০১:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই

◉ বাংলা একাডেমির বানানরীতি অনেকেরই অজানা
◉ প্রচার ও ডিজিটাল মাধ্যমে ভুল বানানের ছড়াছড়ি
◉ বিপাকে শিক্ষার্থী ও পুরোনো রীতিতে শিক্ষিতরা
◉ বানান সংশোধন ও ব্যবহার নিয়েও আছে বিতর্ক
◉ এপ্রিলে সংশোধিত অভিধান বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি

বাংলা ভাষা শুধু বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন অন্যতম আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবেও স্বীকৃত। অথচ এই ভাষার বানানরীতি নিয়ে যেন বিভ্রান্তির শেষ নেই। দেশের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রচার ও অনলাইনমাধ্যমসহ সর্বত্রই ভুল ও ভিন্ন ধরনের বানান ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রমিত বানানরীতি সংশোধন ও পরিমার্জন করা হলেও তা অনেকেরই অজানা। তাছাড়া বাংলা একাডেমির অভিধানে বিভিন্ন শব্দের বিকল্প বা একাধিক বানান বহাল রাখা এবং সংশোধন ও ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। দেশের সাইনবোর্ড-ব্যানারের পাশাপাশি প্রথম সারির বাংলা গণমাধ্যমগুলোতেও বানানের ভিন্ন ব্যবহার দেখা যায়। স্কুলের পাঠ্যবইয়েও ভুল বানান ছাপা এবং পরবর্তীতে তা সংশোধনের ঘটনা ঘটে। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়ছেন পুরানোরীতিতে শিক্ষিত, অফিস-আদালতে লেখালেখি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা। সঠিক বানান ব্যবহার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় তদারকি এবং আইন প্রণয়নসহ শিক্ষার্থীদের বাংলা ব্যাকরণ শেখার গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে একটি সরকারি স্কুলের বাংলা বিষয়ক সিনিয়র শিক্ষক জাকির হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, বাংলা সঠিক বানান নিয়ে স্কুল শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত বিভ্রান্তিতে পড়েন। সরকারিভাবে বাংলা একাডেমির অভিধান এবং বানানরীতি অনুযায়ী দেশে সঠিক বানান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ বানানরীতিতে পরিবর্তন আনায় সবাই তাতে অভ্যস্ত হতে পারে না। কিছু পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়েও বিতর্ক থেকে যায়।
শিক্ষাঙ্গনেও ব্যাকরণ শিক্ষায় গুরুত্ব কম থাকার কথা উল্লেখ করে ওই শিক্ষক বলেন, স্কুলে বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ে ক্রমেই নম্বর কমিয়ে আনা হয়েছে। আর বর্তমানে নতুন কারিকুলামে আরো গুরুত্ব কমবে। এতে শিক্ষার্থীরা বানান নিয়ে বিপদে পড়তে পারে।

তিনি আরো বলেন, মূলত পড়ে, দেখে ও শুনে আমরা শিখে থাকি। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করে সঠিক বানান প্রয়োগে প্রয়োজনীয় আইন বা অনুমোদন সংস্থা করা দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সূত্রমতে, বাংলা বানান সংশোধনের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের বাংলা একাডেমি আইনে প্রতিষ্ঠানটির নামের বানান ‘একাডেমী’র পরিবর্তে ‘একাডেমি’ করা হয়। একইভাবে বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতিতে বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে ‘ী’ কারের পরিবর্তে ‘’ি কার ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত অনেক শব্দের বানানই পরিবর্তন হওয়ায় জটিলতায় পড়েন সংশ্লিষ্টরা। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প বানান ব্যবহারের সুযোগ রাখা নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। যেমন- ঈদ না ইদ, শহিদ না শহীদ লেখা হবে ইত্যাদি। রীতি অনুযায়ী মঞ্জুরি বানান ‘’ি কার দিয়ে লেখা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বানানে আছে ‘ী’ কার। একইভাবে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে ‘ইসলামী’ বানান নিয়েও। যেমন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ী’ কার দিয়ে লেখা হলেও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে আবার ‘’ি কার ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে অসংখ্য বানানের ব্যবহার নিয়ে বিভ্রান্তি আছে।

বানান নিয়ে বিভ্রান্তি প্রসঙ্গে একটি জাতীয় বাংলা পত্রিকায় সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত নেয়ামত উল্লাহ বলেন, সময়ের পরিবর্তনে বানান পরিবর্তন হচ্ছে। তবে একাধিক রীতি থাকায় জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। একেক অফিসে চাকরির সময় তাদের নিজস্ব রীতি আয়ত্ত করতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়া পুরানো শিক্ষিত ব্যক্তি বা লেখকরা আগের বানানরীতি ব্যবহার করে লিখে থাকেন। তা সংশোধন করতে জটিলতায় পড়তে হয়। সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় অনলাইনে। কারণ সেখানে সব ধরনের বানান পাওয়া যায়। সঠিক বানান খুঁজে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, বানান নিয়ে সাধারণ মানুষও এখন প্রশ্ন তোলে। আর বাংলা একাডেমি সেসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে হিমশিম খায়। এর নমুনা ‘ইদ’, ‘গোরু’ এ দুটি বানান। শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি জানাতে বাধ্য হয়, তাদের সর্বশেষ অভিধানে কিছু শব্দের বানানে ভুলত্রুটি ঘটে গেছে, পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করা হবে। কিন্তু অভিধানের নতুন সংস্করণে সেসব ‘ভুলত্রুটি’র অধিকাংশই অপরিবর্তিত আছে। তিনি বলেন, বাংলা একাডেমির উচিত হবে বিকল্প তৈরি করা বানানগুলোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া। একই সঙ্গে নতুন করে বানানে বিকল্প তৈরি না করার নীতিও তাদের নিতে হবে।

সূত্রমতে, প্রাচীনকাল থেকেই সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাবে বাংলা বানানরীতিতে সংস্কৃত শব্দ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, অতৎসম শব্দ অর্থাৎ, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, অর্ধ-তৎসম প্রভৃতি উৎস হতে প্রচুর শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে। ফলে অতৎসম শব্দের বানানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বানান সংস্কারের জন্য ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন। ফলে রাজশেখর বসুকে সভাপতি করে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান-সংস্কার সমিতি’ গঠিত হয়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ঐ সমিতির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।
১৯৪৭-এ দেশবিভাগ ও ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে বাংলা বানান নিয়ে নানা সুপারিশ ও নানা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ১৯৮৮ সালে বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে। এরপর ১৯৯২ সালের এপ্রিলে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম নির্ধারণের যে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল তা ১৯৯৪ সালে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত বানানরীতি ও (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) প্রবর্তিত বানানরীতির সমন্বয়ে বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানরীতি চালু রয়েছে। ২০০০ সালে এ নিয়মের কিছু সূত্র সংশোধিত হয়। ২০১২ সালে পুনরায় পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

বানান সমস্যা সম্পর্কে বাংলা একাডেমির পরিচালক (গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ) মো. মোবারক হোসেন গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, বাংলা একাডেমির অভিধানগুলো হালনাগাদ করা হচ্ছে। তবে পুরানোগুলো বাজারে রেখেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী এপ্রিলের মধ্যেই সংশোধিত অভিধান বাজারে আনার জন্য কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি আরো জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা ভুল বানান সরিয়ে ফেলা বা পুলিশি দায়িত্ব পালন করা একাডেমির পক্ষে সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

টিউশনের নামে প্রতারণার ফাঁদ

বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই

আপডেট সময় : ০৯:২৮:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

◉ বাংলা একাডেমির বানানরীতি অনেকেরই অজানা
◉ প্রচার ও ডিজিটাল মাধ্যমে ভুল বানানের ছড়াছড়ি
◉ বিপাকে শিক্ষার্থী ও পুরোনো রীতিতে শিক্ষিতরা
◉ বানান সংশোধন ও ব্যবহার নিয়েও আছে বিতর্ক
◉ এপ্রিলে সংশোধিত অভিধান বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি

বাংলা ভাষা শুধু বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন অন্যতম আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবেও স্বীকৃত। অথচ এই ভাষার বানানরীতি নিয়ে যেন বিভ্রান্তির শেষ নেই। দেশের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রচার ও অনলাইনমাধ্যমসহ সর্বত্রই ভুল ও ভিন্ন ধরনের বানান ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রমিত বানানরীতি সংশোধন ও পরিমার্জন করা হলেও তা অনেকেরই অজানা। তাছাড়া বাংলা একাডেমির অভিধানে বিভিন্ন শব্দের বিকল্প বা একাধিক বানান বহাল রাখা এবং সংশোধন ও ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। দেশের সাইনবোর্ড-ব্যানারের পাশাপাশি প্রথম সারির বাংলা গণমাধ্যমগুলোতেও বানানের ভিন্ন ব্যবহার দেখা যায়। স্কুলের পাঠ্যবইয়েও ভুল বানান ছাপা এবং পরবর্তীতে তা সংশোধনের ঘটনা ঘটে। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়ছেন পুরানোরীতিতে শিক্ষিত, অফিস-আদালতে লেখালেখি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা। সঠিক বানান ব্যবহার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় তদারকি এবং আইন প্রণয়নসহ শিক্ষার্থীদের বাংলা ব্যাকরণ শেখার গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে একটি সরকারি স্কুলের বাংলা বিষয়ক সিনিয়র শিক্ষক জাকির হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, বাংলা সঠিক বানান নিয়ে স্কুল শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত বিভ্রান্তিতে পড়েন। সরকারিভাবে বাংলা একাডেমির অভিধান এবং বানানরীতি অনুযায়ী দেশে সঠিক বানান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ বানানরীতিতে পরিবর্তন আনায় সবাই তাতে অভ্যস্ত হতে পারে না। কিছু পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়েও বিতর্ক থেকে যায়।
শিক্ষাঙ্গনেও ব্যাকরণ শিক্ষায় গুরুত্ব কম থাকার কথা উল্লেখ করে ওই শিক্ষক বলেন, স্কুলে বাংলা ব্যাকরণ বিষয়ে ক্রমেই নম্বর কমিয়ে আনা হয়েছে। আর বর্তমানে নতুন কারিকুলামে আরো গুরুত্ব কমবে। এতে শিক্ষার্থীরা বানান নিয়ে বিপদে পড়তে পারে।

