নারীর মর্যাদা থেকে সম্পত্তির সমঅধিকার:  সময় কি নতুন করে ভাবার নয়?

এন. আই. মাকসুদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:


মানবসভ্যতার ইতিহাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ছিল শুধু একটি নতুন ধর্মের আবির্ভাব নয়; এটি ছিল একটি সমাজের নৈতিক, পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর পরিবর্তনের সূচনা।
সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজের সব মানুষ ও সব গোত্রের সামাজিক অবস্থা অবশ্য একই ছিল না। কোনো কোনো নারী সম্পদশালী ও ব্যবসায়ীও ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে নারীর প্রতি বৈষম্য, কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা, কিছু ক্ষেত্রে কন্যাশিশু হত্যার মতো নিষ্ঠুর প্রথা, নারীর উত্তরাধিকার বঞ্চনা এবং নানা সামাজিক অনাচারও বিদ্যমান ছিল।
এই সমাজেই ইসলামের আগমন ঘটে।
পবিত্র কুরআন এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এমন বহু সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, যেখানে দুর্বল মানুষের অধিকার উপেক্ষিত হতো। বিশেষ করে নারীর জীবন, সম্পদ, বিবাহ, সম্মান এবং উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ইসলামের সংস্কার ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
যে কন্যার জন্ম ছিল কারও কাছে লজ্জা, ইসলাম তাকে দিল জীবনের মর্যাদা। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলের ৫৮–৫৯ আয়াতে সেই মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে, যেখানে কন্যাসন্তানের জন্মের সংবাদ শুনে কারও মুখ মলিন হয়ে যেত এবং সে লজ্জায় মানুষের কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখত।
কুরআন প্রশ্ন তুলেছে— সে কি অপমান সহ্য করে মেয়েটিকে রাখবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে?
এই মানসিকতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট।
একটি কন্যাশিশু বোঝা নয়।
তার জন্ম লজ্জা নয়।
তার জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
এটি ছিল নারীর অধিকারের একেবারে প্রথম স্তর—বেঁচে থাকার অধিকার।
নারী কারও সম্পত্তি নয়; তিনিই সম্পদের অধিকারী
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্কার হলো নারীর স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা।
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে—মাতা-পিতা ও নিকটাত্মীয়ের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষের যেমন নির্ধারিত অংশ আছে, নারীরও নির্ধারিত অংশ আছে।
আজ আমাদের কাছে এটি সাধারণ কথা মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এটি ছিল বিশাল পরিবর্তন।
নারীর মোহর তার নিজের।
নারীর সম্পদ তার নিজের।
নারী উত্তরাধিকার পেতে পারেন।
বিবাহের পরও তার অর্থনৈতিক পরিচয় বিলীন হয়ে যায় না।
অর্থাৎ ইসলাম নারীকে কেবল পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে।
তাহলে ভাইয়ের তুলনায় বোনের অংশ কিছু ক্ষেত্রে অর্ধেক কেন?
সূরা আন-নিসার ১১ নম্বর আয়াতে একটি নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার পরিস্থিতিতে একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমপরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখান থেকেই আমরা সাধারণভাবে বলে থাকি—
“ভাই পায় দুই ভাগ, বোন পায় এক ভাগ।”
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারী সব পরিস্থিতিতে পুরুষের অর্ধেক পান না। উত্তরাধিকারীর সম্পর্ক, সংখ্যা এবং আর কে কে জীবিত আছেন—তার ওপর অংশের হিসাব পরিবর্তিত হয়। কোনো কোনো অবস্থায় নারী ও পুরুষের নির্ধারিত অংশ সমানও হতে পারে।
অতএব ২:১ অনুপাতকে “একজন নারীর মূল্য একজন পুরুষের অর্ধেক”—এভাবে দেখা সঠিক নয়।
একটি ব্যক্তিগত ঐতিহাসিক প্রশ্ন
তারপরও আমার মনে একটি প্রশ্ন আসে।
যে সমাজে অনেক ক্ষেত্রে নারী আদৌ উত্তরাধিকার পেতেন না, সেখানে ইসলাম প্রথমে তার জন্য একটি বাধ্যতামূলক অংশ নির্ধারণ করল।
ভাবা যেতে পারে—সেই সমাজে যদি একেবারে শুরুতেই ঘোষণা করা হতো যে ছেলে ও মেয়ে সবক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সমান উত্তরাধিকার পাবে, তাহলে এত বড় সামাজিক পরিবর্তন গ্রহণ করা মানুষের জন্য আরও কঠিন হতে পারত।
এটি আমার একটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক চিন্তা।
আমি এটিকে কুরআনের ঘোষিত কারণ বলছি না। কারণ পবিত্র কুরআনে কোথাও বলা হয়নি যে সমাজ সমান অংশ গ্রহণ করবে না বলেই ২:১ অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে ইতিহাস বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি আলোচনায় আনা যায়—ইসলাম কি একটি কঠিন সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি বিশাল যাত্রা শুরু করেছিল?
