► এবার স্ত্রীসহ রাজউক পরিচালক ও ইউএনও’র কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
► কোটি টাকার সেই আলোচিত গরুসহ সাদিক এগ্রোর ৬ গরু জব্দ
► মডেল মসজিদ নির্মাণে প্রকৌশলী স্বামীর দুর্নীতি প্রকাশ্যে আনলেন স্ত্রী
টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনি ইশতেহার দিয়েছিল, তাতে গুরুত্ব পেয়েছিল ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’। কিন্তু তা বাস্তবায়নের আড়ালে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নানা কৌশলে ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেনজীর-মতিউরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ্যে আসায় আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই দুদুক আতঙ্কে গ্রেপ্তার এড়াতে সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার অনেকেই পালানোর চেষ্টা করছেন। সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর এমন অপকর্মে ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি। এরই মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ এনে এবার স্ত্রীসহ রাজউক পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। অপরদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এদিকে ছাগলকাণ্ডে কোটি টাকার সেই আলোচিত ব্রাহমা জাতের গরুসহ বিতর্কিত সাদিক এগ্রোর আরো ৬টি গরু জব্দ করা হয়েছে। অপরদিকে সারা দেশে মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগ এনে এবার প্রকৌশলী স্বামী মো. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন তার স্ত্রী রেজওয়ান আহমেদ খুশবু। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সংস্থার কোনো না কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘুষ-দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশ্যে আসছে। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতিতেও দেশজুড়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চলছে লাগামহীন দুর্নীতি। এতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের পর ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’র অগ্রযাত্রায় দুর্নীতিকেই এখন মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করছেন খোদ সরকারি দলের নেতারা। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে উঠে আসায়, সরকারের সব অর্জন মøান হয়ে যাচ্ছে। সরকারের যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধাকরকদের আরো দায়িত্বশীল হয়ে সবক’টি সংস্থায় দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের প্রমাণও পেয়েছে দুদক। এরই মধ্যে তাদের সম্পত্তি এবং ব্যাংক একাউন্ট জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বেনজীরের আলোচনা না থামতেই আবার শুরু হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের খবর। এর রেশ না কাটতেই এক ছাগলকাণ্ডে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার (শুল্ক ও আবগারি) এবং ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ড. মতিউর রহমানের বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এসব বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত লোপোটের খবর। এই সময়ের টক অব দ্য টপিকে পরিণত হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ, দুর্নীতি ও অবৈধ আয়ের বিষয়টি। সরকারি কর্মকর্তাদের এই দুর্নীতির বিষয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্টও। মতিউরের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আরও কয়েক কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ অর্জনের খবর বেরিয়ে আসছে দুদকের অনুসন্ধানে। এবার এ তালিকায় নাম লিখিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক মো. মোবারক হোসেনও। গতকাল বুধবার রাজউকের পরিচালক মো. মোবারক হোসেন ও তার স্ত্রী শাহানা পারভীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলাদা দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় মামলা দুটি দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আসিফ আল মাহমুদ।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২) মোবারক হোসেনের দাখিল করা সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী ৪১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৫ টাকার আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্য আরেক মামলায় শাহানা পারভীনকে প্রধান আসামি করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সহযোগিতার জন্য মোবারক হোসেনকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় বলা হয়, শাহানা পারভীন পেশায় গৃহিণী হলেও তার নামে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৫২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিলেছে। অপরদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মিহির কুমার ঘোষের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তার স্ত্রী শিল্পী রানী ঘোষকেও আসামি করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুলাই) দুদকের সহকারী পরিচালক ইমরান খান বাদী হয়ে সংস্থাটির জেলা কার্যালয় কুমিল্লা মামলাটি দায়ের করেন। এদিকে ‘ছাগলকাণ্ডে’ বহুল আলোচিত আমদানি নিষিদ্ধ সাদিক এগ্রোর সেই কোটি টাকার গরুসহ আমদানি করা ব্রাহমা জাতের ছয়টি গরু জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম। গতকাল বুধবার দুপুরে চন্দ্রিমা উদ্যান সংলগ্ন কাঠের পুলের ১৬ নম্বর রোডে অভিযান চালিয়ে গরুগুলো জব্দ করে দুদকের টিম। ভুয়া তথ্যে এসব গরু ২০২১ সালে আমদানি করে সাদিক এগ্রো। এর মালিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। তিনি গবাদিপশুর খামারমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি। ২০২১ সালে ফ্রিজিয়ান গরু বলে ব্রাহমা জাতের গরুগুলো আমদানি করা হয়। এদিকে মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে ঘুষ নেওয়ায় প্রমাণসহ নীলফামারী গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী স্বামী মো. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী রেজওয়ান আহমেদ খুশবু। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব কাজী ওয়াছী উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ জমা দেন তিনি।
রেজওয়ানা হাসনাত খুশবু বলেন, মসজিদ নির্মাণ কাজে স্বামীর ঘুষ নেওয়ার তথ্য পেয়ে বারবার অনুরোধ করেও তাকে দুর্নীতি থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছি। এমনকি দুর্নীতিতে বাধা দেওয়ায় আমার শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এ অবস্থায়, সমাজ, পরিবার ও দেশের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করার কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ের সময় অতি সাধারণ পরিবারের একজন সন্তান হলেও, বর্তমানে আমার স্বামীর রয়েছে বিলাসবহুল বাড়িসহ বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি। ঘুষ দুর্নীতি ছাড়া এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দুর্নীতির তদন্ত এবং আমার ওপর নির্যাতনের প্রতিকার চাই। এ বিষয়ে মডেল মসজিদ প্রকল্পের পরিচালক নজিবুর রহমান বলেন, ধর্মীয় এই প্রকল্পে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের অনেকেই সপরিবারে গ্রেপ্তার এড়াতে দেশত্যাগ করেছেন। আবার অনেকেই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। তবে দুদক বলছে, যাদের নামেই দুর্নীতির অভিযোগ আসছে, অনুসন্ধানে তথ্য-প্রমাণ মিলছে, তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দসহ আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
ঢাবি’র সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে উঠে আসায়, সরকারের সব অর্জন মøান হয়ে যাচ্ছে। সরকারের যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধাকরকদের আরো দায়িত্বশীল হয়ে সবকটি সংস্থায় দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। নতুবা দুর্নীতি রোধ করা সম্ভভ হবেনা।
আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, দুর্নীতি সরকারের সব অর্জন মøান করে দিচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের দফায় দফায় বেতন বাড়ানো হয়েছে। তারপরও কেন দুর্নীতি হবে? তিনি বলেন, এরকম হাজার হাজার মতিউর আছেন। তারপরও দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়নি। দুর্নীতির বিধিবিধানকে বরং আরও নমনীয় ও শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। নামমাত্র দণ্ড দিয়ে তাদের চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক আছে। দুদক সম্পূর্ণ স্বাধীন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান জিরো টলারেন্স। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দুর্নীতি করলে ছাড় পাবে না।





















