চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাধীন নন্দীরহাট গ্রামের ঐতিহাসিক সত্য সাহা জমিদার বাড়ি অযত্ন–অবহেলায় ধ্বংসের মুখে। লাল ইট ও চুনা-মাটি দিয়ে নির্মিত দুই গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাসাদ, কাচারি ঘর, বিগ্রহ মন্দির, ঘাটবাঁধানো পুকুর ও বাগানবাড়ি—সবই এখন ভাঙন ও জরাজীর্ণতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সংস্কার–সংরক্ষণ না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে বাড়িটির ইতিহাস ও গৌরব। স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় এ বাড়ির আঙিনা প্রায় ২০০ একরজুড়ে বিস্তৃত ছিল। সারিবদ্ধ দ্বিতল–ত্রিতল দালানকোঠা, বৈঠকখানা ও পূজামণ্ডপের নকশা–কারুকার্য আজও চোখে পড়ে। ভেতরে ছিল বড় আকারের শয়নকক্ষ, গুদাম, ধানের গোলা, রান্নাঘর, সেরেস্তা ঘর, কারুকার্যখচিত বিগ্রহ মন্দির, তিনটি ঘাটবাঁধানো পুকুর, গোয়ালঘর ও ঘোড়াশালা। বাড়ির মূল গাঁথুনিতে লোহা/রড ব্যবহার ছিল না—পুরোটাই ঐতিহ্যিক স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। জমিদার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ১৮৯০ সালের দিকে এই রাজবাড়ি নির্মাণ করা হয়; ১৯২০ সালে শ্রী লক্ষ্মীচরণ সাহা, মাদল সাহা ও নিশিকান্ত সাহা তিন ভাই মিলে এ অঞ্চলে জমিদারির সূচনা করেন। ১৯৩৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর এখানে জন্ম নেন একুশে ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি সুরকার–সঙ্গীত পরিচালক সত্য সাহা। ১৯৫০ সালে জমিদারি বিলুপ্তির পরও বাড়িটি স্থানীয় ইতিহাস–ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে থাকে। সত্য সাহার শিক্ষাজীবন নারায়ণগঞ্জ রামকৃষ্ণ স্কুলে এসএসসি (১৯৪৬–৪৮) এবং পরবর্তীতে কলকাতায় বিএ (১৯৫১–৫২)। ১৯৫৫ সালে ‘সুতরাং’ ছবির মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র সঙ্গীত পরিচালনায় পথচলা শুরু করেন; পরিবারের দাবি, ছবিটির শুটিংয়ের ১৮ দিন এই জমিদার বাড়িতেই হয়েছিল। ১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর দুই পুত্র—সুমন সাহা ও ইমন সাহা—এখনও সঙ্গীতাঙ্গনে কাজ করছেন। এ অঞ্চলে জমিদার প্রসন্ন সাহার সময়কার আভিজাত্য ছিল দেখার মতো—দুইটি ঘোড়ার গাড়ি, দুই নেপালি দারোয়ান, অর্ধশতাধিক চাকর–বাকর, নয় জোড়া হালের গরু, গোলাভরা ধান ও পুকুরভরা মাছের বর্ণনা আজও শোনা যায়। প্রতিদিন ২০০–৩০০ মানুষের জন্য রান্না হতো। প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কৃষকের উপস্থিতিতে রাজ পুণ্যাহ উৎসব বসত। নাজিরহাট, চারিয়া, মির্জাপুর, ধলই, গুমারমর্দন, হাটহাজারী, জোবরা, আলীপুর, ফতেয়াবাদসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল জমিদারির বিস্তার। বর্তমানে বাড়িটির বিভিন্ন অংশে দেয়াল ক্ষয়, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়া, কাঠের কারুকার্যে পোকায় ধরার মতো সমস্যা প্রকট। এলাকাবাসীর দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে দ্রুত তালিকাভুক্ত করে বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ, ন্যূনতম মেরামত ও দর্শনার্থীদের জন্য পথনির্দেশ–তথ্যফলক স্থাপন করা জরুরি। প্রয়োজন হলে ঐতিহ্যভিত্তিক জাদুঘর হিসেবে উন্নয়ন করলে স্থানীয় পর্যটন ও সংস্কৃতি চর্চায় নতুন দিগন্ত খুলবে।
এসএস/সবা























