গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে কমপক্ষে ৩৪ হাজার ৩৫৬ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরো ৭৭ হাজার ৩৬৮ জন। এরই মধ্যে দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে সশস্ত্র লড়াই বন্ধে ইচ্ছুক ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সংগঠনটির কয়েকজন নেতা এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তাদের একটি শর্ত রয়েছে। তা হলো, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব অঞ্চল দখল করেছিল, ওই অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করেছে হামাস। ইসরায়েলের পতনের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। তবে গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলায় উপত্যকাটিতে হামাসের ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠনটির নেতাদের এ ইঙ্গিতে বোঝা যায়, আগের অবস্থান নিয়ে সুর নরম করছেন তারা।
হামাসের এই নেতাদের একজন তুরস্কের ইস্তান্বুুলে বসবাসকারী বাসেম নাঈম। তিনি হামাসের রাজনৈতিক শাখার সদস্য। গত বৃহস্পতিবার নাইম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, জেরুজালেমকে রাজধানী করে যদি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হয়, আর শরণার্থীদের সেখানে ফেরার অধিকার দেওয়া হয়, তাহলে আল কাসেম ব্রিগেডকে (হামাসের সামরিক শাখা) ভবিষ্যতে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। হামাসের শর্তগুলো মেনে নেওয়া হলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই ‘অবশ্যই’ বন্ধ করা হবে। ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) যদি তাদের গঠনতন্ত্র ও প্রশাসনে ‘সংস্কার’ আনে, তাহলে সংগঠনটির সঙ্গে যোগ দিতে চায় হামাস।
তবে হামাসের নেতারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শর্ত সাপেক্ষে অস্ত্র প্রত্যাহারের কথা বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এখনো কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। আর বিদেশে অবস্থান করা হামাসের নেতাদের বক্তব্য গাজায় থাকা সংগঠনটির সামরিক শাখার নেতাদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে মেলে কি না, তা স্পষ্ট নয়। হামাস বরাবরই স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠায় দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বিরোধিতা করে আসছে। দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান অনুযায়ী, ইসরায়েলের পাশাপাশি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা হবে। এর বিপরীতে এত দিন ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক সব অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার কথা বলে এসেছে হামাস। এসব অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে আজকের ইসরায়েল, অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা দখল করে ইসরায়েল। এই অঞ্চলগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীন বলে বিবেচনা করা হয়। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এসব অঞ্চলকে দখলকৃত বলে মনে করে। এই অঞ্চলগুলো নিয়েই ভবিষ্যতে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চান ফিলিস্তিনিরা। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের এমন আকাক্সক্ষার বিরোধিতা করে আসছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, এতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
এদিকে ফিলিস্তিনের গাজায় হামাসের যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল কাতার থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করে হামাসের মুখপাত্র খলিল আল হায়া বলেন, ‘গত ১৩ এপ্রিল মিসর ও কাতারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল, তাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দিয়েছে ইসরায়েল।’ এর আগে কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত ২৫ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অস্থায়ী বিরতি ঘোষণা করেছিল হামাস-আইডিএফ। সেই বিরতির সময় নিজেদের কব্জায় থাকা জিম্মিদের মধ্যে ১০৮ জন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছিল হামাস। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে থেকে ১৫০ জনকে কারাগার থেকে ছেড়ে দিয়েছিল ইসরায়েলও। ওই বিরতি শেষ হওয়ার পর গাজায় দ্বিতীয় দফা যুদ্ধবিরতির জন্য কাজ করছিল মধ্যস্থতাকারী তিন দেশ। চলতি বছর রমজান মাস থেকে তা শুরু হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু মূলত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর আপত্তির কারণে তা আর হয়নি। ফলে হামাসের কব্জায় থাকা বাকি ১৩২ জন জিম্মির ভাগ্যে কী ঘটেছে এখনও অজানা। তবে মিসরের প্রতিনিধিদলের এক কর্মকর্তা জানান, ১৩ এপ্রিল পাঠানো প্রস্তাবে ৩৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দিতে সম্মতি জানিয়েছে হামাস।
