০৫:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে আদিকাল থেকে বসবাস করছে শেরপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা

শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বাস
করে কোচ ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজন। ওইসব উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নে ৩৪৩টি গ্রামে
হাজারো পরিবারের লক্ষাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে
আদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে। এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অন্যতম হলো গারো, হাজং ও
কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এসব সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি সংস্কৃতি ও আলাদা সমাজ
ব্যবস্থা।
গারোরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আর কোচ ও হাজং সম্প্রদায়ের লোকজন সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
গারো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত পরিবার। গারোদের
সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো বড়দিন। এছাড়াও প্রতিবছর ষ্টার সানডে, তীর্থ উৎসব, ইংরেজি
নববর্ষ ও ওয়ানগালা উৎসব পালন করে থাকে। আর কোচদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা ও
কালিপূজা।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও এ দুই সম্প্রদায়ই আরো আলাদা আলাদা সামাজিক
আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। কালের বিবর্তনে এসব গারো, হাজং ও কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের
হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি
রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
জানা গেছে, ওই তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা, তাড়ানি, ফেকামাড়ি, মায়াঘাসি,
নাকুগাঁও, দাওধারা, আন্ধারুপাড়া, খলচান্দা, বুরুঙ্গা, বাতকুচি, সমেশ্চুড়া, খলিসাকুড়া,
গাছগড়া, নয়াবিল, রাংটিয়া, শালচুড়া, ডেফলাই, গান্ধিগাঁও, নকশী, হালচাটি, গজনী,
বাকাকুড়া, পানবর, জোকাকুড়া, তাওয়াকুচা, ভালুকা, সিংগাবরুনা এলাকায় কোচ ও গারো
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বসবাস। অনাদিকাল থেকেই এসব এলাকায় বাপ দাদার বসত ভিটায়
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা বসবাস করে আসছে।
স্থানীয় গারো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতা প্রদীপ জেংচাম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে ক্ষুদ্র নৃ-
গোষ্ঠীদের কৃষ্টিসংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে
আছে মান্দিদামা, ক্রাম, খোল, নাগ্রা, জিপসি, খক, মিলাম, স্ফি, রাং, বাঁশের বাশি, আদুরী
নামের বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক দকবান্দা, দকশাড়ী, খকাশিল, দমী, রিক মাচুল আর কোচ ক্ষুদ্র নৃ-
গোষ্ঠীদের পোষাক রাংঙ্গা লেফেন ও আছাম। আর খাদ্যের তালিকায় আছে বাঁশের কড়াল আর চালের
গুড়া দিয়ে তৈরি খাবার উপকরণ ‘মিয়া’, কলাপাতায় করে ছোট মাছ পুড়া দিয়ে খাওয়া যার নাম
‘ইথিবা’, মুরগির বাচ্চা পুড়া দিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ভরে পেঁয়াজ ও কাচা মরিচ দিয়ে ভর্তা
করে খাওয়া যার নাম ব্রেংআ, মিমিল, কাকড়া, শামুক ও শুকরের মাংস, চালের তৈরি মদ যার নাম চু
আর কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কাঠমুড়ি ইত্যাদি খাবার উপকরণ এখন প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।
গীমান্তবর্তী খলচান্দা গ্রামের কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিমল কোচ বলেন, আমরা বন পাহাড়ে
জীবন যাপন করে আসছি। তাই পেটের তাগিদে ইতিহাস ঐতিহ্য বুঝি না, শুধু বুঝি বেঁচে
থাকতে হবে। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার জন্য কোচদের আছে ‘কোচ ভাষা’ আর গারোদের আছে
‘আচিক’ ভাষা। বর্তমানে এই দুই ভাষাতেও বাংলাভাষার সংমিশ্রণ হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের
অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষার ফাঁকে ফাঁকে বাংলা জুড়ে দিয়ে কথা বলে থাকে।

একই গ্রামের রমেশ চন্দ্র কোচ বলেন, আমাদের কোচ ভাষায় এখন বাংলা ভাষার মিশ্রন ঘটে গেছে।
এমনকি তিনি নিজেও তাদের নিজস্ব ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষা যোগ করা ছাড়া কথা বলতে পারেন
না।
নালিতাবাড়ীর সাবেক ট্রাইবাল চেয়ারম্যান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতা লুইস নেংমিনজা জানান,
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কৃষ্টি সংস্কৃতি সংরক্ষণে নালিতাবাড়ীতে আমরা একটি ‘কালচারাল
একাডেমি’ স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি।

জনপ্রিয় সংবাদ

রায়গঞ্জে শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ

প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে আদিকাল থেকে বসবাস করছে শেরপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা

