* চতুর্থ দিনেও সড়কে বিক্ষোভ-অবরোধ-ভাঙচুর
* নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
* আন্দোলনে উস্কানিদাতাদের ধরতে চলছে চিরুনি অভিযান
* পুলিশের পাশাপাশি ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চতুর্থ দিনেও রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। ইতোমধ্যেই অনেক কারখানা বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষ দমাতে মোতায়েন করা হয়েছে ১২ প্লাটুন বিজিবি। সার্বিক পরিস্থিতি নজরদারিতে ড্রোন নামানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বুকে ধারণ করা হয়েছে বডি ক্যামেরা। যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। তবে আন্দোলনে উস্কানিদাতাদের ধরতে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান।
মিরপুর
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, টানা চতুর্থ দিনের মতো মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর ও পল্লবীর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে কয়েক হাজার শ্রমিক জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তাদের অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা মূল সড়কে নেমে এলে পুলিশ বাধা দেয়। বাধা পেয়ে উত্তেজিত শ্রমিকেরা বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় মিরপুরের কালশি রোডে পুলিশ সদস্যকে একা পেয়ে পিটিয়ে আহত করার ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাসের মুখে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
পুলিশ জানায়, রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে পল্লবী থানার এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ সদস্যের নাম সাইমন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাক শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে কনস্টেবল সাইমন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ ছাড়া পল্লবীর কালশী রোডে পুলিশকে মারধর ও হামলার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় মিরপুরে দুজনকে আটক করা হয়েছে। পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে দুই পক্ষের সংঘর্ষের কারণে স্টেশনের ভেতরে অনেক সাধারণ যাত্রী আটকা পড়েন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই স্টেশনে কোনো ট্রেন থামানো এবং যাত্রী ওঠানামাও বন্ধ রাখে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।
এমআরটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম জানায়, সকাল থেকেই মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে পোশাকশ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেওয়ায় মেট্রোরেলের যাত্রী ও স্টেশনের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১১ স্টেশনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন। তবে মেট্রোরেলের অন্য স্টেশনগুলোতে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
পুলিশ জানায়, সকাল ১০টার থেকে আন্দোলনকারীরা মিরপুর-১১ নম্বরের মূল সড়কে আসতে থাকে। পরে পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে মূল সড়কে এক ঘণ্টার মতো যান চলাচল বন্ধ থাকে। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে আবার রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।
এর আগে, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে বেশ কয়েক দিন ধরেই মিরপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন পোশাকশ্রমিকেরা। গত শনিবার ও রোববার মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ করা হয়। গত রোববার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিন মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পুলিশ ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গত সোমবারও শ্রমিকেরা বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে আবারও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা সত্ত্বেও নতুন করে সড়কে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন পোশাকশ্রমিকেরা। বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
সাভার-আশুলিয়া
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ ও বিভিন্ন ভাতা বাস্তবায়নের দাবিতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকার সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। টানা চতুর্থ দিনের মতো মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে কয়েকটি পোশাক কারখানায় কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। একপর্যায়ে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে বেশ কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এদিকে জানা যায়, বিকেলেও সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মাহসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা।
এর আগে সকালে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা স্বাভাবিক নিয়মে কাজে যোগ দেন। তবে কয়েকটি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে কোথাও কোথাও কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি কারখানার কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড আঞ্চলিক মহাসড়কের বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর অংশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। এ সময় সড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।
এ দিকে শ্রমিকদের জন্য মজুরি কমিশন গঠন করা হয়েছে, তাই এখন আর আন্দোলন করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে সাভার উপজেলা পরিষদে গার্মেন্টস শিল্পে চলমান অস্থিরতা নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে তারা সফল হতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মামলা ও গ্রেপ্তারের কথা জানাল পুলিশ
শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং অবৈধভাবে আন্দোলনের অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি জানান, শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। সাভার-আশুলিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্থানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলে উদ্বেগ থাকলেও বর্তমানে সাভার-আশুলিয়ার সব মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
গাজীপুর
বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরে আজও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এতে বন্ধ হয়ে যায় মহাসড়কে যান চলাচল। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মাহসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। এতে তৈরি হয়েছে তীব্র যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে, গাজীপুরের চন্দ্রায় ডিভাইন ও ইন্টার স্টপ কারাখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়ে সড়ক অবরোধ করতে গেলে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
এদিকে, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গাজীপুরে বিজিবি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ১০ প্লাটুন থেকে বাড়িয়ে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ২১ থেকে বাড়িয়ে ২৫ জন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাঈন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ৮টার কিছু আগে শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক এলাকায় অবরোধের চেষ্টা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন। এদিকে, আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে রেখেছে শ্রমিকরা। নিরাপত্তা শঙ্কায় বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক দিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। এদিকে, আন্দোলনের কারণে বেশ কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আবারও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বেলা তিনটার দিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় বিভিন্ন কারখানা থেকে বেরিয়ে শ্রমিকেরা সড়কে নেমে আসেন। তারা লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় অবরোধ করলে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও চালকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেখানে জলকামান ও এপিসি নিয়ে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শিল্প পুলিশ-৪ এর পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদেরকে বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। এর আগে, গত সোমবার একই দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেছিলেন। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিক্ষোভ শুরু করেন ফতুল¬ার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। আধা ঘণ্টা পর তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। বেলা আড়াইটার দিকে এ সড়কের ভূঁইগড় এলাকায় শ্রমিকের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থান নেয়। তবে এ সময় হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি বিসিক শিল্পনগরী ও সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছিল। শ্রমিকেরাও কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তবে বেলা সোয়া তিনটার দিকে কাঠেরপুল এলাকায় নতুন করে শ্রমিকেরা সড়কে নেমে আসে।
বিজিবির ভাষ্য
এদিকে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে দিনভর শ্রমিক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে মিরপুর, পল্লবী, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব এলাকায় মোট ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করেছে বাহিনীটি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিজিবির সদর দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজিবি জানায়, বর্তমানে গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী এলাকায় ১০ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকায় দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এছাড়া আশুলিয়া ও মিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চলগুলোর সার্বিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিভিন্ন সংযোগস্থল এবং সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত বিজিবি সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে, বিজিবি সদর দপ্তরে স্থাপিত কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল থেকে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার লাইভ ফুটেজ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যায়নের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে দেয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও।
বিজিবি জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলে জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে তারা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিজিবির সমন্বিত কার্যক্রম এবং ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।