০৬:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেতে হবে বহুদূর

  • দেশে নারী শ্রমিক বেশি বৈষম্যের শিকার
  • প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ মনিটরিং

দেশে বেড়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতে শ্রমিকের সংখ্যা। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় স্বাক্ষরকারী একটি দেশ হিসেবে এ দেশের শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ এ লক্ষ্যে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ পাস হয়েছে। এই আইনের আওতায় শ্রমিকের মজুরি, ন্যায্য পাওনা, ছুটিসহ সব বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এতদিন পরে আইনটি পুরোপুরি দেশের সবক্ষেত্রে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশে পুরুষ নারী উভয় শ্রমিকই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে নারী শ্রমিকেরা বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই অবস্থার পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আজ বুধবার মহান মে দিবস। বাংলাদেশ সরকার এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর পালন করে আসছে। এ বছরও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি সরকারি ছুটি ছুটির দিন।

সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থায় হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ স্টেশন, গণমাধ্যম, পরিবহনসহ জরুরি সেবাখাতগুলো চালু থাকে। এদিন যারা ডিউটিতে থাকে তারা বিশেষ ভাতা পায়। একসময় দেশের সব সেক্টর এ দিবসে ছুটি থাকলেও বছর বছর এই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন মে দিবসে দেখা যায়, পরিবহন শ্রমিকেরা রাস্তায় গাড়ি বের করছে। অনেক মার্কেট কর্তৃপক্ষ মার্কেটও খুলে রাখছে। খোলা থাকছে অভিজাত রেস্তোরাঁও। বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরে নতুন সংযোজন মেট্রোরেল। মেট্রো কর্তৃপক্ষ মে দিবসের দিনে তাদের ট্রেন চালু রাখবে এমনটিই শোনা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার মেট্রোরেল স্টেশনে কর্মরত পুলিশ তানহার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে চাকরি করি। শুধু মাস শেষে বেতনটা পাই। আর দুই ঈদে দুইটা বোনাস পাই। এছাড়া আর অন্য কোনো সুবিধা আমরা পাই না। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বিশেষ দিনগুলোতে ট্রেন বেশি পরিমাণে চলাচল করায়।’ দেশের শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার ২০০৬ সালে শ্রম আইন তৈরি করেছে। এটি ‘শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও। শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্যে ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা কল্যাণ ও চাকরির অবস্থা ও পরিবেশ এবং শিক্ষাধীনতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে সব আইনের সংশোধন ও সংহতকরণকল্পে প্রণীত আইন’। এই আইনের ১৬ ধারায় নিয়োগপত্র প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘কোনো মালিক নিয়োগপত্র প্রদান না করিয়া কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করিতে পারিবেন না, নিয়োজিত প্রত্যেক শ্রমিককে ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান করিতে হইবে।’ সার্ভিস বহি প্রসঙ্গে আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক মালিক তাহার নিজস্ব খরচে তৎকর্তৃক নিযুক্ত প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য একটি সার্ভিস বইয়ের ব্যবস্থা করিবেন।

