ময়মনসিংহের আদালত চত্বর থেকে অপহরণ, আটকে রেখে ১১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চাওয়ার পর উল্টো অপহরণের শিকার ব্যক্তিকেই আসামি করে আদালতে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে কোতোয়ালী মডেল থানার পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শিবিরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জমির বায়নাপত্র নিয়ে বিরোধের জেরে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শামছুল হক নামের এক ব্যক্তি আদালতে হাজিরা দিতে এসে অপহরণের শিকার হন। পরে তাঁকে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে তাঁর পরিবারের কাছে ১১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে অপহরণকারীরা কোতোয়ালী মডেল থানায় হাজির হন।
তবে থানায় যাওয়ার পরও শামছুল হক তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং পরদিন ২৯ অক্টোবর ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। অপহরণের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও মামলা গ্রহণ না করে ভুক্তভোগীকেই আসামি করার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, জমির বায়নাপত্রসংক্রান্ত বিরোধের জেরে শামছুল হক আদালতে হাজিরা দিতে ময়মনসিংহে আসেন। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের নিচতলার বারান্দা থেকে বের হওয়ার সময় বাদীপক্ষের লোকজন ও তাঁদের সহযোগীরা তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। পরে তাঁকে একটি অজ্ঞাত বাগানবাড়িতে আটকে রেখে বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো হয়। এ সময় তাঁর মুঠোফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ১১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা নিরুপায় হয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান। পরে থানা থেকে যোগাযোগ করা হলে অপহরণে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শামছুল হককে নিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানায় উপস্থিত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, থানায় যাওয়ার পর ডিআই ওয়ান তথা ডিএসবি কর্মকর্তা জসীমউদ্দিন এবং কোতোয়ালী মডেল থানার অপারেশন পরিদর্শক আজিজুল হক ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হন। তাঁরা অপহরণের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য থানার ওসি মো. শিবিরুল ইসলামের কাছে উপস্থাপন করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ সামনে আসার পরও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। বরং জমির লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের কথা তুলে ধরে শামছুল হককে আটকে রাখা হয়। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওসি শিবিরুল ইসলাম বলেন, “সে তো টাকা নিছে, বাদীর টাকাটা দিয়ে দেক। তুমি মধু খাবা, তুমি এখন টাকা দিবা না—এইটা তো হবে না!”
ওসির এই বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগটি সত্য হলে, জমি বা অর্থসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তির নামে কাউকে থানায় আটকে রেখে টাকা পরিশোধে বাধ্য করার চেষ্টা পুলিশের আইনগত এখতিয়ার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি বা অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে অপহরণ কিংবা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ যুক্ত হলে প্রতিটি অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী পৃথকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোনো দেওয়ানি বিরোধ থাকলেই অপহরণ বা অন্য কোনো সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করা যায় না। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাঁকে আইনবহির্ভূতভাবে আটক রাখা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ পরিশোধে বাধ্য করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে কাউকে আটক রাখা, গ্রেপ্তার দেখানো কিংবা আদালতে পাঠানোর ক্ষেত্রে আইনানুগ ভিত্তি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শামছুল হক হৃদ্রোগে আক্রান্ত এবং তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তাঁকে রাতভর থানার লকআপে আটকে রাখা হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক আচরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।
২৯ অক্টোবর বিকেলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় শামছুল হককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে তাঁকে গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ, মামলাসংক্রান্ত নথি, আদালতে উপস্থাপনের বিবরণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের ভিত্তি ছিল কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু অপহরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ থেকেই তাঁকে আইনগতভাবে নির্দোষ বা গ্রেপ্তার সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি না থাকলে সেটিও তদন্তের বিষয়।
ঘটনাটি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কার্যকারিতা এবং জরুরি সহায়তা চাওয়া নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। জরুরি সেবায় ফোন করার উদ্দেশ্যই হলো বিপদে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। অভিযোগ অনুযায়ী, সহায়তা চাওয়ার পরও যদি ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা না দিয়ে উল্টো আসামি করা হয়ে থাকে, তাহলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।
এ ঘটনায় কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি মো. শিবিরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এবং অপহরণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে। একই সঙ্গে শামছুল হকের পরিবারের বক্তব্য, আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট থানার মামলা ও গ্রেপ্তারসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন।
অপহরণের অভিযোগ, মুক্তিপণ দাবি, থানায় আটকে রাখা এবং পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, দায়ীদের শনাক্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।