আমার কাছে ইসলামের সামাজিক সংস্কারের মূল প্রবাহটি নারীর অধিকার কমানোর নয়, বরং অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা বৃদ্ধির।
এবার প্রশ্ন বাংলাদেশের
সপ্তম শতকের আরব সমাজ এবং ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এক সমাজ নয়।
আজ বাংলাদেশের মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত। তারা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ, ব্যাংকার, আইনজীবী এবং ব্যবসায়ী।
তারা আয় করেন।
তারা কর দেন।
তারা বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করেন।
অনেক পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হয়ে ওঠেন মেয়েরাই।
অনেক মেয়ে বিদেশে কাজ করে বাবা-মায়ের সংসার পরিচালনা করছেন। অনেক মেয়ে বাবার ব্যবসায় কাজ করছেন এবং পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছেন।
এ অবস্থায় একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে—
একই বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে ভাই ও বোনের জমি ও সম্পত্তিতে সমান অধিকার থাকা উচিত কি না?
এই প্রশ্ন করা ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।
বরং সময়ের বাস্তবতা সামনে রেখে একটি সামাজিক ও আইনগত আলোচনা শুরু করা।
বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় সাংবিধানিক রাষ্ট্র
বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় সাংবিধানিক রাষ্ট্র। আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন এবং পারিবারিক ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় ধর্মভেদে আলাদা আইন ও রীতি কার্যকর রয়েছে।
সংবিধান নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথাও বলে এবং রাষ্ট্র ও গণজীবনে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের নীতি স্বীকার করে।
এই বাস্তবতায় উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
দুই মেয়ে আছে—ছেলে নেই: বাবার সম্পত্তি কার?
এখানে আমাদের বর্তমান মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থার একটি বাস্তব উদাহরণ বিবেচনা করা যাক।
ধরা যাক, একজন বাবার কোনো ছেলে নেই। তাঁর দুই মেয়ে আছে।
তিনি সারাজীবন পরিশ্রম করে জমি, বাড়ি ও সম্পদ তৈরি করেছেন।
তিনি চান—
“আমার মৃত্যুর পর আমার সমস্ত সম্পত্তি আমার দুই মেয়েই পাক।”
কিন্তু প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পুত্র না থাকলে দুই বা ততোধিক কন্যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্মিলিতভাবে ২/৩ অংশের নির্ধারিত অংশ পান। এরপর আর কারা জীবিত উত্তরাধিকারী আছেন, তার ওপর নির্ভর করে অবশিষ্ট সম্পত্তি অন্য উত্তরাধিকারীর কাছে যেতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের উত্তরাধিকারবিষয়ক তথ্যব্যবস্থাতেও দেখা যায়, আসাবা বা অবশিষ্টভোগীদের শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে ভাই, ভাইয়ের পুত্র, চাচা ও চাচাতো ভাইসহ বিভিন্ন পুরুষ আত্মীয় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হতে পারেন।
এখানেই আমার বড় প্রশ্ন।
নিজের দুই মেয়ে থাকা অবস্থায় চাচা বা চাচাতো ভাই কেন সম্পত্তি পাবে?