তিনি আরো বলেন, মূলত পড়ে, দেখে ও শুনে আমরা শিখে থাকি। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করে সঠিক বানান প্রয়োগে প্রয়োজনীয় আইন বা অনুমোদন সংস্থা করা দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সূত্রমতে, বাংলা বানান সংশোধনের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের বাংলা একাডেমি আইনে প্রতিষ্ঠানটির নামের বানান ‘একাডেমী’র পরিবর্তে ‘একাডেমি’ করা হয়। একইভাবে বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতিতে বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে ‘ী’ কারের পরিবর্তে ‘’ি কার ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত অনেক শব্দের বানানই পরিবর্তন হওয়ায় জটিলতায় পড়েন সংশ্লিষ্টরা। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প বানান ব্যবহারের সুযোগ রাখা নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। যেমন- ঈদ না ইদ, শহিদ না শহীদ লেখা হবে ইত্যাদি। রীতি অনুযায়ী মঞ্জুরি বানান ‘’ি কার দিয়ে লেখা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বানানে আছে ‘ী’ কার। একইভাবে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে ‘ইসলামী’ বানান নিয়েও। যেমন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ী’ কার দিয়ে লেখা হলেও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে আবার ‘’ি কার ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে অসংখ্য বানানের ব্যবহার নিয়ে বিভ্রান্তি আছে।

বানান নিয়ে বিভ্রান্তি প্রসঙ্গে একটি জাতীয় বাংলা পত্রিকায় সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত নেয়ামত উল্লাহ বলেন, সময়ের পরিবর্তনে বানান পরিবর্তন হচ্ছে। তবে একাধিক রীতি থাকায় জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। একেক অফিসে চাকরির সময় তাদের নিজস্ব রীতি আয়ত্ত করতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়া পুরানো শিক্ষিত ব্যক্তি বা লেখকরা আগের বানানরীতি ব্যবহার করে লিখে থাকেন। তা সংশোধন করতে জটিলতায় পড়তে হয়। সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় অনলাইনে। কারণ সেখানে সব ধরনের বানান পাওয়া যায়। সঠিক বানান খুঁজে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, বানান নিয়ে সাধারণ মানুষও এখন প্রশ্ন তোলে। আর বাংলা একাডেমি সেসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে হিমশিম খায়। এর নমুনা ‘ইদ’, ‘গোরু’ এ দুটি বানান। শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি জানাতে বাধ্য হয়, তাদের সর্বশেষ অভিধানে কিছু শব্দের বানানে ভুলত্রুটি ঘটে গেছে, পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করা হবে। কিন্তু অভিধানের নতুন সংস্করণে সেসব ‘ভুলত্রুটি’র অধিকাংশই অপরিবর্তিত আছে। তিনি বলেন, বাংলা একাডেমির উচিত হবে বিকল্প তৈরি করা বানানগুলোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া। একই সঙ্গে নতুন করে বানানে বিকল্প তৈরি না করার নীতিও তাদের নিতে হবে।

সূত্রমতে, প্রাচীনকাল থেকেই সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাবে বাংলা বানানরীতিতে সংস্কৃত শব্দ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, অতৎসম শব্দ অর্থাৎ, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, অর্ধ-তৎসম প্রভৃতি উৎস হতে প্রচুর শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে। ফলে অতৎসম শব্দের বানানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বানান সংস্কারের জন্য ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন। ফলে রাজশেখর বসুকে সভাপতি করে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান-সংস্কার সমিতি’ গঠিত হয়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ঐ সমিতির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।
১৯৪৭-এ দেশবিভাগ ও ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে বাংলা বানান নিয়ে নানা সুপারিশ ও নানা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ১৯৮৮ সালে বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে। এরপর ১৯৯২ সালের এপ্রিলে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম নির্ধারণের যে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল তা ১৯৯৪ সালে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত বানানরীতি ও (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) প্রবর্তিত বানানরীতির সমন্বয়ে বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানরীতি চালু রয়েছে। ২০০০ সালে এ নিয়মের কিছু সূত্র সংশোধিত হয়। ২০১২ সালে পুনরায় পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

বানান সমস্যা সম্পর্কে বাংলা একাডেমির পরিচালক (গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ) মো. মোবারক হোসেন গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, বাংলা একাডেমির অভিধানগুলো হালনাগাদ করা হচ্ছে। তবে পুরানোগুলো বাজারে রেখেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী এপ্রিলের মধ্যেই সংশোধিত অভিধান বাজারে আনার জন্য কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি আরো জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা ভুল বানান সরিয়ে ফেলা বা পুলিশি দায়িত্ব পালন করা একাডেমির পক্ষে সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।