আপডেট সময় : ০৩:০৯:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৪

শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বাস
করে কোচ ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজন। ওইসব উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নে ৩৪৩টি গ্রামে
হাজারো পরিবারের লক্ষাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে
আদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে। এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অন্যতম হলো গারো, হাজং ও
কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এসব সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি সংস্কৃতি ও আলাদা সমাজ
ব্যবস্থা।
গারোরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আর কোচ ও হাজং সম্প্রদায়ের লোকজন সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
গারো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত পরিবার। গারোদের
সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো বড়দিন। এছাড়াও প্রতিবছর ষ্টার সানডে, তীর্থ উৎসব, ইংরেজি
নববর্ষ ও ওয়ানগালা উৎসব পালন করে থাকে। আর কোচদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা ও
কালিপূজা।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও এ দুই সম্প্রদায়ই আরো আলাদা আলাদা সামাজিক
আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। কালের বিবর্তনে এসব গারো, হাজং ও কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের
হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি
রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
জানা গেছে, ওই তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা, তাড়ানি, ফেকামাড়ি, মায়াঘাসি,
নাকুগাঁও, দাওধারা, আন্ধারুপাড়া, খলচান্দা, বুরুঙ্গা, বাতকুচি, সমেশ্চুড়া, খলিসাকুড়া,
গাছগড়া, নয়াবিল, রাংটিয়া, শালচুড়া, ডেফলাই, গান্ধিগাঁও, নকশী, হালচাটি, গজনী,
বাকাকুড়া, পানবর, জোকাকুড়া, তাওয়াকুচা, ভালুকা, সিংগাবরুনা এলাকায় কোচ ও গারো
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বসবাস। অনাদিকাল থেকেই এসব এলাকায় বাপ দাদার বসত ভিটায়
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা বসবাস করে আসছে।
স্থানীয় গারো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতা প্রদীপ জেংচাম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে ক্ষুদ্র নৃ-
গোষ্ঠীদের কৃষ্টিসংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে
আছে মান্দিদামা, ক্রাম, খোল, নাগ্রা, জিপসি, খক, মিলাম, স্ফি, রাং, বাঁশের বাশি, আদুরী
নামের বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক দকবান্দা, দকশাড়ী, খকাশিল, দমী, রিক মাচুল আর কোচ ক্ষুদ্র নৃ-
গোষ্ঠীদের পোষাক রাংঙ্গা লেফেন ও আছাম। আর খাদ্যের তালিকায় আছে বাঁশের কড়াল আর চালের
গুড়া দিয়ে তৈরি খাবার উপকরণ ‘মিয়া’, কলাপাতায় করে ছোট মাছ পুড়া দিয়ে খাওয়া যার নাম
‘ইথিবা’, মুরগির বাচ্চা পুড়া দিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ভরে পেঁয়াজ ও কাচা মরিচ দিয়ে ভর্তা
করে খাওয়া যার নাম ব্রেংআ, মিমিল, কাকড়া, শামুক ও শুকরের মাংস, চালের তৈরি মদ যার নাম চু
আর কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কাঠমুড়ি ইত্যাদি খাবার উপকরণ এখন প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।
গীমান্তবর্তী খলচান্দা গ্রামের কোচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিমল কোচ বলেন, আমরা বন পাহাড়ে
জীবন যাপন করে আসছি। তাই পেটের তাগিদে ইতিহাস ঐতিহ্য বুঝি না, শুধু বুঝি বেঁচে
থাকতে হবে। নিজস্ব ভাষায় কথা বলার জন্য কোচদের আছে ‘কোচ ভাষা’ আর গারোদের আছে
‘আচিক’ ভাষা। বর্তমানে এই দুই ভাষাতেও বাংলাভাষার সংমিশ্রণ হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের
অনেকেই তাদের নিজস্ব ভাষার ফাঁকে ফাঁকে বাংলা জুড়ে দিয়ে কথা বলে থাকে।

একই গ্রামের রমেশ চন্দ্র কোচ বলেন, আমাদের কোচ ভাষায় এখন বাংলা ভাষার মিশ্রন ঘটে গেছে।
এমনকি তিনি নিজেও তাদের নিজস্ব ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষা যোগ করা ছাড়া কথা বলতে পারেন
না।
নালিতাবাড়ীর সাবেক ট্রাইবাল চেয়ারম্যান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতা লুইস নেংমিনজা জানান,
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কৃষ্টি সংস্কৃতি সংরক্ষণে নালিতাবাড়ীতে আমরা একটি ‘কালচারাল
একাডেমি’ স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি।