9:02 am, Tuesday, 28 April 2026

বাহারি রঙের অতিথি পাখির কলতানে মূখরিত ঝিনাইদহের আশুরহাট গ্রাম

শান্ত জলের বুকে লাল শাপলার গালিচার মাঝে ঝাঁক বেঁধে ডানা মেলছে অতিথি পাখির দল। উড়ে চলা পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত চারিপাশ। বাহারি রঙের এসব অতিথি পাখির খুনসুঁটি আর ছুটাছুটি যে কারো মনেক উদ্বেলিত করে তুলে। শীতের মৌসুমে প্রকৃতির অপরূপ অলঙ্কার হয়ে ওঠা এ অতিথি পাখির ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন জলরঙে আঁকা ছবি।

প্রতিবছর শীতকাল এলেই বাংলাদেশের জলাশয়, বিল, হাওড়, পুকুর ভরে যায় নানা রংবেরঙের নাম না জানা পাখিতে। আদর করে আমরা সেগুলোকে বলি অতিথি পাখি। মূলত এই অতিথি পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশে হাজির হয় নিজেদের জীবন বাঁচাতে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপার আশুরহাট গ্রামটিতে হঠাৎ ই ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি আসা শুরু করে। স্থায়ী কোন বাসা না করায় পাখিগুলো যায় আসে। এরপর কেটে যায় কয়েক বছর। ২০১৩ সালে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে বসবাস শুরু করে হাজার হাজার পাখি। ১০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে পাখির অভয়ারণ্য। যা রক্ষার্থে স্থানীয়ভাবে পাহারাদারের ব্যবস্থাও করা হয়।

তখন থেকেই আশুরহাট গ্রামটি লোকমুখে পাখি গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। যা বর্তমানে সকলের মুখে মুখে ছড়িয়েছে। গ্রামটির অবস্থান ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নে।
২০১৩ সালেই তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন এই এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিবছরের মতো গ্রামের মধ্যপাড়ার আব্দুর রাজ্জাক ও গোপাল চন্দ্র বিশ্বাসের পুকুর পাড়ে শিমুুল, জাম, মেহগনী গাছের ডালে ডালে বাসা বাঁধে হাজার
হাজার পাখি।
উপযুক্ত আবহাওয়া, পরিমিত খাবারের জোগান থাকায় পাখিগুলো এখানেই জায়গা করে নেয়। তাই শীতকাল এলেই দূর-দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করে অতিথি পাখি। শিমুল গাছে থাকা পাখিগুলো সব সময় গাছেই অবস্থান করে। আষাঢ় থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত এসব পাখি এখানেই অবস্থান করে।
অভয়ারণ্য তৈরির শুরু থেকেই নানারকম হুমকির মুখে পড়েতে হয় অতিথি পাখিদের। রাতের আধারে পাখি নিধন, নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল চরম সংকটে পড়ে। বর্তমানে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

কেটে ফেলা হচ্ছে পাখির অভয়ারণ্যের গাছ। হাজার হাজার পাখির কলতানে মুখরিত এই অভয়ারণ্য। কিন্তু গাছ কেটে ফেলার কারণে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন অতিথি পাখির বসবাস সংকুচিত হয়ে পড়বে। সেই সাথে পাখিশূন্য হয়ে পড়বে জেলার একমাত্র এই পাখির অভয়ারণ্য।
এলাকাবাসীর দাবি, এই পাখি অভয়ারণ্যের মধ্যে থাকা গাছ কাটা ও পাখি শিকার যেন না করা হয়। আশুরহাট পাখি সংরক্ষণ সমিতির সদস্য আরিফ জানান, কয়েক দিন আগে গ্রামের মকররম আলীর ছেলে নইমুদ্দিন ও বদরউদ্দিনের ছেলে শফি উদ্দিন এই পাখি অভয়ারণ্যের গাছ কেটেছে। আরও কেউ কেউ গাছ কাটার পাঁয়তারা করছে। এভাবে গাছ কেটে ফেললে পাখিশূন্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সফর আলী জানান, জমির মালিকেরা মাঝে মধ্যেই গাছ কাটেন। এভাবে গাছ কাটার কারণে পাখিদের আবাসন সংকট দেখা দেবে। সেই সঙ্গে পাখিশূন্য হয়ে পড়বে এই অভায়রণ্য। কোনো পাখি শিকারি যাতে পাখি শিকার করতে না পারে তাই আমরা সারা রাত ধরে পাহারা দিয়ে থাকি। আশুরহাট পাখি সংরক্ষণ সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এভাবে গাছ কাটলে অতিথি পাখিরা কোথায় এসে দাঁড়াবে? আমি জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি। এই মুহূর্তে গাছ কাটা বন্ধ না করতে পারলে আগামীদিনে অতিথি পাখিসহ অন্যান্য পাখি এই এলাকায় আসবে না। পাখিশূন্য হয়ে পড়বে উপজেলার একমাত্র অভয়ারণ্য।

