০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

থমথমে অবস্থার মধ্যেই বুয়েট ছাড়ছে শিক্ষার্থীরা

❖ হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগ রাজনীতি সমর্থকদের
❖ ছাত্ররাজনীতি চালুর আগে সহাবস্থান চায় ছাত্রদল
❖ আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের

 

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি ঘিরে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই লম্বা ছুটিতে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। রোজা, ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের ছুটি মিলিয়ে ৪ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩ দিনের অবকাশ পাচ্ছেন তারা। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের বিপরীতমুখী অবস্থানে কয়েকদিন ধরে থমথমে অবস্থার মধ্যে ক্যাম্পাস ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্র রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে গতকাল বুধবারও পরীক্ষা বর্জন করেন তারা। ঈদের আগে এদিন শেষ পরীক্ষার তারিখ ছিল। এর আগে গত ৩০ ও ৩১ মার্চ দুটি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা অংশ নেননি।
এদিকে বুয়েট সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাত্ররাজনীতি বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিএনপির এই ছাত্র সংগঠনটির দাবি, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি চালু করতে হলে সব রাজনৈতিক সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসে ও হলে সব রাজনৈতিক সংগঠনকে অবাধে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিতে হবে। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ‘বুয়েট সংকট: সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতির দাবি’তে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল নেতারা এসব কথা বলেন।

তবে ছাত্রদলের সংহতি প্রত্যাখান করেছেন ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ দিন সন্ধ্যা ৭টায় বুয়েটের এম এ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতিবিহীন ক্যাম্পাসের পক্ষে আন্দোলনকে মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার ও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত আমাদের দাবির বিপরীতে আমাদের বিভিন্নভাবে হেনস্থা ও প্রোপাগান্ডার শিকার হতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা আবারও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, আমাদের অবস্থান কোনো একক ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে নয়। আমরা ছাত্ররাজনীতি-ই ক্যাম্পাসে প্রবেশের বিরুদ্ধে। অতএব এটি করতে চায় এমন যেকোনো সংগঠনের বিরুদ্ধেই আমাদের অবস্থান সমান এবং অনড়। আরো উল্লেখ্য যে, হিজবুত তাহরীর এর মতো নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠনের অস্তিত্বকেই আমরা সমর্থন করি না। সেখানে এরূপ নিষিদ্ধ সংগঠনের সমর্থন বা সহানুভূতি গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বুয়েটে গত দুই দিনব্যাপী চালানো অনলাইন জরিপের ফলাফল উল্লেখ করে বলেন, আমরা আমাদের নিজ নিজ ইনস্টিটিউশনাল মেইল ব্যবহার করে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে অনলাইনে ভোট গ্রহণ করি। যার ফলাফল হচ্ছে, সর্বমোট ছাত্রসংখ্যা ৫৮৩৪ জন। ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে স্বাক্ষর করেছেন ৫৬৮৩ জন। অর্থাৎ, ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। সুতরাং আমাদের অবস্থানের যথাযথতা এখানে প্রমাণিত।
এর আগে বিকালে বুয়েটের এম এ রশিদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে রাজনীতির পক্ষে থাকা ছয় শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

 

ক্যামিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটারিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী আশিক আলম বলেন, আমাদের জীবন নিয়ে থ্রেট দেওয়া হচ্ছে। আমরা আজ উপাচার্য স্যারের কাছে সবকিছুর প্রমাণ নিয়ে লিখিত আবেদন করেছি। আমরা ছাড়াও আরো যারা এটার ভুক্তভোগী তাদের নিরাপত্তার খাতিতে তাদের নামও আমরা লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেছি যেন এটি বন্ধ করা হয়। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুয়েটে নিষিদ্ধ হয় ছাত্র রাজনীতি। এরপর থেকে গত সাড়ে চার বছর প্রকৌশল শিক্ষার এই বিদ্যাপীঠে ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধই ছিল। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ একদল নেতাকর্মী বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে নতুন করে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাদের সমাগম ঘটানোর কারণ হিসেবে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের হলের সিট বাতিল করা হয়। এরপর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি ফেরানোর দাবিতে পাল্টা কর্মসূচি দেয় ছাত্রলীগ।

 

বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সোমবার বুয়েটে ছাত্র রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের দায়ের করা রিটের শুনানির পর হাইকোর্ট বুয়েটে রাজনীতি নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত করে।

তবে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে আইনি লড়াইয়ের কথাও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন তারা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

থমথমে অবস্থার মধ্যেই বুয়েট ছাড়ছে শিক্ষার্থীরা

আপডেট সময় : ০৫:৩০:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৪

❖ হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগ রাজনীতি সমর্থকদের
❖ ছাত্ররাজনীতি চালুর আগে সহাবস্থান চায় ছাত্রদল
❖ আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের

 

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি ঘিরে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই লম্বা ছুটিতে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। রোজা, ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখের ছুটি মিলিয়ে ৪ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩ দিনের অবকাশ পাচ্ছেন তারা। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের বিপরীতমুখী অবস্থানে কয়েকদিন ধরে থমথমে অবস্থার মধ্যে ক্যাম্পাস ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্র রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে গতকাল বুধবারও পরীক্ষা বর্জন করেন তারা। ঈদের আগে এদিন শেষ পরীক্ষার তারিখ ছিল। এর আগে গত ৩০ ও ৩১ মার্চ দুটি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা অংশ নেননি।
এদিকে বুয়েট সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাত্ররাজনীতি বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিএনপির এই ছাত্র সংগঠনটির দাবি, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি চালু করতে হলে সব রাজনৈতিক সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসে ও হলে সব রাজনৈতিক সংগঠনকে অবাধে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিতে হবে। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ‘বুয়েট সংকট: সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতির দাবি’তে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল নেতারা এসব কথা বলেন।

তবে ছাত্রদলের সংহতি প্রত্যাখান করেছেন ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ দিন সন্ধ্যা ৭টায় বুয়েটের এম এ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতিবিহীন ক্যাম্পাসের পক্ষে আন্দোলনকে মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার ও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত আমাদের দাবির বিপরীতে আমাদের বিভিন্নভাবে হেনস্থা ও প্রোপাগান্ডার শিকার হতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা আবারও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, আমাদের অবস্থান কোনো একক ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে নয়। আমরা ছাত্ররাজনীতি-ই ক্যাম্পাসে প্রবেশের বিরুদ্ধে। অতএব এটি করতে চায় এমন যেকোনো সংগঠনের বিরুদ্ধেই আমাদের অবস্থান সমান এবং অনড়। আরো উল্লেখ্য যে, হিজবুত তাহরীর এর মতো নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠনের অস্তিত্বকেই আমরা সমর্থন করি না। সেখানে এরূপ নিষিদ্ধ সংগঠনের সমর্থন বা সহানুভূতি গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বুয়েটে গত দুই দিনব্যাপী চালানো অনলাইন জরিপের ফলাফল উল্লেখ করে বলেন, আমরা আমাদের নিজ নিজ ইনস্টিটিউশনাল মেইল ব্যবহার করে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে অনলাইনে ভোট গ্রহণ করি। যার ফলাফল হচ্ছে, সর্বমোট ছাত্রসংখ্যা ৫৮৩৪ জন। ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে স্বাক্ষর করেছেন ৫৬৮৩ জন। অর্থাৎ, ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। সুতরাং আমাদের অবস্থানের যথাযথতা এখানে প্রমাণিত।
এর আগে বিকালে বুয়েটের এম এ রশিদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে রাজনীতির পক্ষে থাকা ছয় শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

 

ক্যামিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটারিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী আশিক আলম বলেন, আমাদের জীবন নিয়ে থ্রেট দেওয়া হচ্ছে। আমরা আজ উপাচার্য স্যারের কাছে সবকিছুর প্রমাণ নিয়ে লিখিত আবেদন করেছি। আমরা ছাড়াও আরো যারা এটার ভুক্তভোগী তাদের নিরাপত্তার খাতিতে তাদের নামও আমরা লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেছি যেন এটি বন্ধ করা হয়। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুয়েটে নিষিদ্ধ হয় ছাত্র রাজনীতি। এরপর থেকে গত সাড়ে চার বছর প্রকৌশল শিক্ষার এই বিদ্যাপীঠে ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধই ছিল। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ একদল নেতাকর্মী বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে নতুন করে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাদের সমাগম ঘটানোর কারণ হিসেবে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের হলের সিট বাতিল করা হয়। এরপর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি ফেরানোর দাবিতে পাল্টা কর্মসূচি দেয় ছাত্রলীগ।

 

বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সোমবার বুয়েটে ছাত্র রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের দায়ের করা রিটের শুনানির পর হাইকোর্ট বুয়েটে রাজনীতি নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত করে।

তবে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে আইনি লড়াইয়ের কথাও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন তারা।