‘ নারীদের প্রতি আচরণ প্রসঙ্গে আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে কোনো মহিলা নিযুক্ত থাকিলে, তিনি যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, তার প্রতি উক্ত প্রতিষ্ঠানের অন্য কেহ এমন কোনো আচরণ করিতে পারিবেন না যাহা অশ্লীল কিংবা অভদ্রজনোচিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে, কিংবা যাহা উক্ত মহিলার শালীনতা ও সম্ভ্রমের পরিপন্থি।’ সমকাজের জন্য সম-মজুরি প্রদান অংশে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিকের জন্য কোনো মজুরি নির্ধারণ বা নিম্নতম মজুরির হার স্থিরীকরণের ক্ষেত্রে, একই প্রকৃতির বা একই মান বা মূল্যের কাজের জন্য (মহিলা, পুরুষ এবং প্রতিবন্ধী) শ্রমিকগণের জন্য সমান মজুরির নীতি অনুসরণ করিতে হইবে; এবং এতদসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে (নারী-পুরুষ-প্রতিবন্ধী) ভেদের কারণে কোনো বৈষম্য করা যাইবে না।’ আইনজীবীদের মতে, শ্রম আইনে যা আছে তা শ্রমিকের পক্ষেই করা হয়েছে। এই আইন ব্যবহার করে একজন শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে। শ্রমমন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ এর তথ্যানুযায়ী দেশের কর্মক্ষম পুরুষের সংখ্যা ৪৬.৪৪ মিলিয়ন ও কর্মক্ষম নারীর সংখ্যা ২৪.৬৭ মিলিয়ন। দেশের নারীরা এখন পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ, গার্মেন্টসসহ প্রায় সব সেক্টরেই কাজ করছে। তবুও নারী তার শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে আইনজীবী দীপ্তি শিকদার দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ‘শ্রম আইনের বাস্তবায়ন পুরোপুরি এখনো হয়নি। শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য এখনো আছে। শ্রমিকদের যে ন্যায্য মজুরি সেটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও অনেক পিছিয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ সুবিধাদি পায় না। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যদি আমরা দেখি তাহলে বিশাল মজুরি বৈষম্য আছে। একজন পুরুষকে যা মজুরি দেওয়া হয়, নারীকে তার চেয়ে কম মজুরি দেওয়া হয়। কখনও ২৫ শতাংশ কম দেওয়া হয়।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেসব যথাযথ সুযোগ সুবিধা এগুলো আগের চেয়ে বেড়েছে কিন্তু তবু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। মে দিবসের ছুটি শ্রমিক-কর্মকর্তা- কর্মচারীদের জন্য বৈশ্বিকভাবেই স্বীকৃত; সে কারণে আমি বলব যে, যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবেই শ্রমিকরা, মেহনতি মানুষেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারে। এখন দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি সেগুলো এটির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বেতন যে সহনীয় পর্যায়ে আনা প্রয়োজন এই বিষয়গুলোতেও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।’ এখনও দেশে শ্রমিকেরা ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না উল্লেখ করে অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, শ্রমিকের ন্যূনতম চলার জন্য যা প্রয়োজন সেটাও তারা পাচ্ছে না। নারীরা পুরুষের চেয়ে আরও কম পাচ্ছে। সেখানে তারা এই ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারীরা অন্য শ্রমিকের চেয়ে সব সেক্টরেই কম বেতন পায়। আমরা মনে করি মে দিবসের সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে। শ্রমিকদেরকে তাদের ন্যায্য বেতন দিতে হবে এবং তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে হবে। শ্রমিকদের নিজেদের দাবি আদায়ে কাজ করতে হবে। দাবি আদায়ে আন্দোলন শুধু একদিন করলে হবে না। আমাদের মালিকপক্ষকে সরকারকে বাধ্য করতে হবে যাতে করে তাদের যে ন্যায্য অধিকার সে অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।’ দেশের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সর্বশেষ ভরসার স্থল শ্রম আদালত। তবে, মোট ভুক্তভোগীর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক শ্রমিক দাবি আদায়ের জন্য আদালতে যান। সেই সংখ্যাটিও কম নয়।

প্রায় ২৪ হাজার মামলা বর্তমানে শ্রম আদালতে ঝুলে আছে। এই অবস্থায় যারা অধিকার আদায়ে মামলা করেন তারা মামলাগুলো থেকে সত্যি সুফল কতটুকু পান এ প্রসঙ্গে শ্রম আদালতের আইনজীবী মহিউদ্দিন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, শ্রমিক যারা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, যাদের আইডি কার্ড আছে, নিয়োগপত্র আছে, যারা প্রমাণ করতে পারে যে, তারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে। চাকরি কি কারণে গেছে? মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক কেন ছিন্ন হয়েছে? এই বিষয়গুলো যদি প্রমাণ করতে পারে তাহলে তারা বিচার পায়। মামলাগুলোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলার রায় শ্রমিকের পক্ষে থাকে।’ মামলার দীর্ঘসূত্রিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আদালতের কার্যক্রমের উপর নির্ভর করে মামলার রায় হয়। জুডিশিয়ারি বিষয়টি কোর্ট ফলো করলে রায় হতে দেরি হয়। আবার যদি কোর্ট উদ্যোগ নেয় যে, দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি করব তাহলে তা করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এক দুই বছরের মধ্যে রায় হয়ে যায়। রায়ের পর সাধারণত শ্রমিক লেভেলের পাওনা মালিকরা মিটিয়ে দেয়। কিন্তু ম্যানেজেরিয়াল লেভেলে যারা থাকে তাদের টাকার পরিমাণটা বেশি থাকে তখন মালিকরা চায় এটা দেরি করতে।’

ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত পবিপ্রবি?

