ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা ক্রমেই চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হচ্ছে। দেশের ৩৩টি সীমান্ত পয়েন্টে সক্রিয় রয়েছে ১২৮টি চোরাচালান সিন্ডিকেট, যা অস্ত্র, মাদক, স্বর্ণালঙ্কারসহ নিত্যপণ্য অবাধে আনা-নেওয়া করছে।
সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে খ্যাত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, তবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারীরা বিভিন্ন জল-স্থলপথ, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও বন-জঙ্গল ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব সিন্ডিকেট মূলত রাতের অন্ধকার ও বৈরী আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে কাজ করে, ফলে দেশের সীমান্তজুড়ে চোরাচালান হটস্পটের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিজিবি’র অভিযানে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ১৭২ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ১৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে ১,১৯৭ জন বাংলাদেশি, ৯ জন ভারতীয় এবং ৮০৫ জন মিয়ানমার নাগরিককে আটক বা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

সিলেট বিজিবি’র ৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হক বলেছেন, “দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সদা তৎপর। সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা ও আভিযানিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।”
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত প্রায় ৪,১৫৬ কিমি দীর্ঘ, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম ভূমি সীমানা। এর মধ্যে রয়েছে আসাম ২৬২ কিমি, ত্রিপুরা ৮৫৬ কিমি, মিজোরাম ১৮০ কিমি, মেঘালয় ৪৪৩ কিমি এবং পশ্চিমবঙ্গ ২,২১৭ কিমি। বাংলাদেশের ৩২টি জেলা ও ভারতের ১৫টি জেলা এই সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত তিনটি জেলার মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে রাঙামাটি জেলার সীমান্ত ভারতের সঙ্গে নেই।
সীমান্তে চোরাকারবারিরা অস্ত্র, মাদক ও নিত্যপণ্য আনা-নেওয়ার পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিজিবি সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও আভিযানিক কার্যক্রম জোরদার করেছে। সেনা, পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে দেশের ভেতরে চোরাচালান এবং অস্ত্র-মাদক প্রবেশ রোধ করা যায়।
বিজিবি’র অভিযানকালে জব্দকৃত চোরাচালান পণ্যসম্ভার অত্যন্ত বিস্তৃত। জব্দকৃত দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ৬ কেজি ৩৫৬ গ্রাম স্বর্ণ, ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম রূপা, হাজার হাজার পোশাক ও কসমেটিক্স, ১৩ লাখ ৬১ হাজার ২৭৬টি আতশবাজি, ৪ হাজার ২০২ ঘনফুট কাঠ, ২ হাজার ৩৫ কেজি চা পাতা, ৮১ হাজার ৭৮০ কেজি কয়লা, ৩৭৯টি মোবাইল, ৩ হাজার ৪৪৩টি মোবাইল ডিসপ্লে, ৩৫ হাজার ৬২ পিস চশমা, যানবাহনের অংশ ও বিভিন্ন কৃষি সামগ্রী। এছাড়া উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দেশী/বিদেশী পিস্তল, ম্যাগাজিন ও ১০০ রাউন্ড গোলাবারুদ।

বিপুল পরিমাণ মাদকও জব্দ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ লাখ ৮৭ হাজার ১৪৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪ কেজি ৬৬৩ গ্রাম হেরোইন, ৪ হাজার ৪৯১ বোতল ফেনসিডিল, ১২,১১৩ বোতল বিদেশী মদ, ১,২৯৮ কেজি গাঁজা, ২,২৪,৮১১ প্যাকেট বিড়ি ও সিগারেট, ৫৭ হাজার ৭৪৫টি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট/ইনজেকশন ও অন্যান্য ঔষধ।
বিজিবি’র তৎপরতা সত্ত্বেও চোরাকারবারিরা থেমে নেই। প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তবর্তী ৩৩টি পয়েন্টে ১২৮টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজিবি সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আভিযানিক কার্যক্রম জোরদার করে চোরাচালান রোধে পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে।
এমআর/সবা
























