আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ আয় ও সম্পদ নিয়ে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। আওয়ামী মন্ত্রী-এমপিদের আশীর্বাদপুষ্ট জসিম উদ্দিন ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের আমলে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী। বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় বিএনপি নেতারা। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে একাধিক ছাত্র হত্যামামলা রয়েছে।
জনশ্রুতি রয়েছে জসিম হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। তবে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে তার যৎসামান্য।
হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জসিম উদ্দিনের হাতে নগদ অর্থ আছে ১৫ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৯ টাকা। এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল উপজেলা নির্বাচনে দাখিলকৃত হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী তার হাতে নগদ অর্থ ছিলো ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৯১ টাকা। অর্থাৎ দেড় বছরে তার নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৬৬৮ গুণ।
তার স্ত্রীর হাতে আছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ টাকা। যেখানে দেড় বছর আগে তার স্ত্রীর হাতে ছিলো মাত্র ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ দেড় বছরে তার নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৩২৪ গুণ।
শুধু নগদ অর্থই নয় গত দেড় বছরে জসিম ও তার স্ত্রীর স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ ও আয় সবই বেড়েছে হু হু করে।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, জসিমের কৃষিখাত থেকে বার্ষিক আয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া বাবদ আয় ১ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩৬ টাকা। এবং মূলধনী আয় বার্ষিক ১ কোটি ২০ লাখ ৬২ হাজার ১০০ টাকা। তাছাড়া দেশের বাইরে ব্যবসায়িক মূলধন দেখিয়েছেন ১৩ লাখ ১ হাজার ৪৩০ টাকা। তার স্ত্রী পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তার কোনো আয় দেখানো হয়নি। যেখানে দেড় বছর আগেও জসীমের স্ত্রীর ব্যবসা থেকে বাৎসরিক ৫ লাখ টাকা আয় ছিলো।
তাছাড়া দেড় বছর আগে জসিমের স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া বাবদ বাৎসরিক আয় ছিলো ১ কোটি ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ টাকা। বৈদেশিক আয় ছিলো ৬৩ লাখ ৯ হাজার ৫৯২ টাকা। তার স্ত্রীর বৈদেশিক আয় ছিলো ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে এবার এসব আয় নেই।
জসিম উদ্দিন আহমেদের স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে কৃষি-অকৃষি জমি, ভবন, বাড়ি-এ্যাপার্টমেন্ট। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, জসিমের কৃষি জমি আছে ১ দশমিক ৩৩ একর। যার অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা। মাত্র দেড় বছর আগেও যেখানে মূল্য অজানা কৃষি জমি ছিলো মাত্র ১৬ শতক।
বর্তমানে তার অকৃষি জমি আছে ৫ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকার। দেড় বছর আগে ছিলো ১৪ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৩০০ টাকার এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার ৯০০ টাকার।
ভবন এবং দোকানের অধিগ্রহণকালে আর্থিক মূল্য দেখানো হয়েছে, দোকান বাবদ ১৫ লাখ টাকা এবং পুরাতন ৭ তলা বাড়ির মূল্য ১ কোটি ১১ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টাকা। দেড় বছর আগেও তার এই সম্পদ ছিলো না।
এছাড়াও নতুন করে তার বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য দিয়েছেন হলফনামায়। তথ্য অনুযায়ী, তার চন্দনাইশে দুইটি বাড়ি আছে। যার অধিগ্রহণকালের আর্থিকমূল্য ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৩ লাখ ৯০০ টাকা। কক্সবাজারে ৩০টি ফ্ল্যাট। যার মূল্য ৬ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম নগরের খুলশিতে ৫টি ফ্ল্যাট। যার মূল্য ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচলাইশে ৩টি ফ্ল্যাট যার মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ২৫০ টাক। এছাড়াও তার কক্সবাজারে ৬টি মিনি ফ্ল্যাট আছে যার মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ১২ হাজার টাকা।
তাছাড়াও তার ব্যবসায়ী স্ত্রীর চট্টগ্রামের খুলশীতে ১০ হাজার ৩০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে। যার অধিগ্রহনকালীন মূল্যই দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
জসিম উদ্দিন আহমেদের স্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ২৪ কোটি ৬৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকা। বর্তমান মূল্যও একই দেখানো হয়েছে।
জসিম উদ্দিন আহমেদের অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে, নগদ ১৫ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৯ টাকা। এবং তার স্ত্রীর হাতে আছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ টাকা।
হলফনামা অনুযায়ী, জসিম উদ্দিন এবং তার স্ত্রীর নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনো জমা টাকা নেই। তবে দেড় বছর আগেও তার এবং তার স্ত্রীর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যথাক্রমে ২৭ লাখ ৫৭৬ টাকা এবং ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা জমা ছিলো।