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেতে হবে বহুদূর

আপডেট সময় : ১২:১৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ মে ২০২৪
  • দেশে নারী শ্রমিক বেশি বৈষম্যের শিকার
  • প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ মনিটরিং

দেশে বেড়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতে শ্রমিকের সংখ্যা। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় স্বাক্ষরকারী একটি দেশ হিসেবে এ দেশের শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ এ লক্ষ্যে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ পাস হয়েছে। এই আইনের আওতায় শ্রমিকের মজুরি, ন্যায্য পাওনা, ছুটিসহ সব বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এতদিন পরে আইনটি পুরোপুরি দেশের সবক্ষেত্রে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশে পুরুষ নারী উভয় শ্রমিকই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে নারী শ্রমিকেরা বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই অবস্থার পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আজ বুধবার মহান মে দিবস। বাংলাদেশ সরকার এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর পালন করে আসছে। এ বছরও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি সরকারি ছুটি ছুটির দিন।

সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থায় হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ স্টেশন, গণমাধ্যম, পরিবহনসহ জরুরি সেবাখাতগুলো চালু থাকে। এদিন যারা ডিউটিতে থাকে তারা বিশেষ ভাতা পায়। একসময় দেশের সব সেক্টর এ দিবসে ছুটি থাকলেও বছর বছর এই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন মে দিবসে দেখা যায়, পরিবহন শ্রমিকেরা রাস্তায় গাড়ি বের করছে। অনেক মার্কেট কর্তৃপক্ষ মার্কেটও খুলে রাখছে। খোলা থাকছে অভিজাত রেস্তোরাঁও। বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরে নতুন সংযোজন মেট্রোরেল। মেট্রো কর্তৃপক্ষ মে দিবসের দিনে তাদের ট্রেন চালু রাখবে এমনটিই শোনা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার মেট্রোরেল স্টেশনে কর্মরত পুলিশ তানহার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে চাকরি করি। শুধু মাস শেষে বেতনটা পাই। আর দুই ঈদে দুইটা বোনাস পাই। এছাড়া আর অন্য কোনো সুবিধা আমরা পাই না। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বিশেষ দিনগুলোতে ট্রেন বেশি পরিমাণে চলাচল করায়।’ দেশের শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার ২০০৬ সালে শ্রম আইন তৈরি করেছে। এটি ‘শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও। শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্যে ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা কল্যাণ ও চাকরির অবস্থা ও পরিবেশ এবং শিক্ষাধীনতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে সব আইনের সংশোধন ও সংহতকরণকল্পে প্রণীত আইন’। এই আইনের ১৬ ধারায় নিয়োগপত্র প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘কোনো মালিক নিয়োগপত্র প্রদান না করিয়া কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করিতে পারিবেন না, নিয়োজিত প্রত্যেক শ্রমিককে ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান করিতে হইবে।’ সার্ভিস বহি প্রসঙ্গে আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক মালিক তাহার নিজস্ব খরচে তৎকর্তৃক নিযুক্ত প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য একটি সার্ভিস বইয়ের ব্যবস্থা করিবেন।

