◉ উত্তরপ্রদেশে ভোলে বাবার সৎসঙ্গে পদদলিত হয়ে মৃত্যু ১২১
ভারতের উত্তরপ্রদেশের হাথরস জেলায় একটি ধর্মীয় আয়োজনে পদদলিত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২১ হয়েছে। বুধবার স্থানীয় কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। এ ঘটনায় আহত অনেককে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মর্মান্তিক এ ঘটনার এক দিন পর বহু পরিবার এখনও তাদের প্রিয়জনকে খুঁজছে। শোক ও ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে মানুষ। গত মঙ্গলবার বিকেলে হাথরস জেলার রতিভানপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আয়োজন করেছিলেন সুরজ পাল ওরফে নারায়ণ সাকার হরি নামে পরিচিত এক স্বঘোষিত ধর্মগুরু। ভক্তদের কাছে তিনি ভোলে বাবা নামেই পরিচিত। তার অনুসারীরাই ওই আয়োজনে গিয়েছিলেন। ঘটনার পর থেকে ভোলে বাবার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। এ ঘটনায় হাথরসের বাসিন্দাদের ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে ভোলে বাবার ওপর। তার পোস্টার লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে ইট-পাথর।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্য সচিব মনোজ কুমার সিং বলেন, পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনার পেছনে বড় একটি কারণ অধিক ভিড়। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে অনেকেই ভোলে বাবার গাড়ির পেছনে দৌড়াচ্ছিলেন। ভোলে বাবা যে পথে যান, পূজা করার জন্য সেই পথের ধুলোমাটি সংগ্রহ করেন অনেকে। এসব কারণে একের পর এক মানুষ পড়ে গিয়ে পদদলিত হন। এ ঘটনায় একটি এফআইআর করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ আছে, ধর্মীয় ওই আয়োজনে ৮০ হাজার মানুষ জড়ো হবে বলে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জমায়েত ছিল আড়াই লাখের বেশি মানুষের। উত্তর প্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে, ‘ভোলে বাবা’ নামে পরিচিত নারায়ণ সকার হরির আসল নাম সুরাজ পাল যাতব। রাজ্যের কাশগঞ্জ জেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা সুরাজ পাল পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন। চাকরি জীবনের শুরুর দিকে বেশ কয়েক বছর পুলিশের স্থানীয় গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেছেন তিনি। কর্মজীবনে প্রায় ১৮টি থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন এই তথাকথিত ধর্মগুরু।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস নাউয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ২৮ বছর আগে ইভটিজিংয়ের অভিযোগ দায়ের হয় সুরাজ পালের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগে প্রথমে সাসপেন্ড করা হয় তাকে, পরে বরখাস্ত হন তিনি। সুরাজ পালের জন্ম শহর ইটাওয়ার সিনিয়র পুলিশ সুপার সঞ্জয় কুমার জানিয়েছেন, ওই ইভটিজিংয়ের ঘটনায় বেশ লম্বা সময় জেলে ছিলেন সুরজ পাল। কারাগার থেকে বেরিয়েই তিনি ‘বাবার’ রূপ ধরেন। অবশ্য এই অভিযোগসহ সব মিলিয়ে পাঁচটি যৌন নির্যাতনের অভিযোগে আগ্রা, ইটাওয়া, কাশগঞ্জ, ফারুখাবাদ ও দুসায় মামলা হয় সুরাজ পালের বিরুদ্ধে।
বরখাস্ত হওয়ার পরে সুরাজ পাল আদালতে দ্বারস্থ হন নিজের চাকরি ফিরে পেতে। আদালত চাকরি ফিরিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০২ সালে আগ্রায় কর্মরত থাকাকালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর ফিরে যান নিজ গ্রামে। কিছুদিন পরে তিনি দাবি করতে থাকেন, ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি কথা হয় তার। এই সময় থেকেই নিজেকে ‘ভোলে বাবা’ হিসেবে তুলে ধরতে থাকেন সুরাজ পাল। কয়েক বছরের মধ্যেই ‘ভোলে বাবার’ ভক্ত সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ওঠে। এই ভক্তকুলই তার হয়ে বড় বড় ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করতে থাকে। সেসব জমায়েতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। এ বিষয়ে সিনিয়র পুলিশ সুপার সঞ্জয় কুমার বলেন, ‘৭৫ বছর বয়সী সুরজপাল ওরফে ভোলে বাবারা তিন ভাই। তিনিই সবার বড়।’
নিজের ধর্মীয় সমাবেশ বা ‘সৎসঙ্গ’-এ ভোলে বাবা একাধিকবার দাবি করেছেন, সরকারি চাকরি থেকে কে তাকে এদিকে টেনে আনল তা তিনি নিজেও জানেন না। এ ধরনের স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের বেশির ভাগকেই দেখা যায় ভক্তদের কাছ থেকে বিপুল ধনসম্পত্তি ‘দান’ হিসেবে গ্রহণ করতে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে ভোলে বাবা ওরফে নারায়ণ সকার ভক্তদের কাছ থেকে কোনো দান-দক্ষিণা গ্রহণ করেন না। যদিও বেশ কয়েকটি আশ্রম তৈরি করেছে তাঁর চ্যারিটেবল ট্রাস্ট। অন্য হিন্দুধর্ম গুরুদের মতো ভোলে বাবা গেরুয়া পরেন না। সব সময়ই তাঁর পরিধানে থাকে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি বা জামা-প্যান্ট অথবা স্যুট। ভোলে বাবার সৎসঙ্গে যারা আসে, তাদের বেশির ভাগই অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র শ্রেণির ও অনগ্রসর গোষ্ঠীর মানুষ।
বিপুলসংখ্যক ভক্ত থাকলেও সামাজিকমাধ্যমে ভোলে বাবার উপস্থিতি খুব একটা বেশি দেখা যায় না। তাঁর ভক্তদেরও সে রকম উপস্থিতি নেই সামাজিকমাধ্যমে। বাস্তবে লাখ লাখ ভক্ত থাকলেও ফেসবুকে তার সৎসঙ্গগুলোর ‘লাইভ’ প্রায় নেই বললেই চলে। যেসব সৎসঙ্গ আয়োজন করেন তার ভক্তরা, সেগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে স্বেচ্ছাসেবকেরাই।

