ধরা যাক, ওই বাবা সারাজীবন নিজের দুই মেয়েকে বড় করেছেন। তাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। তাদের চিকিৎসা করেছেন। তাদের ভবিষ্যতের জন্য জমি কিনেছেন।
মেয়েরাও বৃদ্ধ বয়সে বাবাকে দেখাশোনা করেছে।
অন্যদিকে বাবার ভাই—অর্থাৎ মেয়েদের চাচা—হয়তো তাদের পড়াশোনা, চিকিৎসা অথবা জীবনের কোনো খরচ কখনো বহন করেননি। চাচার ছেলেও হয়তো এই পরিবারের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করেনি।
তবুও নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার পরিস্থিতিতে পার্শ্বীয় পুরুষ আত্মীয় সম্পত্তির অবশিষ্টাংশের দাবিদার হয়ে যেতে পারেন।
আমি মনে করি, এই বাস্তবতা নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।
দুই কন্যাসন্তান থাকা অবস্থায় একজন বাবার সম্পত্তির একটি অংশ এমন কোনো পার্শ্বীয় আত্মীয়ের কাছে যাবে কেন, যিনি সেই মেয়েদের জীবন ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব কখনো পালন করেননি?
“ছেলে নেই”—এটি কোনো পরিবারের অসম্পূর্ণতা নয়
আমাদের সামাজিক চিন্তারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
একজন মানুষের দুই মেয়ে থাকলে প্রায়ই বলা হয়—
“তার তো কোনো ছেলে নেই।”
কিন্তু কেন আমরা বলি না—
“তার দুই সন্তান আছে”?
দুই মেয়ে কি দুই সন্তান নয়?
তারা কি বাবার রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না?
তারা কি বাবা-মায়ের ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অংশ নয়?
একজন বাবার ছেলে না থাকা কোনো ঘাটতি নয়।
তার মেয়েরাই তার পরিবার।
মেয়েরাই তার উত্তরাধিকার।
মেয়েরাই তার নাম, স্মৃতি, মূল্যবোধ ও সম্পদের ধারাবাহিকতা বহন করতে পারে।
একজন বাবার নিজের অর্জিত সম্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা
আমি এখানে আরও একটি বিষয় আলোচনায় আনতে চাই—একজন ব্যক্তির নিজের অর্জিত সম্পত্তির ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা।
একজন মানুষ যদি নিজের শ্রম, মেধা ও উপার্জন দিয়ে সম্পত্তি তৈরি করেন এবং জীবদ্দশায় পরিষ্কারভাবে বলেন—
“আমার সব সম্পত্তি আমার দুই মেয়ের জন্য”
তাহলে সেই ইচ্ছা সহজে কার্যকর করার শক্তিশালী ও নিরাপদ আইনগত সুযোগ থাকা উচিত।
আমি মনে করি, একজন বাবার যদি কেবল দুই মেয়ে থাকে এবং তিনি চান তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সব সম্পত্তি দুই মেয়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হোক, তাহলে দেশের আইনব্যবস্থায় সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নের সহজ ও নিশ্চিত পথ থাকা প্রয়োজন।
সম্পত্তি শুধু সম্পদ নয়—এটি মেয়ের নিরাপত্তাও
আমাদের আরেকটি বাস্তবতা বুঝতে হবে।
বাবার দেওয়া জমি বা বাড়ি একটি মেয়ের জন্য শুধু অর্থ নয়। এটি হতে পারে তার জীবনের নিরাপত্তা।
একজন নারী বিবাহবিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে পারেন।
তিনি বিধবা হতে পারেন।
স্বামীর পরিবারে সমস্যায় পড়তে পারেন।
চাকরি হারাতে পারেন।
সন্তানদের নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন।
বৃদ্ধ বয়সে থাকার জন্য নিজের একটি বাড়ির প্রয়োজন হতে পারে।
এই সময় বাবার দেওয়া জমি বা সম্পত্তিই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
সেখানে এমন একজন চাচা বা চাচাতো ভাই, যিনি ওই মেয়ের জীবনে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি, তাঁর সম্পত্তিতে অগ্রাধিকার পাওয়ার প্রশ্নটি নতুন করে বিবেচনার দাবি রাখে।
ভাই-বোনের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন
আমি একইভাবে মনে করি, একজন বাবা যদি একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রেখে যান, বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের সমান সম্পত্তির অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হওয়া উচিত।
আজ অনেক মেয়ে ভাইয়ের সমান দায়িত্ব পালন করেন।
অনেক ক্ষেত্রে ভাই বিদেশে বা অন্য শহরে থাকেন, আর মেয়েই বাবা-মায়ের পাশে থেকে চিকিৎসা, সেবা ও দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করেন।
তাহলে সম্পদের প্রশ্নে তাকে কেন শুধু নারী হওয়ার কারণে কম বিবেচনা করা হবে—এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের সামনে আসতেই পারে।
আমি চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে একজন বাবা-মা চাইলে তাঁদের ছেলে ও মেয়েকে সহজে, আইনগতভাবে নিরাপদে এবং সমানভাবে সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারবেন।
ধর্মের বিরুদ্ধে নয়—সমাধানের জন্য আলোচনা
এ ধরনের বিষয়ে আবেগ কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষ কোনো সমাধান নয়।
একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করতে হবে।
অন্যদিকে আধুনিক বাংলাদেশের নারীর বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাকেও উপেক্ষা করা যাবে না।
তাই প্রয়োজন একটি জাতীয় সংলাপ।
ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমরা থাকবেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।
আইনবিদরা থাকবেন।
নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।
হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাধারণ বাবা-মা ও নারীদের কথা শোনা হবে।
তারপর দেখা যেতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি ন্যায়সংগত, গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত কাঠামো কী হতে পারে।
সাম্প্রতিক সম্পত্তি আইনও দেখায়—আইন পরিবর্তনশীল
এই জায়গায় সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত উদ্যোগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই।
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদে ঞৎধহংভবৎ ড়ভ চৎড়ঢ়বৎঃু (অসবহফসবহঃ) ইরষষ, ২০২৬ পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে দাতা তাঁর সন্তান, নাতি-নাতনি, বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি অথবা স্বামী/স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
বিশেষ করে দানকৃত সম্পত্তিতে দাতার আজীবন ব্যবহারাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখার বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ বলে মনে হয়েছে।
আমার মতে, এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি ইতিবাচক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ।
অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা জীবিত অবস্থায় সন্তান বা অন্য কাউকে সম্পত্তি দান করে দেন; কিন্তু পরবর্তীতে সেই সম্পত্তি নিয়ে তাঁদের নিরাপত্তা, বসবাস বা ব্যবহারাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। নতুন ব্যবস্থাটি দাতার স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে বিবেচনায় এনে সেই ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মা, বিধবা নারী এবং জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের আইনি সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পত্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবনকালীন অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হলে তা পারিবারিক বিরোধ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
আমার দৃষ্টিতে, আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের সম্পত্তির অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়সংগত স্বার্থ রক্ষা করা। সে বিবেচনায় দানকৃত সম্পত্তিতে দাতার আজীবন ব্যবহারাধিকার সংরক্ষণের এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
তবে এর বাস্তব প্রয়োগ যেন সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হয় এবং দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের অধিকারই যেন সুস্পষ্টভাবে সুরক্ষিত থাকে—এ বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার—এটি ভাই-বোনের সমান উত্তরাধিকার আইন নয়; এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক আইনগত সংস্কার।
তারপরও এই আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণ করে—মানুষের প্রয়োজন ও সময়ের বাস্তবতার কারণে সম্পত্তি-সংক্রান্ত আইন নিয়ে সংসদ নতুন করে ভাবতে পারে।

  • তাহলে উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা কেন হবে না?
  • আমি কী ধরনের সংস্কার দেখতে চাই
  • আমি চাই, এই দেশে এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হোক যেখানে—
  • একজন বাবা চাইলে তাঁর ছেলে ও মেয়েকে সমান সম্পত্তি দিতে পারবেন।
  • শুধু কন্যাসন্তান থাকলে তিনি চাইলে তাঁর সম্পূর্ণ সম্পত্তি মেয়েদের জন্য নিশ্চিত করতে পারবেন।
  • নিজের জীবিত কন্যাসন্তান থাকা অবস্থায় দূরবর্তী পুরুষ আত্মীয়ের দাবি যেন মেয়েদের আর্থিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে—তার সমাধান খোঁজা হবে।
  • একই সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সংবিধানের মূল্যবোধের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য তৈরি করা হবে।

আমি কোনো ধর্মীয় বিধানকে অবজ্ঞা করার আহ্বান জানাচ্ছি না।
আমি শুধু একটি প্রশ্ন তুলছি—
একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের বাস্তবতা, নারীর দায়িত্ব ও সন্তানের নিরাপত্তাকে সামনে রেখে আমাদের উত্তরাধিকার আইন নিয়ে আরও আলোচনা করার সময় কি আসেনি?