‘ নারীদের প্রতি আচরণ প্রসঙ্গে আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে কোনো মহিলা নিযুক্ত থাকিলে, তিনি যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, তার প্রতি উক্ত প্রতিষ্ঠানের অন্য কেহ এমন কোনো আচরণ করিতে পারিবেন না যাহা অশ্লীল কিংবা অভদ্রজনোচিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে, কিংবা যাহা উক্ত মহিলার শালীনতা ও সম্ভ্রমের পরিপন্থি।’ সমকাজের জন্য সম-মজুরি প্রদান অংশে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিকের জন্য কোনো মজুরি নির্ধারণ বা নিম্নতম মজুরির হার স্থিরীকরণের ক্ষেত্রে, একই প্রকৃতির বা একই মান বা মূল্যের কাজের জন্য (মহিলা, পুরুষ এবং প্রতিবন্ধী) শ্রমিকগণের জন্য সমান মজুরির নীতি অনুসরণ করিতে হইবে; এবং এতদসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে (নারী-পুরুষ-প্রতিবন্ধী) ভেদের কারণে কোনো বৈষম্য করা যাইবে না।’ আইনজীবীদের মতে, শ্রম আইনে যা আছে তা শ্রমিকের পক্ষেই করা হয়েছে। এই আইন ব্যবহার করে একজন শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে। শ্রমমন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ এর তথ্যানুযায়ী দেশের কর্মক্ষম পুরুষের সংখ্যা ৪৬.৪৪ মিলিয়ন ও কর্মক্ষম নারীর সংখ্যা ২৪.৬৭ মিলিয়ন। দেশের নারীরা এখন পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ, গার্মেন্টসসহ প্রায় সব সেক্টরেই কাজ করছে। তবুও নারী তার শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে আইনজীবী দীপ্তি শিকদার দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ‘শ্রম আইনের বাস্তবায়ন পুরোপুরি এখনো হয়নি। শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য এখনো আছে। শ্রমিকদের যে ন্যায্য মজুরি সেটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও অনেক পিছিয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ সুবিধাদি পায় না। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যদি আমরা দেখি তাহলে বিশাল মজুরি বৈষম্য আছে। একজন পুরুষকে যা মজুরি দেওয়া হয়, নারীকে তার চেয়ে কম মজুরি দেওয়া হয়। কখনও ২৫ শতাংশ কম দেওয়া হয়।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেসব যথাযথ সুযোগ সুবিধা এগুলো আগের চেয়ে বেড়েছে কিন্তু তবু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। মে দিবসের ছুটি শ্রমিক-কর্মকর্তা- কর্মচারীদের জন্য বৈশ্বিকভাবেই স্বীকৃত; সে কারণে আমি বলব যে, যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবেই শ্রমিকরা, মেহনতি মানুষেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারে। এখন দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি সেগুলো এটির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বেতন যে সহনীয় পর্যায়ে আনা প্রয়োজন এই বিষয়গুলোতেও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।’ এখনও দেশে শ্রমিকেরা ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না উল্লেখ করে অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, শ্রমিকের ন্যূনতম চলার জন্য যা প্রয়োজন সেটাও তারা পাচ্ছে না। নারীরা পুরুষের চেয়ে আরও কম পাচ্ছে। সেখানে তারা এই ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারীরা অন্য শ্রমিকের চেয়ে সব সেক্টরেই কম বেতন পায়। আমরা মনে করি মে দিবসের সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে। শ্রমিকদেরকে তাদের ন্যায্য বেতন দিতে হবে এবং তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে হবে। শ্রমিকদের নিজেদের দাবি আদায়ে কাজ করতে হবে। দাবি আদায়ে আন্দোলন শুধু একদিন করলে হবে না। আমাদের মালিকপক্ষকে সরকারকে বাধ্য করতে হবে যাতে করে তাদের যে ন্যায্য অধিকার সে অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।’ দেশের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সর্বশেষ ভরসার স্থল শ্রম আদালত। তবে, মোট ভুক্তভোগীর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক শ্রমিক দাবি আদায়ের জন্য আদালতে যান। সেই সংখ্যাটিও কম নয়।

প্রায় ২৪ হাজার মামলা বর্তমানে শ্রম আদালতে ঝুলে আছে। এই অবস্থায় যারা অধিকার আদায়ে মামলা করেন তারা মামলাগুলো থেকে সত্যি সুফল কতটুকু পান এ প্রসঙ্গে শ্রম আদালতের আইনজীবী মহিউদ্দিন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, শ্রমিক যারা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, যাদের আইডি কার্ড আছে, নিয়োগপত্র আছে, যারা প্রমাণ করতে পারে যে, তারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে। চাকরি কি কারণে গেছে? মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক কেন ছিন্ন হয়েছে? এই বিষয়গুলো যদি প্রমাণ করতে পারে তাহলে তারা বিচার পায়। মামলাগুলোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলার রায় শ্রমিকের পক্ষে থাকে।’ মামলার দীর্ঘসূত্রিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আদালতের কার্যক্রমের উপর নির্ভর করে মামলার রায় হয়। জুডিশিয়ারি বিষয়টি কোর্ট ফলো করলে রায় হতে দেরি হয়। আবার যদি কোর্ট উদ্যোগ নেয় যে, দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি করব তাহলে তা করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এক দুই বছরের মধ্যে রায় হয়ে যায়। রায়ের পর সাধারণত শ্রমিক লেভেলের পাওনা মালিকরা মিটিয়ে দেয়। কিন্তু ম্যানেজেরিয়াল লেভেলে যারা থাকে তাদের টাকার পরিমাণটা বেশি থাকে তখন মালিকরা চায় এটা দেরি করতে।’