◉ তিন মাসে আমানত বেড়েছে ৪ হাজার ১৮১ কোটি টাকা
◉ ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ৭৮ কোটি টাকা
◉ হিসাব বেড়েছে ১০ লাখ ১৭ হাজার ৪০৫টি
◉ এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকের বড় অংশই গ্রামের মানুষ
➥ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে এজেন্ট ব্যাংকিং আগামী দিনে আরও বড় ভূমিকা রাখবে- আরফান আলী, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্যাংক এশিয়া
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী অর্থনৈতিক খাতের নানা অনিয়ম দুর্নীতি করেছে। বিশেষ করে ব্যাকিং খাতে নামে বেনামে ঋণ প্রদান করে গ্রাহকদের আমানতের টাকার অপব্যবহার করেছে। এতে করে গ্রাহকরা ব্যাকিং খাতের প্রতি আস্থা হারিয়েছিল। তবে ইতিমধ্যে বর্তমান অর্ন্তবর্তী সরকারের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সংস্কারের ফলে মানুষের আস্থা ফিরেছে। বিশেষ করে দিন দিন গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতি। লেনদেন তথা টাকা জমা দেওয়া ও উত্তোলনের জন্য সাধারণ মানুষকে এখন আর জেলা কিংবা উপজেলা শহরের ব্যাংক শাখায় যেতে হয় না। হাতের কাছেই তারা পাচ্ছে ব্যাংকিং সুবিধা। সহজেই ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে ও উত্তোলন করতে পারছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের এজেন্ট ও আউটলুট থেকে ঋণ সুবিধাও পাচ্ছে তারা। চলতি বছরের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সব সূচকই ছিল উর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২০ লাখ ১৪ হাজার ৬১০টি। আর তিন মাস পর অর্থাৎ জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবধারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ৩২ হাজার ১৫টি। সেই হিসাবে তিন মাসে হিসাব বেড়েছে ১০ লাখ ১৭ হাজার ৪০৫টি।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের জুন শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত বেড়েছে ৪ হাজার ১৮১ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ৮ হাজার ৮৭২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের জুন শেষে ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১৫০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে ঋণ বিতরণের স্থিতি বেড়েছে ২ হাজার ৭৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকের বড় অংশই গ্রামের মানুষ। এ সময়ে গ্রামে গ্রাহক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯৮ লাখ ১২ হাজার ২৯৫ জন আর শহরের গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ১৯ হাজার ৭২০ জন। এ ছাড়া, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাবধারীদের মধ্যে নারী গ্রাহকের সংখ্যা এখন ১ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার ১১ জন আর পুরুষ গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ২৮ জন। এর বাইরে অন্যান্য গ্রাহক রয়েছে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৯৭৬ জন।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর জুন শেষে লেনদেনের পরিমাণ ৪৮ হাজার ৫০৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে লেনদেন বেড়েছে ২১৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্টের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮৩৫টি। আর জুন শেষে এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৯১টি। সেই হিসাবে তিন মাসে এজেন্টের সংখ্যা বেড়েছে ১৫৬টি। তবে মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় জুন প্রান্তিকে আউটলেটের সংখ্যা কমেছে। মার্চ শেষে আউটলেটের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৬১৩টি। আর জুন শেষে আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৭৩টি। সেই তিন মাসে আউটলেটের সংখ্যা কমেছে ১৪০টি।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন সহজ করতেই মূলত এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয়েছে। এটা সারা দেশে অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ সাধারণ মানুষ হাতের কাছে ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছে। তারা এসব এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট থেকে ঋণও নিতে পারছে।
জানা গেছে, দেশের সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতেই ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। যদিও ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করা হয়। আর ২০১৪ সালে প্রথম এ সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। এখন পর্যন্ত সেরা তিনে অবস্থান করছে ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী জানান, আমাদের দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী এখনও ব্যাংক সেবার বাইরে। তাদের এই সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে এজেন্ট ব্যাংকিং আগামী দিনে আরও বড় ভূমিকা রাখবে। জানা যায়, সিংহভাগ আমানত আসছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের এজেন্টের মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ হয়েছে ৩৫ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা এসেছে ইসলামী ধারার ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেট থেকে, যা মোট আমানতের ৫৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বাকি ৪৫ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৫১০ কোটি টাকা এসেছে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর এজেন্টের মাধ্যমে।
















