জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় থাকলেও আবাসিক হলগুলোতে বাড়ছে বিদ্যুৎ অপচয়ের প্রবণতা। শিক্ষার্থীদের অনেকে রুমে না থাকলেও ফ্যান ও লাইট চালু রেখে বের হয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
দেশের অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে। তবে এই সুবিধার বিপরীতে এক শ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদ্যুৎ অপচয়ের প্রবণতা বাড়ছে। ক্লাস বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকার সময়ও অনেকেই রুমের ফ্যান ও লাইট অযথা চালু রেখে যাচ্ছেন।
ঢাকা পল্লিবিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মো. রাসেল মাহমুদ জানান, জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ২৪ থেকে ২৫ মেগাওয়াট। তবে ক্যাম্পাস সাবস্টেশনে ২৮ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
সরেজমিনে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আবাসিক হল ঘুরে দেখা যায়, অনেক রুমে শিক্ষার্থী না থাকলেও ফ্যান ও লাইট চালু রয়েছে। এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ সুজন ইসলাম বলেন, অনেকেই মনে করেন বিদ্যুৎ বিল তাদের দিতে হচ্ছে না, তাই ফ্যান বা লাইট জ্বললেও সমস্যা নেই। আবার কেউ কেউ তাড়াহুড়ো করে বের হওয়ার সময় সুইচ বন্ধ করেন না।
বেগম সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী অদিতি মোদক বলেন, হলে অনেক সময় দেখা যায়, রুম বন্ধ থাকলেও ফ্যান ও লাইট চালু রয়েছে। অথচ রুমে কেউ নেই। এটি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ অপচয় হলে দিনশেষে এর প্রভাব পুরো ক্যাম্পাসের ওপরই পড়ে।
বিদ্যুৎ অপচয়ের এই প্রবণতা রোধে জাকসু থেকে কোনো সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হবে কি না— জানতে চাইলে জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, রুমে কেউ না থাকা অবস্থায় লাইট-ফ্যান চালু রেখে যাওয়া চরম দায়িত্বহীনতা। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার অর্থ জাতীয় সম্পদের অপচয় করা নয়। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যেও জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতেও ক্যাম্পাসে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে হলের রুমে কেউ না থাকা সত্ত্বেও ফ্যান-লাইট চালু রাখার মতো দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে হল প্রভোস্টদের অবহিত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ভবন, হল ও সংশ্লিষ্ট সবাই বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হলে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ দেশের অন্য প্রান্তের গ্রামীণ মানুষ বা কলকারখানায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া ও অপচয় রোধ করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মনে করছে, বিদ্যুৎ অপচয়ের এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কেবল আইন করে বা শাস্তি দিয়ে এই অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক সচেতনতা এবং জাতীয় সম্পদের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করাই এই মুহূর্তে মূল চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী মো. শরীফুল ইসলাম ভূইয়া জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসন নিজস্ব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পিডিবির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তবে হলগুলোতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে লোড বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে।