০৫:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিন্ডিকেটে বাড়ছে পশুখাদ্যের দাম কোরবানির বাজারে প্রভাবের শঙ্কা

⦿ দফায় দফায় বেড়েছে গো-খাদ্যের দাম
⦿ জোগান বেশি থাকলেও কোরবানির পশুর দাম বাড়ার শঙ্কা
⦿ বছরের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত Ñআইডিআরএন
⦿ তীব্র তাপপ্রবাহে বেড়েছে লালন-পালন ব্যয়

🔗 সবুজ মাঠ না থাকার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কৃত্রিম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোÑ ড. জাহাঙ্গীর আলম, কৃষি অর্থনীতিবিদ
🔗 বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশে দাম বাড়লেও পরে আর কমেনি- ড. মো. মুহিউদ্দীন, সাবেক প্রধান প্রাণী পুষ্টি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
🔗গোখাদ্যের সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি, আলী আজম রহমান শিবলী, বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি

এ বছর পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হতে পারে আগামী ১৭ জুন। এখনও ঈদের বাকি এক মাসেরও কম। সেই হিসাবে এখন হচ্ছে খামারি ও ব্যবসায়ীদের জন্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য উপযুক্ত সময়। সাধারণত বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদে গরু, মহিষ, ছাগল থেকে শুরু করে গবাদি পশুর চাহিদা বেশি থাকে। ইতিমধ্যে আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে পশু কেনাবেচা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর চাহিদার চেয়ে জোগানের পরিমাণ বেশি থাকলেও দাম বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। খামারিরা বলছেন, সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহে পশুর জন্য বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত লালন-পালন ব্যয় বেড়েছে। দফায় দফায় বেড়েছে গো-খাদ্যের দাম। এই দাম বাড়ার পেছনে সিন্ডিকেটকে দায়ি করছেন ব্যবসায়ীরা। ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক (আইডিআরএন) বলছে, এক বছরেই প্রাণীর খাবারের দাম বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, যেখানে বিশ্ববাজারে বাড়ে ২০.৬ শতাংশ। তাই এবার পশুর দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশুখাদ্যের দাম বাড়ার পর আর কমেনি। তীব্র গরমে অতিরিক্ত যত্ন নিতে গিয়ে খামারিদের আইপিএস ব্যহার করতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহে বাড়ছে বিল। বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে লালন-পালনের ব্যয়ও বেড়েছে। তাই গতবারের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

তবে কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে এবার অধিকাংশ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো না। তাই পশুর চাহিদা কমে গিয়ে বিক্রি আগের তুলনায় বেশি নাও হতে পারে। এতে অনেক পশু অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। ফলে বিপাকে পড়তে পারেন খামারিরা।
দেশে প্রচলিত প্রাণিখাদ্যের উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া, সয়ামিল, ডি অয়েল রাইস পলিশ, মসুর ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, ছোলার ভুসি, মুগ ভুসি, খড়, চালের খুদ। এসব উপাদানের দাম এবার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

কয়েক বছর আগে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা সয়ামিলের দাম ছিল ১ হাজার ৭০০ টাকা; ২০২৪ সালে এসে তা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি বস্তা গমের ভুসির দাম ছিল ৭৮০ টাকা, এখন কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ৫০ কেজি ওজনের ডি অয়েল রাইস পলিশের দাম ছিল প্রতি বস্তা ৭০০ টাকা; এখন ১ হাজার ৯০০ টাকা। মসুর ভুসির ৫০ কেজি ওজনের বস্তার দাম ছিল ৫৩৮ টাকা; এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। ভুট্টার ৫০ কেজি ওজনের বস্তার দাম ছিল ৮৫৪ টাকা; এখন কিনতে লাগছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া কয়েক বছর আগে ধানের কুঁড়া ও ছোলার ভুসির দাম নামমাত্র থাকলেও এখন ধানের কুঁড়া ৫০ কেজির বস্তা কিনতে লাগে ৮৫০ টাকা আর ছোলার ভুসির বস্তা তিন হাজার টাকা।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ) জানিয়েছে, ছয় বছরের ব্যবধানে দেশে প্রাণিখাদ্যের প্রধান ছয়টি পণ্যের গড় দাম বেড়েছে ১৩৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) বলছে, ২০২০ সালে ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম ছিল ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। তিন বছরের ব্যবধানে একই খাদ্য বস্তাপ্রতি দেড় হাজার টাকা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজারে ঠেকেছে।
পশু খাবারের দাম নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক (আইডিআরএন)। সংস্থাটির তথ্যমতে, বছরের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এ বিষয়ে সংস্থাটির প্রধান সমন্বয়ক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী পুষ্টি বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মুহিউদ্দীন বলেন, আমাদের মূলত সয়ামিল, ভুট্টা ও গম আমদানি করতে হয়। এখন আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর না। তবে বিশ্ববাজারের চেয়ে দেশে সবসময় ১০ শতাংশ বেশি দাম থাকে। গত বছরের মার্চের পর বিশ্ববাজারে বাড়ার কারণে দেশে দাম বাড়লেও পরে আর কমেনি। গতবারের তুলনায় এবার পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে এবার গবাদিপশুর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ ২ হাজার ৩৯৪টি। যার বিপরীতে দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। যা গত বছরের তুলনায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪টি বেশি। সে হিসেবে চাহিদার চেয়ে ২২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৭৩টি অতিরিক্ত গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর মধ্যে গরু ৫২ লাখ ৬৮৪টি, মহিষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৩২০টি, ছাগল ৬৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৮টি, ভেড়া ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৭৪৩টি এবং অন্য প্রজাতির ১ হাজার ৮৫০টি পশু রয়েছে।
খামারিরাও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বাড়তি দাম না পেলে লোকসানে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বিসমিল্লাহ অ্যাগ্রো খামারের স্বত্বাধিকারী রাশেদুল ইসলাম বলেন, এবার পশুর খাবারের দাম বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। গরমের কারণে সবসময় ফ্যান চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে। গরু খাবার কম খাচ্ছে। ফলে ওজন কমে যাচ্ছে। তাই এত ব্যয়ের পর এবার বাড়তি দাম না পেলে আমাদের লস হয়ে যাবে।
অতিরিক্ত দামে খামারিরা কোন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে খামারি মো. ওসমান জানান, ১০ বছর আগে গমের ভুসি ছিল ৮-১০ টাকা কেজি। এখন তা প্রতি কেজি ৬০-৬২ টাকা। এক মণ খেসারি ডালের ভুসির দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা। এক মণ খড়ের দাম এখন ৫০০-৬০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৩০০ টাকা। এক বছরে গো-খাদ্য বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গমের ভুসির দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ টাকা। ডালের ভুসি ৫০০ থেকে বেড়ে এখন ৮০০ টাকা। এভাবে যদি দাম বাড়তে থাকে তাইলে আমাদের খামার ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।

নিয়মিত খাদ্যের দাম বাড়া ও সামগ্রীক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলী আজম রহমান শিবলী বলেন, খামারিদের বাঁচাতে হলে দুধের দাম বাড়ানো, প্রাণিখাদ্যে ভর্তুকি, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে খামার পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, নিম্নমানের গুঁড়াদুধ আমদানি বন্ধ করা, গোখাদ্যের সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ীদের বিচারের আওতায় আনা ও ভেজাল খাদ্য রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে খোলা মাঠে ছিল সবুজ ঘাস। প্রয়োজনের তাগিদে সেই মাঠ এখন আবাদি জমি হয়ে গেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কৃত্রিম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। তবে কৃত্রিম খাদ্যের মান নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। আমাদের ঘাসের ওপর নির্ভর করে শুধু দেশীয় গরু লালন-পালন সম্ভব। উন্নতজাতের গাভি যেগুলো দিনে ১০ থেকে ২০ লিটার দুধ দেয়, সেসবের জন্য অবশ্যই ঘাসের পাশাপাশি দানাদার খাবার লাগবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিন্ডিকেটে বাড়ছে পশুখাদ্যের দাম কোরবানির বাজারে প্রভাবের শঙ্কা