জেলা প্রশাসক এসএম রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখির অভয়ারণ্যের গাছ কাটার খবর পেয়েছি। পাখিদের আবাসস্থল সুনিশ্চিত করতে এবং পাখি অভায়ারণ্য যাতে হুমকির মধ্যে না পড়ে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রাম ও শহরের সব বয়সী মানুষজন মুগ্ধতার আবেশে দেখছে জলাশয় ও অতিথি পাখির যোগসূত্রের এই নৈসর্গিক দৃশ্য। আমাদের চিত্তানন্দের উপাদান এই পাখিরা কিন্তু জীবন ও জীবিকার আশায় হাজার-অযুত পথ পাড়ি দিয়ে দিনের পরে রাত উড়ে উড়ে আসে
আমাদের দেশে, আর এত পথ পাড়ি দিয়েও শেষ রক্ষা হয়না, আমাদের একটু বেআইনী ক্ষুদ্র আনন্দের শিকার হয়ে ওদের প্রাণ দিতে হয়! পাখি শিকার বন্ধ করে আমরা কি এই অতিথিদের প্রতি আরো
একটু সদয় আর আরো একটু ভালোবাসার পরিচয় দিতে পারিনা?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

20 − twenty =

About Author Information

Tipu Sultan

Popular Post

বিমানবন্দরে জোরদার নিরাপত্তা, শাহজালালে বাড়তি নজরদারি

বাহারি রঙের অতিথি পাখির কলতানে মূখরিত ঝিনাইদহের আশুরহাট গ্রাম

Update Time : ০১:৫৭:০৯ pm, Friday, ২২ ডিসেম্বর ২০২৩

শান্ত জলের বুকে লাল শাপলার গালিচার মাঝে ঝাঁক বেঁধে ডানা মেলছে অতিথি পাখির দল। উড়ে চলা পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত চারিপাশ। বাহারি রঙের এসব অতিথি পাখির খুনসুঁটি আর ছুটাছুটি যে কারো মনেক উদ্বেলিত করে তুলে। শীতের মৌসুমে প্রকৃতির অপরূপ অলঙ্কার হয়ে ওঠা এ অতিথি পাখির ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন জলরঙে আঁকা ছবি।

প্রতিবছর শীতকাল এলেই বাংলাদেশের জলাশয়, বিল, হাওড়, পুকুর ভরে যায় নানা রংবেরঙের নাম না জানা পাখিতে। আদর করে আমরা সেগুলোকে বলি অতিথি পাখি। মূলত এই অতিথি পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশে হাজির হয় নিজেদের জীবন বাঁচাতে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপার আশুরহাট গ্রামটিতে হঠাৎ ই ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি আসা শুরু করে। স্থায়ী কোন বাসা না করায় পাখিগুলো যায় আসে। এরপর কেটে যায় কয়েক বছর। ২০১৩ সালে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে বসবাস শুরু করে হাজার হাজার পাখি। ১০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে পাখির অভয়ারণ্য। যা রক্ষার্থে স্থানীয়ভাবে পাহারাদারের ব্যবস্থাও করা হয়।