জসিম ও তার স্ত্রীর বন্ড, ঋণপত্র, স্টক এক্সচেজে তালিকাভূক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন শেয়ার আছে। জেসিকা ইন্টারন্যাশনালে তার শেয়ার আছে ৪ হাজার। ১০০ টাকা মূল্যমানের ৪ হাজার শেয়ারের দাম ৪ লাখ টাকা। এবং আইবিআইএস হোটেলে আছে ১০ লাখ টাকার শেয়ার। তার মোট শেয়ার আছে ১৪ লাখ টাকার।
এই দুই প্রতিষ্ঠানে তার স্ত্রীরও শেয়ার আছে। জেসিকা ইন্টারন্যাশনালে তার স্ত্রীর শেয়ার আছে ১ হাজার। ১০০ টাকা মূল্যমানের ১ হাজার শেয়ারের দাম ১ লাখ টাকা। এবং আইবিআইএস হোটেলে আছে ১০ লাখ টাকার শেয়ার। তার মোট শেয়ার আছে ১১ লাখ টাকার।
জসিমের বিমা ও ট্রাস্ট্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৬ লাখ ৭ হাজার ২০৪ টাকা। এ ছাড়া জসিম উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রীর গাড়ি, স্বর্ণালংকার, আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী রয়েছে। জসিমের যানবাহনের অধিগ্রহনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর যানবাহনের মূল্য ৪০ লাখ টাকা। জসিমের ৫০ তোলা স্বর্ণের অধিগ্রহণকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং তার স্ত্রীর আছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণ। জসিমের ইলেকট্রনিক পণ্য আছে ২০ হাজার টাকার এবং তার স্ত্রীর আছে ৩ লাখ টাকার। তার আসবাবপত্র আছে ৩০ হাজার টাকার এবং তার স্ত্রীর ২ লাখ টাকার আসবাবপত্র আছে।
সব মিলিয়ে তার মোট অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১৫ কোটি ৯২ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৩ টাকা। আর তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৭৩ লাখ ৭ হাজার ৩০০ টাকা।
জসিম উদ্দিনের হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী হোটেল আইবিআইএস (কক্সবাজারের পাঁচ তারকা মানের হোটেল রামাদা) এর চেয়ারম্যান হিসেবে সোনালী ব্যাংক থেকে তার নামে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৬০৫ টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে। তবে দেড় বছর আগে তার ঋণ ছিলো পদ্মা ব্যাংকে ৬০ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংকে ১১ কোটি ৬৩ লাখ ৯ হাজার ৮২২ টাকা।
জসিম উদ্দিন আহমেদ নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হলফনামায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি মিলিয়ে দেখিয়েছেন মাত্র ৪০ কোটি টাকার সম্পদ। এর আগে ২০২৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে দাখিলকৃত হলফনামায় তার মোট সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছিলেন ২১ কোটি টাকা। দেড় বছরের ব্যবধানে আয়-সম্পদ বেড়েছে শতগুন এবং ঋণ কমেছে প্রায় সাড়ে ৬১ কোটি টাকা।
আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী, জসিম উদ্দিন আহমেদের প্রদর্শিত আয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ টাকা। আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ ২১ হাজার ১৩ টাকা এবং তিনি আয়কর দিয়েছেন ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫১ টাকা। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির আয় দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ২৭ হাজার ৮০০ টাকা তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৯৬ লাখ ৯৬ হাজার ৯০৮ টাকা। এবং আয়কর দিয়েছেন ৭৫ হাজার টাকা।
দেড় বছর আগেও ব্যবসায়ী জসিমের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা ছিলো। কিন্তু হলফনামার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে জসিমের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা চলমান আছে। আগে ফৌজদারী মামলা না থাকলেও বর্তমানে চলমান মামলার অধিকাংশই ফৌজদারী মামলা। এই ১১ মামলার বাইরেও মামলা থাকতে পারে যা তার অজানা বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
এছাড়াও হলফনামা জমা দেয়ার সময় তিনি অঙ্গীকার করেন, তিনি কোনো নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত না।
একটি সূত্র বলছে, হলফনামায় জসিম ৪০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উল্লেখ করলেও তার কক্সবাজারের বিলাসবহুল ‘হোটেল রামাদা’ এবং দুবাইয়ে ‘রামাদা দুবাই’ হোটেলে দুটিতেই তার বিনিয়োগ আছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও তার ও তার স্ত্রীর অপ্রদর্শিত যে সম্পদ আছে তার আর্থিক মূল্য অন্তত কয়েকশো কোটি টাকা। তার চন্দনাইশের বাড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ফ্ল্যাট-বাড়ির যে মূল্য তিনি দেখিয়েছেন তা অবিশ্বাস্য। তার আসবাবপত্র, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্যও নজিরবিহিনভাবে কম দেখিয়েছেন। সম্পদ গোপন করেছেন। আয়কর কম দেয়ার জন্যই তিনি সম্পদ ও আয় কমিয়ে দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ।
তবে হলফনামায় উল্লেখিত সম্পদের বিষয়ে জসিম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি হলফনামায় যা দেখিয়েছি তাই সত্য। আমি একজন ব্যবসায়ী। সুতরাং সম্পদ বাড়াটা স্বাভাবিক। তাছাড়া আমার হলফনামায় আয়ের কোনো অসঙ্গতি নেই। আমার যা সম্পদ আছে সব ট্যাক্স ফাইলের মধ্যে আছে। এর বাইরে আমার কোনো সম্পদ নেই।
শু/সবা























