৬৭৭৯ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ৪,৩৪৫ কোটি টাকা ব্যয়
ইট-বালুতে ফাঁকি, প্রশ্নবিদ্ধ কাজ
সুফল পাচ্ছে না জনগণ, বাড়ছে ভোগান্তি
ছিল না প্রকল্পের পূর্ণ পুরিকল্পনা
টেকসই গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ ও কাদামাটির সড়ক থেকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে মুক্তি দিতে ‘গ্রামীণ মাটির রাস্তাসমূহ টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) করণ’ প্রকল্পটি নিয়েছিল সরকার। তবে এই প্রকল্পে নিম্নমানের কাজে হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠেছে। রাস্তায় নিম্নমানের ইটের ব্যবহার ও বালুর স্তর কম ব্যবহার করে এসব অর্থ লোপাট করা হয়েছে। টেকসই গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া ৬ হাজার ৭৭৯ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ৪ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি নির্মাণ ত্রুটির কারণে এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এদিকে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে পরিপূর্ণ পরিকল্পনা ও ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠেছে। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী এইচবিবি সড়ক নির্মাণে গ্রেড-১ ইট অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার হলেও প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে নির্মিত রাস্তায় ২০ শতাংশ স্থানে নিুমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক স্থানে ইটও কম ব্যবহার করা হয়েছে। অন্তত ২০ শতাংশ স্থানে ইটের নিচে বালুর স্তর কম থাকায় মসৃণতা হারিয়েছে রাস্তা। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, সড়ক নির্মাণে কোথাও ব্যত্যয় দেখলে তা দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এর পর্যক্ষেণ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৪৯৪টি উপজেলায় প্রকল্পে মোট চার হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও সঠিক সুফল পায়নি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। প্রকল্পের আওতায় ছয় হাজার ৭৭৯ কিলোমিটার মাটির রাস্তা এইচবিবি করণ করা হয়েছে। মেয়াদ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে জুন ২০২৫ নাগাদ। প্রকল্পটি জানুয়ারি ২০১৯ থেকে জুন ২০২২ মেয়াদে গ্রহণ করা হয়, যা ৪ নভেম্বর ২০১৮ সালে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। করোনা মহামারির অভিঘাত, স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নে সাময়িক বিলম্বসহ বিবিধ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে এক বছর বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০২৩ করা হয়। স্থানীয় চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আনুষঙ্গিক কাজ বাড়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০২৫ করা হয় এবং দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি একনেকে অনুমোদিত হয়।
এদিকে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ক্রয়-ক্ষমতা বাড়িয়ে সামগ্রিক দারিদ্র্য হ্রাস, গ্রামীণ মাটির রাস্তা দীর্ঘস্থায়ী-টেকসই করা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণ সহজ করা। প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি তথ্য উৎস ব্যবহার করে গুণগত এবং পরিমাণগত উভয় পদ্ধতির মাধ্যমে। পরিমাণগত পদ্ধতিতে ৮শ সুবিধাভোগী নিয়ে সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। গুণগত পদ্ধতিতে প্রকল্প সংশি¬ষ্ট ব্যক্তি, সম্ভাব্য সুবিধাভোগী ও সংশি¬ষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আট দলীয় আলোচনা এবং ৩৫টি নিবিড় সাক্ষাৎকার পরিচালনা করা হয়েছে।
আইএমইডি প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, রাস্তা এইচবিবিকরণে প্রস্থ ৩ মিটার ভেরিয়েবল থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে প্রস্থ ৩ মিটারের কম অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হয়েছে। এইচবিবিকরণের আগে রাস্তার সাবগ্রেড কম্পিটিশন যথাযথ না হওয়ায় অন্তত শতকরা ১০ শতাংশ স্থানে আংশিক মাটি দেবে গেছে। প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি না হওয়া এবং প্রকল্পের এক্সিট পরিকল্পনাও নেই। নির্মিত রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণর দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত চার অর্থবছরে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ৩৫টি জেলায় মোট ৩৬২টি আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যা নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উলে¬খ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সেকেন্ডারি তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রকল্পের সামগ্রিক তথ্য, উপাদান, ডিপিপি, প্রতিবেদনসহ ফলাফল বিষয়ক প্রাসঙ্গিক দলিলাদি পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে আটটি বিভাগ থেকে একটি করে আটটি কেস স্ট্যাডি করা হয়েছে এবং প্রাপ্ত ফলাফল প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। মার্চ, ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ৮৯ দশমিক ০২ শতাংশ ও বাস্তব অগ্রগতি ৯৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এইচবিবিকরণ কাজের দর তফসিল পরিবর্তন ও মাঠ পর্যায়ে চাহিদা এবং প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত ১২শ কিমি রাস্তা নির্মাণ পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের ডিপিপি দ্বিতীয়বার সংশোধন করা হয়। পুকুর, খাল বা নদী তীরবর্তী এলাকার ঢালের গাইডওয়াল, প্রতিরক্ষা দেওয়াল ও প্যালাসাইডিং স্থানীয় চাহিদার তুলনায় কম হয়েছে। প্রকল্পের বিষয়ে আরও কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আইএমইডি। প্রকল্পের বাস্তবায়নে রাস্তার উন্নতি হওয়ায় অতিরিক্ত ভারী যানবাহন, ট্রাক্টর, মালবাহী গাড়ি চলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তা দীর্ঘস্থায়ী করতে সড়ক প্রশস্ত ও আরসিসিকরণে আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। গ্রামীণ রাস্তা এইচবিবিকরণের গুরুত্ব পর্যালোচনা করে বিস্তারিত মাস্টার প¬্যান তৈরি/আপডেট করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অডিট আপত্তিগুলো উপজেলা পর্যায় থেকে প্রকল্প পরিচালক অফিসে দ্রুত পাঠাতে হবে যেন তা সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তীকরণ সহজ হয় সেই পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আমরা প্রকল্পগুলো তদারকি করছি। কিছু প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ ও প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছি। তার মধ্যে অন্যতম গ্রামীণ মাটির রাস্তাসমূহ টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ডকরণ প্রকল্প। প্রকল্পের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রকল্প পরিচালককে দেওয়া হয়েছে। যেখানে গ্যাপ আছে সেটা যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, আইএমইডি প্রতিবেদন হাতে এসেছে। আমরা বছর বছর গ্রামীণ সড়ক এইচবিবিকরণ করি। সড়ক নির্মাণে কোথাও ব্যত্যয় দেখলে আমরা দেখে ব্যবস্থা নেব। আমরা চাই কাজের মান ভালো হোক। আইএমইডি প্রতিবেদনে কোথাও কাজের গ্যাপ থাকলে তা দেখে আমরা ব্যবস্থা নেব।
