তখন থেকেই আশুরহাট গ্রামটি লোকমুখে পাখি গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। যা বর্তমানে সকলের মুখে মুখে ছড়িয়েছে। গ্রামটির অবস্থান ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নে।
২০১৩ সালেই তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন এই এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিবছরের মতো গ্রামের মধ্যপাড়ার আব্দুর রাজ্জাক ও গোপাল চন্দ্র বিশ্বাসের পুকুর পাড়ে শিমুুল, জাম, মেহগনী গাছের ডালে ডালে বাসা বাঁধে হাজার
হাজার পাখি।
উপযুক্ত আবহাওয়া, পরিমিত খাবারের জোগান থাকায় পাখিগুলো এখানেই জায়গা করে নেয়। তাই শীতকাল এলেই দূর-দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করে অতিথি পাখি। শিমুল গাছে থাকা পাখিগুলো সব সময় গাছেই অবস্থান করে। আষাঢ় থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত এসব পাখি এখানেই অবস্থান করে।
অভয়ারণ্য তৈরির শুরু থেকেই নানারকম হুমকির মুখে পড়েতে হয় অতিথি পাখিদের। রাতের আধারে পাখি নিধন, নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল চরম সংকটে পড়ে। বর্তমানে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

কেটে ফেলা হচ্ছে পাখির অভয়ারণ্যের গাছ। হাজার হাজার পাখির কলতানে মুখরিত এই অভয়ারণ্য। কিন্তু গাছ কেটে ফেলার কারণে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন অতিথি পাখির বসবাস সংকুচিত হয়ে পড়বে। সেই সাথে পাখিশূন্য হয়ে পড়বে জেলার একমাত্র এই পাখির অভয়ারণ্য।
এলাকাবাসীর দাবি, এই পাখি অভয়ারণ্যের মধ্যে থাকা গাছ কাটা ও পাখি শিকার যেন না করা হয়। আশুরহাট পাখি সংরক্ষণ সমিতির সদস্য আরিফ জানান, কয়েক দিন আগে গ্রামের মকররম আলীর ছেলে নইমুদ্দিন ও বদরউদ্দিনের ছেলে শফি উদ্দিন এই পাখি অভয়ারণ্যের গাছ কেটেছে। আরও কেউ কেউ গাছ কাটার পাঁয়তারা করছে। এভাবে গাছ কেটে ফেললে পাখিশূন্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সফর আলী জানান, জমির মালিকেরা মাঝে মধ্যেই গাছ কাটেন। এভাবে গাছ কাটার কারণে পাখিদের আবাসন সংকট দেখা দেবে। সেই সঙ্গে পাখিশূন্য হয়ে পড়বে এই অভায়রণ্য। কোনো পাখি শিকারি যাতে পাখি শিকার করতে না পারে তাই আমরা সারা রাত ধরে পাহারা দিয়ে থাকি। আশুরহাট পাখি সংরক্ষণ সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এভাবে গাছ কাটলে অতিথি পাখিরা কোথায় এসে দাঁড়াবে? আমি জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি। এই মুহূর্তে গাছ কাটা বন্ধ না করতে পারলে আগামীদিনে অতিথি পাখিসহ অন্যান্য পাখি এই এলাকায় আসবে না। পাখিশূন্য হয়ে পড়বে উপজেলার একমাত্র অভয়ারণ্য।

জেলা প্রশাসক এসএম রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখির অভয়ারণ্যের গাছ কাটার খবর পেয়েছি। পাখিদের আবাসস্থল সুনিশ্চিত করতে এবং পাখি অভায়ারণ্য যাতে হুমকির মধ্যে না পড়ে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রাম ও শহরের সব বয়সী মানুষজন মুগ্ধতার আবেশে দেখছে জলাশয় ও অতিথি পাখির যোগসূত্রের এই নৈসর্গিক দৃশ্য। আমাদের চিত্তানন্দের উপাদান এই পাখিরা কিন্তু জীবন ও জীবিকার আশায় হাজার-অযুত পথ পাড়ি দিয়ে দিনের পরে রাত উড়ে উড়ে আসে
আমাদের দেশে, আর এত পথ পাড়ি দিয়েও শেষ রক্ষা হয়না, আমাদের একটু বেআইনী ক্ষুদ্র আনন্দের শিকার হয়ে ওদের প্রাণ দিতে হয়! পাখি শিকার বন্ধ করে আমরা কি এই অতিথিদের প্রতি আরো
একটু সদয় আর আরো একটু ভালোবাসার পরিচয় দিতে পারিনা?