০৫:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্তির পথে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপুড়া পিঠা

  • সবুজ বাংলা
  • আপডেট সময় : ০৫:৫৬:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • 53

সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খাবার চুঙ্গাপুড়া পিঠা আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় শীতের রাতে গ্রামীণ বাড়িতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারারাত ধরে চলত চুঙ্গাপুড়া তৈরির আয়োজন। এখন সেই দৃশ্য প্রায় দেখা যায় না।

একসময় পৌষসংক্রান্তিতে বাজারে মাছের মেলা বসত। সেখান থেকে অথবা হাওর-নদী থেকে ধরা রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুর মাছ হালকা মসলা দিয়ে ভেজে (স্থানীয় ভাষায় মাছ বিরাণ) চুঙ্গাপুড়া পিঠার সঙ্গে খাওয়া ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের একটি অন্যতম ঐতিহ্য। সময়ের বিবর্তনে সেই সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন চাল) এখন সহজে পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় বিন্নি ধানের চাষও কমে গেছে। মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন টিলা, চা-বাগান ও জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ী এলাকায় একসময় প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। বনদস্যু, ভূমিদস্যু ও পাহাড়খেকোদের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় ঢলু বাঁশ আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। ফলে বাজারে এর দামও অনেক বেড়েছে।

ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরি করা সম্ভব নয়। কারণ এই বাঁশে থাকা এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান আগুনে বাঁশ পোড়া থেকে রক্ষা করে। ঢলু বাঁশের ভেতরে অতিরিক্ত রস থাকায় আগুনে পোড়ার আগেই ভেতরের পিঠা সিদ্ধ হয়ে যায়। চুঙ্গার ভেতরে সাধারণত বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। রান্না শেষে পিঠাটি মোমবাতির মতো সহজেই চুঙ্গা থেকে বের হয়ে আসে। তবে এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর খড়ের (নেরা) প্রয়োজন হয়।

পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজারে ঢলু বাঁশ কিনতে আসা পিন্টু ও প্রনীত দেবনাথ বলেন,
“১০–১৫ বছর আগেও এসব জিনিস সহজেই পাওয়া যেত। এখন কয়েকটা বাজার ঘুরেও ঢলু বাঁশ পাওয়া যায় না। পরিবার থেকে পিঠা তৈরির জন্য আনতে বলায় অনেক কষ্টে মুন্সীবাজার থেকে অল্প কয়েকটা সংগ্রহ করেছি।”

কমলগঞ্জ উপজেলার লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন,
“চুঙ্গাপুড়া পিঠা মানেই ধৈর্য ও অপেক্ষা। একটু সাহস করে চুঙ্গা খুললেই বেরিয়ে আসে লুকিয়ে থাকা মনোমুগ্ধকর স্বাদের পিঠা। এটি সিলেটের পিঠে-পুলির অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু ঢলু বাঁশের অভাবে এই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চুঙ্গাপুড়া পিঠা কেবল ইতিহাস হয়েই থাকবে।

শু/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

বিসিবি পরিচালক পদত্যাগ না করলে ক্রিকেট বর্জনের আলটিমেটাম

বিলুপ্তির পথে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপুড়া পিঠা

আপডেট সময় : ০৫:৫৬:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খাবার চুঙ্গাপুড়া পিঠা আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় শীতের রাতে গ্রামীণ বাড়িতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারারাত ধরে চলত চুঙ্গাপুড়া তৈরির আয়োজন। এখন সেই দৃশ্য প্রায় দেখা যায় না।

একসময় পৌষসংক্রান্তিতে বাজারে মাছের মেলা বসত। সেখান থেকে অথবা হাওর-নদী থেকে ধরা রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুর মাছ হালকা মসলা দিয়ে ভেজে (স্থানীয় ভাষায় মাছ বিরাণ) চুঙ্গাপুড়া পিঠার সঙ্গে খাওয়া ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের একটি অন্যতম ঐতিহ্য। সময়ের বিবর্তনে সেই সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন চাল) এখন সহজে পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় বিন্নি ধানের চাষও কমে গেছে। মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন টিলা, চা-বাগান ও জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ী এলাকায় একসময় প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। বনদস্যু, ভূমিদস্যু ও পাহাড়খেকোদের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় ঢলু বাঁশ আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। ফলে বাজারে এর দামও অনেক বেড়েছে।

ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরি করা সম্ভব নয়। কারণ এই বাঁশে থাকা এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান আগুনে বাঁশ পোড়া থেকে রক্ষা করে। ঢলু বাঁশের ভেতরে অতিরিক্ত রস থাকায় আগুনে পোড়ার আগেই ভেতরের পিঠা সিদ্ধ হয়ে যায়। চুঙ্গার ভেতরে সাধারণত বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। রান্না শেষে পিঠাটি মোমবাতির মতো সহজেই চুঙ্গা থেকে বের হয়ে আসে। তবে এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর খড়ের (নেরা) প্রয়োজন হয়।

পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজারে ঢলু বাঁশ কিনতে আসা পিন্টু ও প্রনীত দেবনাথ বলেন,
“১০–১৫ বছর আগেও এসব জিনিস সহজেই পাওয়া যেত। এখন কয়েকটা বাজার ঘুরেও ঢলু বাঁশ পাওয়া যায় না। পরিবার থেকে পিঠা তৈরির জন্য আনতে বলায় অনেক কষ্টে মুন্সীবাজার থেকে অল্প কয়েকটা সংগ্রহ করেছি।”

কমলগঞ্জ উপজেলার লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন,
“চুঙ্গাপুড়া পিঠা মানেই ধৈর্য ও অপেক্ষা। একটু সাহস করে চুঙ্গা খুললেই বেরিয়ে আসে লুকিয়ে থাকা মনোমুগ্ধকর স্বাদের পিঠা। এটি সিলেটের পিঠে-পুলির অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু ঢলু বাঁশের অভাবে এই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চুঙ্গাপুড়া পিঠা কেবল ইতিহাস হয়েই থাকবে।

শু/সবা