সম্প্রতি ঈদ-আনন্দে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছে মুসলিম বিশ্ব। শুধু বঞ্চিত হয়েছে মুসলমানদের পূর্ণভূমি খ্যাত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাবাসী। এখানে ঈদের আনন্দ দূরে থাক- ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজা উপত্যকায় মৃত্যুর মিছিলে বেঁচে যাওয়া মানুষের আর্তনাদ শোনারও যেন কেউ নেই। বধির-অন্ধ বিশ্ব মুসলিম কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ওআইসির মতো সংগঠনেও গাজাবাসীকে রক্ষায় যেন তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। মুসলিম বিশ্বের এমন নীরব ভূমিকায় আরও বেপরোয়া ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল। বর্তমানে গাজায় পরিস্থিতি এতো ভয়াবহ নৃশংস যে, বর্ণনাও করা যাচ্ছে না। আধুনিক বিশ্বে একটি জাতি গোষ্ঠীকে গণহত্যার মাধ্যমে নিধনযজ্ঞের মিশনে ইসরাইলের এমন ন্যক্কারজনক ভূমিকা বন্ধ করতে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বনেতাসহ সবার চোখের সামনে ইতিহাস থেকে গাজা উপত্যকার নাম মুছে দেওয়ার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। সেই ষড়যন্ত্রে গা ভাসিয়ে চলছে আরব বিশ্বের মুসলিম নেতারাও। বিশেষ করে আলজেরিয়া, বাহরাইন, কমোরোস দ্বীপপুঞ্জ, জিবুতি, মিসর, ইরাক, ইরান, জর্ডান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, লিবিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, তিউনিসিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেনের নেতারা গাজা ইস্যুতে মুখে কুলপ এঁটেছেন। তাছাড়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইয়েলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশনে গাজাসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে পশ্চিমা আগ্রাসনের পক্ষে সমর্থন রয়েছে তাদের। বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় ইসরাইয়েলের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বন্ধে সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া, তুরস্কসহ বিশ্বের প্রভাবশালী ইসলামী রাষ্ট্রগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকায় আছে। ওই দেশের রাষ্ট্রনায়করা ঘুমিয়ে আছেন, তাদের টনক নড়ছে না। গাজা উপত্যকায় রক্তবন্যার খবর যেন তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। বিশ্বের নানা গণমাধ্যমে গাজার যে ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শুধু অত্যন্ত মর্মন্তুদই নয়, ভয়াবহ বার্তাও বটে। সেখানে নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষের গগনবিদারি কান্না থামছে না। স্থল ও আকাশ পথে ইসরাইলি বাহিনীর উপর্যুপরি হামলায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে ভূস্বর্গীয় গাজা উপত্যকা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট মুসলিম বিদ্বেষী ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্লাঙ্কচেক সমর্থন পেয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গাজাকে এবার পুরোপুরি শেষ করার মিশনে নেমেছে। ইসরাইলকে একরকম সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের বেশকিছু দেশও। তাদের সমর্থনেই মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেয়ার মিশন শুরু করেছেন নেতানিয়াহু। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই গাজাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা তার। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হামাস নির্মূলই নেতানিয়াহুর একমাত্র লক্ষ্য না। এই উপত্যকায় ইসরাইলিরা দখলদারিত্ব চান। যা গাজার জন্য সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। যারা বেঁচে আছেন তারাও সেখানে এক টুকরো রুটির জন্য হাহাকার করছেন। বোমার আঘাতে নয় খাদ্য সংকটেই প্রাণ হারাবেন বহু ফিলিস্তিনি, এমনটাও আশঙ্কা অনেকের। এরইমধ্যে নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফর নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে গাজাবাসীর মনে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আরব ও মুসলিম বিশ্ব যতদিন ঘুমিয়ে থাকবে, ততদিন গাজায় গণহত্যা ও নৃশংসতা চলবে। তাছাড়া, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় গাজায় হত্যা, রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ হবে না। কারণ, তারা ফিলিস্তিনিদের রক্তের ওপর দিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন।
এদিকে, গাজা উপত্যকায় ৯০ শতাংশ মানুষ এরইমধ্যে তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। গাজার বর্তমান ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ছবির মতো সুন্দর এই উপত্যকা এখন মৃত্যুপুরী। প্রতিদিনই মৃত্যুর প্রহর গুনছে গাজাবাসী। ইসরাইলি বোমার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না নারী থেকে শিশু কেউই। মাত্র দেড় বছরে গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইসরাইলি বাহিনী। ঘরবাড়ি হারিয়েছে প্রায় ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি। যা গাজা উপত্যকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ। প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। আহত হয়েছেন কয়েক লক্ষাধিক মানুষ। প্রথম পর্যায়ের ৪২ দিনের যুদ্ধবিরতিতে দুই পক্ষের মধ্যে বন্দিবিনিময় হয়। এই সুযোগে শত শত ফিলিস্তিনি ফিরে আসে নিজ আবাসভূমিতে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের যুদ্ধবিরতির বদলে রোজার মধ্যে গত ১৮ মার্চ থেকে ব্যাপক হামলা শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী। সেই থেকে ধ্বংস আর মৃত্যুর মিছিল ও আহাজারিতে গাজার বাতাসে নিশ্বাস নেয়া এখন কঠিন। অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গাজাবাসী। এতকিছুর পরও একেবারে নিশ্চুপ মুসলিম বিশ্ব। ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিবেশি লেবানন, ইয়েমেন, ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বেশিরভাগ আরব রাষ্ট্রগুলো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার উপত্যকার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ জায়গায় এখন আর কোনো ‘নিরাপদ’ অঞ্চল নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলার জেরে গাজার হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ও আশ্রয়শিবির ছেড়ে পালাচ্ছেন। এতে গাজায় আবার বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন করে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করা রাফাহ শহরের দিকে ইসরায়েলি বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। তারা এই শহর দখল করতে চায় বলে খবরে জানানো হয়। ঘরবাড়ি ও আশ্রয়শিবির থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার গাজাবাসীর শেষ আশ্রয়স্থল ছিল রাফাহ। ইসরায়েলি বাহিনী যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করে গত মাসে আবার গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর রাফাহ দখল করতে নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা শহরের উত্তরের শেজায়া এলাকা থেকে বাসিন্দাদের চলে যেতে হুমকি দিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রাণভয়ে ওই এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে হেঁটে, অনেকে গাধার গাড়ি, আবার অনেকে মোটরসাইকেল ও ভ্যানে চড়ে পালাচ্ছেন।
সেখানকার বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, ‘আমরা মরতে চাই। তাদের আমাদের মেরে ফেলতে এবং এই জীবন থেকে মুক্তি দিতে দিন। আমরা এমনিতে বেঁচে নেই। আমরা মৃত।’
উল্লেখ্য, গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩৮ জন। গত জানুয়ারিতে দু’পক্ষের মধ্যে একটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়; কিন্তু হামাস চুক্তি মানছে না অভিযোগ তুলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গত ১৮ মার্চ থেকে আকস্মিকভাবে গাজায় ফের হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। তারপর থেকে সেখানে নতুন করে নিহত হয়েছে দেড় হাজারের বেশি। হামলার মুখে লোকজন ফের বাড়িঘর ছাড়তে শুরু করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন করে ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ক্রমশ গাজার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে দখলদার ইসরায়েল।
৭ এপ্রিল লাইভ প্রতিবেদনে তুর্কিভিত্তিক গণমাধ্যম টিআরটি জানিয়েছে, দখলদার বাহিনী এখন গাজার ৫০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। এর সঙ্গে ক্রমশ সংকুচিত জমির টুকরোয় আটকে পড়ছে ফিলিস্তিনিরা।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বৃহত্তম এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, কৃষিজমি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। জায়গাগুলো বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হয়েছে।
পৃথক প্রতিবেদনে টিআরটি জানিয়েছে, সোমবার গাজার মধ্যাঞ্চল থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশ জারি করছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনী মধ্য গাজার ফিলিস্তিনিদের পালাতে বাধ্য করে চলেছে। সেই সঙ্গে দেইর আল বালাহ শহর থেকেও নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আভিচায় আদরাই তার এক্স-পোস্টে দেইর আল বালাহর পাঁচটি এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার একটি মানচিত্রও শেয়ার করেছেন।
উপসংহার : স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী ফিলিস্তিনীদের পক্ষে বিশ্বব্যাপী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যবদ্ধ সমর্থন জানিয়ে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল কোনোভাবেই বিশ্ব মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনের নাম যেন মুছে দিতে না পারে সেদিকে মুসলিম বিশ্বের ঘুম ভেঙে এখনই টনক নড়ার উপযুক্ত সময়।
লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক সবুজ বাংলা
ই-মেইল: [email protected]
শামসুর রহমান 