আপডেট সময় : ০৭:২০:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪

⦿ দফায় দফায় বেড়েছে গো-খাদ্যের দাম
⦿ জোগান বেশি থাকলেও কোরবানির পশুর দাম বাড়ার শঙ্কা
⦿ বছরের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত Ñআইডিআরএন
⦿ তীব্র তাপপ্রবাহে বেড়েছে লালন-পালন ব্যয়

🔗 সবুজ মাঠ না থাকার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কৃত্রিম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোÑ ড. জাহাঙ্গীর আলম, কৃষি অর্থনীতিবিদ
🔗 বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশে দাম বাড়লেও পরে আর কমেনি- ড. মো. মুহিউদ্দীন, সাবেক প্রধান প্রাণী পুষ্টি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
🔗গোখাদ্যের সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি, আলী আজম রহমান শিবলী, বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি

এ বছর পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হতে পারে আগামী ১৭ জুন। এখনও ঈদের বাকি এক মাসেরও কম। সেই হিসাবে এখন হচ্ছে খামারি ও ব্যবসায়ীদের জন্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য উপযুক্ত সময়। সাধারণত বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদে গরু, মহিষ, ছাগল থেকে শুরু করে গবাদি পশুর চাহিদা বেশি থাকে। ইতিমধ্যে আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে পশু কেনাবেচা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর চাহিদার চেয়ে জোগানের পরিমাণ বেশি থাকলেও দাম বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। খামারিরা বলছেন, সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহে পশুর জন্য বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত লালন-পালন ব্যয় বেড়েছে। দফায় দফায় বেড়েছে গো-খাদ্যের দাম। এই দাম বাড়ার পেছনে সিন্ডিকেটকে দায়ি করছেন ব্যবসায়ীরা। ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক (আইডিআরএন) বলছে, এক বছরেই প্রাণীর খাবারের দাম বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, যেখানে বিশ্ববাজারে বাড়ে ২০.৬ শতাংশ। তাই এবার পশুর দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশুখাদ্যের দাম বাড়ার পর আর কমেনি। তীব্র গরমে অতিরিক্ত যত্ন নিতে গিয়ে খামারিদের আইপিএস ব্যহার করতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহে বাড়ছে বিল। বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে লালন-পালনের ব্যয়ও বেড়েছে। তাই গতবারের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

তবে কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে এবার অধিকাংশ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো না। তাই পশুর চাহিদা কমে গিয়ে বিক্রি আগের তুলনায় বেশি নাও হতে পারে। এতে অনেক পশু অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। ফলে বিপাকে পড়তে পারেন খামারিরা।
দেশে প্রচলিত প্রাণিখাদ্যের উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া, সয়ামিল, ডি অয়েল রাইস পলিশ, মসুর ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, ছোলার ভুসি, মুগ ভুসি, খড়, চালের খুদ। এসব উপাদানের দাম এবার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

কয়েক বছর আগে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা সয়ামিলের দাম ছিল ১ হাজার ৭০০ টাকা; ২০২৪ সালে এসে তা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি বস্তা গমের ভুসির দাম ছিল ৭৮০ টাকা, এখন কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ৫০ কেজি ওজনের ডি অয়েল রাইস পলিশের দাম ছিল প্রতি বস্তা ৭০০ টাকা; এখন ১ হাজার ৯০০ টাকা। মসুর ভুসির ৫০ কেজি ওজনের বস্তার দাম ছিল ৫৩৮ টাকা; এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। ভুট্টার ৫০ কেজি ওজনের বস্তার দাম ছিল ৮৫৪ টাকা; এখন কিনতে লাগছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া কয়েক বছর আগে ধানের কুঁড়া ও ছোলার ভুসির দাম নামমাত্র থাকলেও এখন ধানের কুঁড়া ৫০ কেজির বস্তা কিনতে লাগে ৮৫০ টাকা আর ছোলার ভুসির বস্তা তিন হাজার টাকা।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ) জানিয়েছে, ছয় বছরের ব্যবধানে দেশে প্রাণিখাদ্যের প্রধান ছয়টি পণ্যের গড় দাম বেড়েছে ১৩৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) বলছে, ২০২০ সালে ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম ছিল ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। তিন বছরের ব্যবধানে একই খাদ্য বস্তাপ্রতি দেড় হাজার টাকা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজারে ঠেকেছে।
পশু খাবারের দাম নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক (আইডিআরএন)। সংস্থাটির তথ্যমতে, বছরের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এ বিষয়ে সংস্থাটির প্রধান সমন্বয়ক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী পুষ্টি বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মুহিউদ্দীন বলেন, আমাদের মূলত সয়ামিল, ভুট্টা ও গম আমদানি করতে হয়। এখন আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর না। তবে বিশ্ববাজারের চেয়ে দেশে সবসময় ১০ শতাংশ বেশি দাম থাকে। গত বছরের মার্চের পর বিশ্ববাজারে বাড়ার কারণে দেশে দাম বাড়লেও পরে আর কমেনি। গতবারের তুলনায় এবার পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে এবার গবাদিপশুর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ ২ হাজার ৩৯৪টি। যার বিপরীতে দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। যা গত বছরের তুলনায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪টি বেশি। সে হিসেবে চাহিদার চেয়ে ২২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৭৩টি অতিরিক্ত গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর মধ্যে গরু ৫২ লাখ ৬৮৪টি, মহিষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৩২০টি, ছাগল ৬৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৮টি, ভেড়া ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৭৪৩টি এবং অন্য প্রজাতির ১ হাজার ৮৫০টি পশু রয়েছে।
খামারিরাও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বাড়তি দাম না পেলে লোকসানে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বিসমিল্লাহ অ্যাগ্রো খামারের স্বত্বাধিকারী রাশেদুল ইসলাম বলেন, এবার পশুর খাবারের দাম বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। গরমের কারণে সবসময় ফ্যান চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে। গরু খাবার কম খাচ্ছে। ফলে ওজন কমে যাচ্ছে। তাই এত ব্যয়ের পর এবার বাড়তি দাম না পেলে আমাদের লস হয়ে যাবে।
অতিরিক্ত দামে খামারিরা কোন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে খামারি মো. ওসমান জানান, ১০ বছর আগে গমের ভুসি ছিল ৮-১০ টাকা কেজি। এখন তা প্রতি কেজি ৬০-৬২ টাকা। এক মণ খেসারি ডালের ভুসির দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা। এক মণ খড়ের দাম এখন ৫০০-৬০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৩০০ টাকা। এক বছরে গো-খাদ্য বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গমের ভুসির দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ টাকা। ডালের ভুসি ৫০০ থেকে বেড়ে এখন ৮০০ টাকা। এভাবে যদি দাম বাড়তে থাকে তাইলে আমাদের খামার ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।

নিয়মিত খাদ্যের দাম বাড়া ও সামগ্রীক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলী আজম রহমান শিবলী বলেন, খামারিদের বাঁচাতে হলে দুধের দাম বাড়ানো, প্রাণিখাদ্যে ভর্তুকি, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে খামার পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, নিম্নমানের গুঁড়াদুধ আমদানি বন্ধ করা, গোখাদ্যের সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ীদের বিচারের আওতায় আনা ও ভেজাল খাদ্য রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে খোলা মাঠে ছিল সবুজ ঘাস। প্রয়োজনের তাগিদে সেই মাঠ এখন আবাদি জমি হয়ে গেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কৃত্রিম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। তবে কৃত্রিম খাদ্যের মান নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। আমাদের ঘাসের ওপর নির্ভর করে শুধু দেশীয় গরু লালন-পালন সম্ভব। উন্নতজাতের গাভি যেগুলো দিনে ১০ থেকে ২০ লিটার দুধ দেয়, সেসবের জন্য অবশ্যই ঘাসের পাশাপাশি দানাদার খাবার লাগবে।