ইসলামের ইতিহাস আমাদের পরিবর্তনের সাহসও শেখায়
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এমন একটি সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলেছিলেন, যেখানে সেই কথা বলা সহজ ছিল না।
কন্যাশিশুর জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নারী উত্তরাধিকার পেয়েছে।
নারী মোহরের অধিকার পেয়েছে।
নারী সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার পেয়েছে।
নারীকে জোর করে কোনো পুরুষের সম্পত্তির অংশ হিসেবে গণ্য করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
আমার কাছে এসব ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—
মানুষের মর্যাদা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে ভয় পাওয়া উচিত নয়।
আমার দুই মেয়ে হলে আমি চাই তারা দুজনই আমার সব সম্পত্তি পাক
এই আলোচনাকে আমি একটি খুব সাধারণ পারিবারিক অনুভূতি দিয়ে শেষ করতে চাই।
ধরা যাক, আমার দুই মেয়ে।
আমি তাদের জন্ম থেকে বড় করলাম।
তাদের শিক্ষিত করলাম।
তাদের ভালোবাসলাম।
তাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য সারাজীবন কাজ করে বাড়ি ও জমি তৈরি করলাম।
তাহলে আমার মৃত্যুর পর আমি যদি চাই—
“আমার যা কিছু আছে, আমার দুই মেয়ে সমানভাবে পাক”
তাহলে আমার সেই ইচ্ছাকে সম্মান করার একটি সহজ ও শক্তিশালী আইনগত ব্যবস্থা থাকা উচিত।
আমি চাই না আমার ভাই বা আমার ভাইয়ের ছেলে শুধু পুরুষ আত্মীয় হওয়ার কারণে সেই সম্পত্তির এমন একটি অংশ নিয়ে যাক, যে সম্পত্তি আমি আমার সন্তানদের জন্য তৈরি করেছি।
কারণ আমার ভাইয়ের সন্তান আমার সন্তান নয়।
আমার দুই মেয়েই আমার সন্তান।
তাদের জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎই আমার প্রথম দায়িত্ব।
উপসংহার
নারীর অধিকার নিয়ে ইসলামের ইতিহাস শুরু হয়েছিল এমন একটি সময়ে, যখন একটি কন্যাশিশুর জীবনের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
তারপর নারী সম্পত্তির অধিকার পেয়েছে।
উত্তরাধিকার পেয়েছে।
মর্যাদা পেয়েছে।
আজ বাংলাদেশের সামনে হয়তো পরবর্তী প্রশ্নটি হলো—
সেই অধিকারকে বর্তমান সময়ের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে আরও কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়?
আমি এমন বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে বাবা-মায়ের কাছে সন্তান মানে সন্তান—ছেলে অথবা মেয়ে নয়।
আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো বাবা শুধু “আমার ছেলে নেই”—এই কারণে নিজের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পত্তির উদ্বেগে থাকবেন না।
আমি এমন ব্যবস্থা চাই, যেখানে একজন বাবা চাইলে বলতে পারবেন—
“আমার দুই মেয়েই আমার উত্তরাধিকারী; আমার সম্পত্তি তাদেরই।”
আমি চাই ভাই ও বোনের সমান সম্পত্তির অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা হোক।
আমি চাই আলেম, আইনবিদ, সংসদ সদস্য, নারী, বাবা-মা এবং সাধারণ মানুষ এ নিয়ে কথা বলুন।
কোনো ধর্মকে আঘাত করে নয়।
কোনো পক্ষকে ছোট করে নয়।
বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে।
কারণ সময় বদলেছে।
নারীর দায়িত্ব বদলেছে।
পরিবারের কাঠামো বদলেছে।
সমাজ বদলেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—
আমাদের আইন ও চিন্তাও কি সময়ের ন্যায়বোধের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় আসবে না?


লেখক: এন. আই. মাকসুদ, চিন্তক ও গবেষক

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL