🟠রেস্তোরাঁয় অভিযানে তিন দিনে গ্রেপ্তার ৮৭২
🟠গা-ঢাকা মালিকপক্ষের, বিপাকে কর্মচারীরা
🟠 রমজানে বড় লোকসানের শঙ্কা মালিকদের
সম্প্রতি বেইলী রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় এবার সামনে এসেছে রাজধানীর হোটেল-রেস্তোরাঁর অব্যবস্থাপনা আর নিরাপত্তার বিষয়টি। এ নিয়ে দেশজুড়ে রীতিমতো প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বাগযুদ্ধ চলছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর অনিয়ম অব্যবস্থাপনা রোধে কঠোর অবস্থানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিসসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। অবৈধ রেস্তোরাঁ চিহ্নিত করে ঢাকাজুড়ে চলছে অভিযান-জরিমানা ও গ্রেপ্তার। অব্যাহত অভিযানে অধিকাংশ রেস্তোরাঁ মালিক তাদের প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ রেখে ঝামেলা এড়াতে আড়ালে থাকার চেষ্টা করছেন। এতে পছন্দের রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে না পেরে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নগরীর ভোজনরসিকরা। এর মধ্যে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় জড়িত রেস্তোরাঁর মালিকরা লাপাত্তা হওয়ায় প্রতিদিনই ধরা পড়ছেন তাদের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমন পরিস্থিতিতে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হওয়ায় আসন্ন রমজান মাস ঘিরে লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন মালিকরা। অপরদিকে চাকরি হারানোর ভয়ে রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা বা সংসার চালানো লাখো কর্মচারী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কয়েক হাজার রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এর অধিকাংশেরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিপজ্জনক। এসব নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে কর্মচারীদের চাকরি হারানোর শঙ্কাও থাকবে না, ভোজনবিলাসীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেইলী রোড ট্র্যাজেডির পর অভিযানে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের প্রায় সবাই হোটেলের কর্মচারী, শেফ, বয়-বেয়ারা। তারা কার্যত চাকরি করে আয়-রোজগার করেন। হোটেল-রেস্তোরাঁর অবৈধতার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। মূল হোতাদের বদলে কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে এসব ছোট চাকুরের সংসার। রমজানে যারা হোটেলে ইফতার, সাহারি গ্রহণ করেন তারা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছেন। এসব হোটেল বন্ধ রাখা হলে তারা ইফতার-সাহারিতে বিপদে পড়বেন। এ নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীলরা কোনো কথা বলছেন না। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে ওঠা হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হচ্ছে। কতিপয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সিটি করপোরেশন, রাজউকের যেসব দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এতদিন মাসোহারার বিনিময়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর অনিয়ম দেখেও উট পাখির মতো গর্তে মুখ লুকিয়ে রেখেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কে? এমন প্রশ্ন করেছেন অনেক রেস্তোরাঁর মালিক কর্মচারীসহ সাধারণ গ্রাহক। রাজধানীর হোটেল-রেস্টুরেন্টের শেফ-কর্মচারী, ওয়েটার, বয়রা হুট করেই কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। রোজার আগে কাজ হারানোয় অনিশ্চয়তার মুখে তাদের ভবিষ্যৎ। আর কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যারা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নেমেছেন তাদেরও পথে বসার অবস্থা। পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে তারা যে ব্যবসার স্বপ্ন দেখছেন তা চলমান অভিযানে হোটেল সিলগালা করার মাধ্যমে হাওয়ায় উবে গেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রশাসনযন্ত্রের দায়িত্বশীল লোকজন এতদিন নানাভাবে ঘুষ-আর্থিক সুবিধা নিয়ে ব্যবসা চালাতে দিয়েছে। এখন হঠাৎ করে তারা সাধু সেজেছেন। তারা যদি আগে দায়িত্বশীল হতেন ঘুষ না দিয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করতেন তাহলে এত দুরবস্থায় পড়তে হতো না। রাজউক ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা কার্যত নিজেদের অনৈতিকতার মুখোশ খুলে যাওয়ার ভয়ে কারণে-অকারণে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোয় নানান অজুহাতে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে কোটি কোটি টাকা লোকসানের শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে শতাধিক হোটেল শেফ ও কর্মচারীকে অপেক্ষমাণ দেখা যায়। অনেকেই দিনভর কাজের পর রাতে রেস্টুরেন্টেই ঘুমাতেন। এগুলো একেবারে সিলগালা বন্ধের কারণে তাদের চাকরি যেমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তেমনি কেউ হারিয়েছেন নিজের থাকার জায়গাও।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির তথ্য মতে, সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার রেস্তোরাঁ রয়েছে। এসব রেস্তোরাঁয় প্রায় ৩০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। ঢাকায় এই সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ প্রায় ১৫ লাখ কর্মচারী রেস্তোরাঁয় কাজ করে সংসার চালান।
ধানমন্ডির ঝিগাতলায় ক্রাশ স্টেশন নামে রেস্টুরেন্টে কাজ করেন বরিশাল বিএম কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম আকাশ। তিনি বলেন, রেস্টুরেন্টের আয়েই গ্রামে মা-বাবা, ভাই-বোনসহ সাতজনের সংসার চলে তার। এই অভিযানে বন্ধ হয়েছে তার কর্মস্থল রেস্টুরেন্টটি। এতে বিপাকে পড়েছেন তিনি। আমিনুল ইসলাম বলেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। বেতন কবে পাব, জানি না। খাবারের টাকাও নেই। একই এলাকার সি মাইনর ক্যাফে নামে রেস্টুরেন্টের কর্মচারী মমিনুল বলেন, আমাদের থাকা-খাওয়ার খরচ মালিক নিজেই বহন করতেন। আমরা বেশ কয়েকজন এই ভবনেই থাকতাম। রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন আমাদের থাকার জায়গাটুকু নেই। গত মাসের বেতন না দেওয়ায় পকেটে চলার মতো টাকা নেই। এ অবস্থায় কোথায় যাব, কি করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খিলগাঁও এলাকার এক রাঁধুনী (শেফ) দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, মালিকপক্ষ থাকার ব্যবস্থা করে দিলেও খাওয়ার টাকা নেই। সকাল থেকে না খেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। প্রশাসনের কাছে আমার অনুরোধ অন্তত রমজান মাস পর্যন্ত মালিকদের সময় দিন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সব ভবন বন্ধ করে দিন। একই এলাকার এক রেস্তোরাঁর মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে তিন বন্ধু মিলে এক বছর আগে একটি রেস্টুরেন্ট চালু করি। কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্ন দফতর থেকে অনুমোদনও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু ত্রুটি থাকায় আতঙ্কে রেস্টুরেন্টটি বন্ধ করে রেখেছি। আমরা তরুণ উদ্যোক্তা, কি করে এই লোকসান কাটিয়ে উঠব বুঝতে পারছি না। তাছাড়া সামনে রমজান ও ঈদ রয়েছে। ২৫ জন স্টাফের বেতন কোথা থেকে দেব বুঝে উঠতে পারছি না।
গতকাল মতিঝিলের একটি চায়ের স্টলে কথা হয় মনিরুল ইসলাম, সোহাগ ও আলামিনের সঙ্গে। তারা বলেন, আমরা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করি। সেই সুবাদে আরামবাগ ও ফকিরাপুলে থাকি। পরিবার থাকে গ্রামের বাড়িতে। অফিস শেষে বাসায় ফিরে খাবার খেতে রেস্টুরেন্টে যাই। আর ক’দিন পরেই রমজান ইফতার-সাহারি নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি। ফকিরাপুলের প্রিন্টিং প্রেস ব্যবসায়ী শেখর চন্দ্র রায় বলেন, আমি ব্যবসায়িক কাজে বেশিরভাগ সময়ই হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খাই। কিন্তু এমন অভিযানে পছন্দের হোটেলগুলো বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছি। বাসায় গিয়ে খেতে হচ্ছে। এতে সময় অপচয় ও পার্টি ধরে রাখতে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। মালিবাগের বাসিন্দা দুলাল মিয়া বলেন, আমার বাড়ি বরিশালে। চাকরির সুবাদে ঢাকায় একটি মেসে থাকি। এখন অভিযান চলছে রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকায় খাওয়া-দাওয়া করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলেন, এই সেক্টরটি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। বহু বছর ধরে রেস্তোরাঁ সেক্টরের সমস্যা নিয়ে সরকারি দপ্তরের শরণাপন্ন হয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি, মনিটরিংয়ের নামে শুধু হয়রানি চলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন, সরকার কর্তৃক উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন একটি টাস্কফোর্স গঠন করা। যার মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক সঠিক তথ্য বের হয়ে আসবে। একই সঙ্গে রেস্তোরাঁ সেক্টরের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি গাইডলাইনও তৈরি করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দেশে যেকোনো অঘটন ঘটলে রাষ্ট্রে দায়সারা সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এখন বেইলী রোডে অগ্নিকাণ্ডের পর তা আবার দেখা যাচ্ছে। এখানে রাজউকের মুখ্য ভূমিকায় থাকার কথা ছিল। এখন তারা নানা অজুহাতে দায় সারতে চাইছে। আবার সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কেউ এর দায় এড়াতে পারে না। অথচ নগর এলাকার সঠিক পরিকল্পনা, ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ ভবন নির্মাণ, কার্যকরী উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা, সেবা সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও নগর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার মাধ্যমে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড এড়ানো সম্ভব ছিল।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ঢাকায় যে পরিমাণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে বসবাস করতে হয়, বিশ্বের আর কোনো শহরে জীবনের এমন ঝুঁঁকি নেই। বেইলী রোডের এ অগ্নিকাণ্ড ঢাকায় জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি আবার সবার সামনে আনল। অথচ নগর পরিকল্পনা, ভবনের ডিজাইন, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা, ভবনের ব্যবহার, ভবনের অগ্নি প্রতিরক্ষা, ফায়ার ড্রিল, ভবন মালিকের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এবং নগর সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি থাকলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।
হোটেল-রেস্তোরাঁয় নিয়মিত খাবারের উপর নির্ভরশীল এমন কয়েকজন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আর ক’দিন পরই পবিত্র রমজান শুরু। নগরীর হাজার হাজার রোজাদার ইফতার ও সাহারি করতেন হোটেল-রেস্টুরেন্টে। তাদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে কিভাবে সম্পন্ন হবে ইফতার ও সাহারির কার্যক্রম। এছাড়া রমজান মাসে ব্যবসা, চাকরি ও অন্যান্য নানা কারণে মফস্বল থেকে লাখ লাখ রোজাদারকে ঢাকায় আসতে হয়। তারাও ইফতার ও সাহারির জন্য রাজধানীর হোটেল-রেস্টুরেন্টের ওপর নির্ভর করতেন। ঢালাওভাবে হোটেল রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেলে তাদেরও বিপাকে পড়তে হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ৩ মার্চ থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১১৩২টি হোটেল-রেস্টুরেন্টে অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় ৮৭২ জনকে।
























