ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন উপজেলার প্রান্তিক সীমানায় অবস্থিত চরউমেদ ইউনিয়ন। লালমোহন উপজেলার অতীব পুরাতন ও বৃহত্তম বাজারের মধ্যে গজারিয়া বাজার অন্যতম। নানা কারণে বরিশাল বিভাগব্যাপী এ বাজারটির পরিচিতি থাকলেও প্রধান পরিচিতি পুরো নিপুণ হাতে নৌকা তৈরির প্রসিদ্ধির জন্য। যারা নৌকা তৈরি করে জেলেদের কাছে বিক্রি করেন তাদেরকে ব্যাপারী বলা হয়। আর প্রসিদ্ধ নৌকা তৈরির বাজার গজারিয়ায় রয়েছে এরকম ১৫জন ব্যাপারী। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মামুন হোসেন, মো. নাগর, মো. কালাম, আলমগীর হোসেন, বেল্লাল হোসেন, মো. হাসান, মিলন, আল-আমিন, শানু, ইকবাল হোসেন,জুয়েল,শেখ ফরিদ, আমির হোসেন তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যাপারী। নৌকা তৈরিতে সবাই মোটামুটি স্বাবলম্বী। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকটা ভাল কাটছে কাটছে তাদের দিনকাল এমনটাই জানালেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে কয়েকজন ব্যাপারী।
মামুন ব্যাপারী সবুজ বাংলাকে বলেন,তিনি নৌকা তৈরির সাথে ৪০ বছর ধরে জড়িত। তার দাদা-বাবা এ পেশায় জড়িত ছিলেন। কারখানায় ৪ জন মিস্ত্রী কাজ করে। ভোলা জেলার চরফ্যাশন, দক্ষিণ আইচা, শশীভূষণ, দুলারহাট থানা ও মনপুরা উপজেলা সহ জেলার পাশ্ববর্তী জেলা ও উপজেলা থেকে জেলেরা এখানে নৌকা কিনতে আসে। তাদের চাহিদা মত নৌকা আমরা তৈরি করে দেই। তৈরি করা নৌকা বিক্রি করে বর্ষা মৌসুমে আলহামদুলিল্লাহ ভালোই লাভ হচ্ছে। তবে শীত মৌসুমে আবার বসে থাকতে হয়।
আলমগীর ব্যাপারী জানান, নৌকা তৈরির কারখানায় সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করে শ্রমিকেরা। তৈরি করা নৌকা কিনে নেন জেলেরা । তিনি আরও বলেন, আমাদের সরকারি ভাবে কখনো কেনো আর্থিক সহায়তা করা হয়নি। সরকারি ভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে পেশাটি আরও উন্নত করতে সচেষ্ট হতেন তারা।
গজারিয়া পূর্ব বাজারে নৌকা তৈরির কারিগরদের ঠক ঠক শব্দের কর্মযজ্ঞ চলে দিন-রাতব্যাপী। বাপ-দাদা হতে প্রাপ্ত এই শিল্পের পেশাকে আঁকড়ে ধরে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় শৈল্পিক সৌন্দর্যে তৈরি হয় নানান ডিজাইনের এসব নৌকা। তৈরি হওয়া এসব নৌকার কদর রয়েছে ভোলা জেলাসহ পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এক সময় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো নৌকা। তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে শতাধিক পরিবারের।
চরফ্যাশন-ভোলা আঞ্চলিক মহাসড়কের কোল ঘেঁষে লালমোহন উপজেলার গজারিয়া বাজার এলাকায় অর্ধশত বছর আগে ঘরে উঠে নৌকা তৈরির কারখানা। মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার অন্যতম উপকরণ নৌকা। এ কারণে বর্ষা মৌসুমের ছয়মাস নৌকা তৈরির কাজ করতে হয় কারিগরদের।নৌকা তৈরির কারিগররা সাধারণত ডিঙ্গি ও কোষা ২ ধরনের নৌকা তৈরি করে থাকেন। কোষা ৯-১০ফুট আর ডিঙি নৌকা ১৫-১৬ ফুট দৈর্ঘ্য হয়ে থাকে। কাঠসহ প্রয়োজনীয় মালামাল প্রস্তুত থাকলে দৈনিক ২টি থেকে ৩ টি নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে এখানে সবচাইতে কোষা নৌকার কদর বেশি রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।
সাধারণত নৌকা তৈরিতে রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বুল, সুন্দরী গাছের কাঠ, ধাতু দ্রব্য পেরেক, তারকাটা, জলুয়া ব্যবহার হয়ে থাকে। তাছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেহগনি গাছের কাঠ ব্যবহার করে থাকেন কারিগররা। ১২ হাত লম্বা একটি নৌকা তৈরি করতে তিন জন শ্রমিক এর মজুরী প্রায় ৩/৪ হাজার টাকা। এবং কাঠ বাবদ খরচ হয় চার হাজার টাকা, নানাবিধ আনুষঙ্গিক উপকরণ বাদে খরচ হয় তিন হাজার টাকা। নয় থেকে দশ হাজার টাকা খরচ করে তৈরি একটি নৌকা বিক্রি হয় ১৪-১৫হাজার টাকা।
নৌকা ব্যাপারীরা জানান, প্রতিদিন সকল খরচ মিটিয়ে সামান্য কিছু টাকা লাভ হয় তাদের। তারপরেও ৪০/৫০ বছর ধরে চলে আসা এই শিল্পকে আমরা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন সমিতি ও সংস্থা থেকে লোন-ধারদেনা করে চলছি। সরকারের কাছ থেকে বিনা সূদে ঋণ পেলে আমরা কিছুটা উপকৃত হতাম।
গজারিয়া মহিলা মাদ্রাসার গণিত শিক্ষক মোশারফ হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, আমার বাসা নৌকা তৈরি কারখানার পাশে। প্রায় ৪০ বছর ধরে নৌকা তৈরি শিল্পটি চলে আসছে। এই পেশার সাথে শতাধিক পরিবার জড়িত। তারা এই কর্ম করে নিজেরা মোটামুটি ভাবে পরিবার ও পরিজন নিয়ে দিন গুজরান করছেন। পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। যদি সরকারি ভাবে নৌকা তৈরি কারখানায় কর্মরতদের আর্থিক সহায়তা করা হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে তারা আরও বেশি অবদান রাখতে পারবেন।
চরফ্যাশনের জনতা বাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক হাসানুজ্জামান হাওলাদার বলেন, আমার বাড়ি গজারিয়া । ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি গজারিয়া বাজারের নৌকা তৈরির কারখানাগুলো পৈতৃক সূত্রে তারা ধরে রেখেছেন। ছয় মাস নৌকা তৈরির কাজ করা হয়। এদের কারখানায় প্রায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। তবে নৌকা তৈরির সরঞ্জামের দাম ঊর্ধ্বগতি হওয়ায় এরা ধারদেনা করে শিল্পটি টিকিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, তিন যুগের বেশি সময় ধরে এই নৌ-শিল্প তারা ধরে রেখেছেন। এখন এই নৌ-শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।




