অন্যদিকে চীনের বেইজিংয়ে ঐক্য সংলাপে বসতে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনের দুই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী হামাস ও ফাতাহের প্রতিনিধিরা। শুক্রবার সংলাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হামাস ও ফাতাহর নেতারা এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন। সংলাপে ফাতাহের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন গোষ্ঠীটির জ্যেষ্ঠ নেতা আজাম আল আহমেদ, আর হামাসের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন ওই গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ নেতা মুসা আবু মারজুক। জানা গেছে, শিগগিরই এই সংলাপ শুরু করতে উভয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা শুক্রবার বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এদিন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখাপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, ‘আমরা ফিলিস্তিনের জাতীয় কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী দেখতে চাই এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী যেসব রাজনৈতিক পক্ষ সংলাপ এবং আলোচনার মাধ্যমে ঐক্য স্থাপন করতে চায়, তাদের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রতিপক্ষ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য স্থাপনই সংলাপের মূল উদ্দেশ্য। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে কূটনৈতিক কর্মকর্তা ওয়াং কেজিয়ান হামাসের প্রেসিডেন্ট ইসমাঈল হানিয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সে সময় বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই শান্তি সংলাপের প্রস্তাব দেন ওয়াং কেজিয়ান এবং হানিয়েও তাতে সম্মতি দেন।
এদিকে গাজায় খান ইউনিসের নুসেইরাত শরণার্থী শিবির এবং রাফায় বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে নারী ও শিশুসহ ১৫ জন নিহত হয়েছেন। মধ্য গাজা উপত্যকার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ভোরে ইসরায়েলি বোমা হামলায় শিশু ও নারীসহ আটজন নিহত হয়েছে। এদিকে, রাফাহ শহরে ইসরায়েলি বোমা হামলায় দুই শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে। এছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের পশ্চিমে সালেম সামরিক চেকপয়েন্টের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে দুই তরুণ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফাহর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই অভিযানের ফলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে মিশরসহ বিভিন্ন দেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও সতর্কতা উচ্চারণ করেছে। তবে এতে কোনো কর্ণপাত করছেন না ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই শহরে ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতির বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আরবি ভাষার মুখপাত্র পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগ করা মুখপাত্র হালা রাহারিত দুবাই আঞ্চলিক মিডিয়া হাবের ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। ১৮ বছর আগে একজন রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে স্টেট ডিপার্টমেন্টে যোগ দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইন-এ তিনি লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গাজা নীতির বিরোধিতা করে ১৮ বছর মর্যাদাপূর্ণ সেবা প্রদান করার পর আমি এপ্রিল ২০২৪ সালে পদত্যাগ করেছি’। প্রায় এক মাস আগে, পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার ব্যুরোর অ্যানেল শেলাইন পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা জোশ পল গত অক্টোবরে পদত্যাগ করেন। দেশটির শিক্ষা বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, তারিক হাবাশ, যিনি ফিলিস্তিনি-আমেরিকান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেছিলেন।
গত শুক্রবার জেনেভায় এক বিফ্রিংয়ে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পেহর লোধাম্মার বলেন, হামাস-ইসরায়েল সংঘাতের ফলে প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে। যা ব্যাপক ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে পড়ে আছে। গাজায় পাওয়া অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। তারপরও ধ্বংস হওয়া ভবনগুলোর ধ্বংসাবশেষসহ পুরো ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে ১৪ বছরের মতো সময় লাগতে পারে। আমরা জানি, সাধারণত স্থল বাহিনীর ছোড়া গোলাবারুদের অন্তত ১০ শতাংশ অবিস্ফোরিত অবস্থায় থেকে যায়। আমরা ১০০টি ট্রাক ব্যবহার করে ১৪ বছর ধরে পরিষ্কার কাজ চালানোর কথা বলছি। উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবর হামাস নেতৃত্বাধীন হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত এবং ২৫০ জনেরও বেশি মানুষকে জিম্মি নেওয়া হয়েছিল। তার উত্তরে ইসরায়েলে পাল্টা আক্রমণ চালায়। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর ফলে ৩৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলটির বিরাট অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং বহু ফিলিস্তিনি খাবারের দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে।

























