর যেন ২০২৪ সাল। একটি দুটি দেশে নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৭০ টি দেশে এবছরের শুরু থেকে নির্বাচন শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়েই চলছে নির্বাচনী জোয়ার। চলবে বছরজুড়ে। এসব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বেশ পালাবদলের ঘটনা ঘটছে। কয়েকদিন আগে এমনই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিরোধী জোট লেবার পার্টি। তবে, পরিবর্তিত নেতৃত্বের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ- এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে ২০২৪ সালে নির্বাচন হবে। এদেশগুলোর মোট জনসংখ্যা বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশে এ বছরের শুরুতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে আবারও ক্ষমতায় এসে বিশে^ রেকর্ড সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড করেছেন আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তবে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুন না কেন কূটনৈতিক সম্পর্ক তার নিজস্ব নিয়মে চলে উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিআইআইএসএস এর সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এইসব নির্বাচনে কূটনৈতিক সম্পর্কে সাধারণত কোন প্রভাব পড়েনা। কারণ বেশিরভাগ দেশেরই পররাষ্ট্রনীতি মোটামুটি একটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। ছোট ছোট পরিবর্তন হয়, কিন্তু বড় পরিবর্তন তেমন কিছু হয়না। আর বাংলাদেশের সাথে যাদের সম্পর্ক আছে, তাদের সাথে মোটামুটি সম্পর্ক ভাল এবং বিভিন্ন দলের সরকারের সাথেই বাংলাদেশ বিভিন্ন সময় কাজ করেছে। সুতরাং আমাদের বর্তমান সরকারের বিভিন্ন দলের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ বা পরিচয় আছে। ওদেরও সেরকম আছে। সুতরাং বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কে খুব বড় রকমের প্রভাব পড়বে না, পড়ার সম্ভাবনা খুব কম।
বছরব্যাপী নির্বাচনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী সংকটের মুখে পড়ছে উল্লেখ করে গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক আফসান চৌধুরী বলেন, এবছর নির্বাচনগুলো বেশিরভাগই হচ্ছে ইউরোপে। ইউরোপ এখন অর্থনৈতিকভাবে চাপে আছে। বিশ্লেষকরা বলছিল যে ইউরোপের নির্বাচনগুলোতে ডানপন্থীরা যাবে কারণ বামপন্থীদের যে অবস্থান আছে সেটা দূর্বল হয়ে যাবে। ইউরোপের গবেষকরা এটা বলছিল এই কারণে যে কয়েকটা ঘটনা ঘটছে তার মধ্যে অন্যতম ইউক্রেনের যুদ্ধ। দ্বিতীয়টা হচ্ছে গাজা। গাজা আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে আছে কিন্তু গাজার সবচেয়ে বড় জিনিস যেটা হচ্ছে, গাজার যে অর্থনৈতিক চাপটা তৈরি হচ্ছে সামগ্রিকভাবে তারা যে দ্বন্দ্বে আছে তারা ভয় পাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে আবার অস্থিরতা তৈরি হবে এবং অস্থিরতা হলে আবার মধ্যপ্রাচ্যে একই সমস্যা হবে। তৃতীয়টা হচ্ছে চীনের যে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক উন্নতিকে তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু চীনও যেরকমভাবে আগাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়া চীনকে আটকাবার চেষ্টা করছে, এই দুই ব্যাপারে মিলমিশ হচ্ছে না। অর্থাৎ পৃথিবীতে অনেক বেশি অস্থিরতা।
নির্বাচন পদ্ধতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এইরকম একটা ধারণা ছিল যে, আদর্শগতভাবে মানুষ নির্বাচন করে বা করছে কিন্তু আমি তিন-চারটা নির্বাচন দেখে যা বুঝলাম মানুষ যে ভোট দিচ্ছে এটা খুব যে চিন্তা-ভাবনা করে হচ্ছে তা না। এটা ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন ডানপন্থি সরকারগুলো কয়েকটা ইউরোপের দেশে এসেছে কিন্তু বামপন্থী সরকার কোথায় এসেছে? বিলাতে এবং ফ্রান্সে। এটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে যে বিষয়টা আসছে সেখানে দেখা যাচ্ছে, এই যে নির্বাচন ব্যবস্থা যেটা এটার মধ্যে অনেকগুলো ভেতরের ফাঁক আছে। যেগুলো আমরা আলাপ করিনা। যেহেতু আমরা নির্বাচনকে একটা ধর্মীয় আবরণে দেখি যে, এটা একটা শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়াতেই ডানপন্থিরা সবল হচ্ছে। এটা আদর্শগত অবস্থান না। এই অবস্থানটা হচ্ছে মানুষের কোন উত্তর নেই। সাধারণত উদারপন্থী যেসব ধারণা ছিল উদারপন্থী ধারণাগুলো খুব একটা কাজে লাগেনি।
সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারতের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন নরেন্দ্র মোদী। সে নির্বাচনের প্রসঙ্গে আফসান চৌধুরী বলেন, ভারতীয়রা নরেন্দ্র মোদি খুব সাংঘাতিক সফল এটা প্রচার করেছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমও এগুলো লিখেছে। মোদি তার সমালোচনামূলক কার্যক্রমের উপর কোন সমালোচনা হয়নি। মোদির পপুলার ভোট ছিল ৪৭ ভাগ। কংগ্রেসের ছিল ৪০ ভাগ। এটা এমন কোন ব্যাপক তফাত না। মোদির শ্রেষ্ঠ সময়ের বিষয়ে বলছি। মোদি সবচেয়ে বেশি সিট পেয়েছিল কিন্তু অর্ধেকের চেয়ে বেশি মানুষ মোদিকে সমর্থন করেনি। এই কথাটা কিন্তু আমাদের দেশের কেউ উচ্চারণ করেনি বা বলেনি। মোদি এবং তারা সবাই মিলে ৫০ ভাগ লোকেরও সমর্থন পায়না। এবারে তারা ষাট ভাগের মতো সীট হারিয়েছে এবং কংগ্রেস মাত্র দুই শতাংশের চেয়ে কম ভোট পেয়ে বিরোধীদল হয়েছে। এত কম ভোট পেলে তারা ২ শতাংশের কম সীট পেতে পারত কিন্তু তা হয়নি। যেহেতু কনস্টিটিউশন টু কনস্টিটিউশন ভোট হয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নির্বাচনটা আমরা যেভাবে মনে করি যে, সমস্যার সমাধান করে তা না। কোন গোষ্ঠিকে সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছে দিতে পারে নির্বাচন। আগামীতে নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
মাত্র কয়দিন আগেই হলো যুক্তরাজ্যের নির্বাচন। এ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন কিয়ের স্টারমার। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। এ নির্বাচন প্রসঙ্গে মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, একটা যেমন অনেকেই চিন্তা করছিল যে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসল, এটা অনেকেই ভাল মনে করে কিন্তু আবার বর্তমান লেবার পার্টির যিনি এখন প্রাইম মিনিস্টার হলেন কিয়ের স্টারমার, তিনি দু একটা কথা বলেছিলেন তার ক্যাম্পেইনের সময় যেখানে বাংলাদেশীরা কিছুটা শঙ্কিত হয়েছিল। পরবর্তীতে উনি উনার ভুল বুঝতে পেরে সেটা আবার বলেছেন যে, তিনি সেভাবে মিন করেননি। বাংলাদেশকে সেভাবে রিপ্রেজেন্ট করতে চাননি। এরকম কিছু ছোট দেশ আছে যেখান থেকে লোকজন আসে সেটাই বলার চেষ্টা করেছেন। অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে বাংলাদেশ এবং ইউকের মধ্যে ইতিমধ্যেই কিন্তু একটা চুক্তি আছে। সুতরাং ওটা নিয়ে নতুন কিছু ঘটার সম্ভাবনা আমি দেখিনা।
এ প্রসঙ্গে আফসান চৌধুরী বলেন, বিলেতে দেখা গেল, জিতেছে লেবার পার্টি। তারা সীট পেয়েছে ৪১২টা। ৩৫ ভাগ ভোট পেয়েছে। দ্বিতীয়তে আছে কনভারজেটিভ পার্টি তারা পেয়েছে ১২১টা সীট। তারা ভোট পেয়েছে ২৪ শতাংশ। তৃতীয়তে আছে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছে ৭১টা সীট। তারা ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। চতুর্থ অবস্থানে আছে রিফর্ম পার্টি। এরা সাংঘাতিকরকম বর্ণবাদী এবং অভিবাসন বিরোধী। তারা পেয়েছে ১৪ শতাংশ ভোট। তারা তৃতীয়’র চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। তারা সীট পেয়েছে চারটা। তাহলে আমরা নির্বাচনের উপর ভিত্তি করে জনপ্রিয়তা অজনপ্রিয়তার হিসাবটা করাটা সবসময় সঠিক হয়না। তবে, সামগ্রিকভাবে যেটা মনে হয় পৃথিবীর মানুষ অনিশ্চয়তা নিয়ে আছে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেই যেটা দেখা যায়, লিবারেল ডেমোক্রাটরা ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে ৭১টা সীট পেয়েছে। গ্রীন পার্টি দেখলাম চারটা সীট পেয়েছে। গ্রীন পার্টি সাত শতাংশ ভোট পেয়ে চারটা সীট পেয়েছে আর রিফর্ম পার্টি ১৪ শতাংশ ভোট পেয়ে চারটা সীট পেয়েছে। সমান অবস্থান হয়ে গেলো না, কিন্তু ভোটের দিক থেকে ঠিক দ্বিগুণ। কনজারভেটিভরা যদি রিফর্ম পার্টির সাথে ঐক্য করত তাহলে তাদের ভোটের সংখ্যা হত ২৪ আর ১৪ তারমানে ৩৮ শতাংশ। যা লেবার পার্টির চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি।
এবছর তাইওয়ান, ফিনল্যান্ড, ভুটান, কমরোস, টুভ্যালু, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, আজারবাইজান, এল সালভাদর, সেনেগাল, কম্বোডিয়া, বেলারুশ, পর্তুগাল, রাশিয়া, ইরান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মাদাগাস্কার, পানামা, মেক্সিকো, বেলজিয়াম, আইসল্যান্ডে, মৌরিতানিয়া, মঙ্গোলিয়া, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই জুলাইতে রুয়ান্ডায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বছরের উল্লেখযোগ্য নির্বাচনের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। দেশটিতে এখন নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। এছাড়া, অস্ট্রিয়া, সিরিয়া, মরিশাস, শ্রীলঙ্কা, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়া, নামিবিয়া, গিনি বিসাউ ও কিরিবাতিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
























