◉ সরকার নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না কৃষকরা
◉ কৃষি উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধিতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা
◉ খোলাবাজারে সার পাওয়া গেলেও তা দামে চড়া
◉ কোথাও কোথাও দ্বিগুণ দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা
⮞সার পরিবহন ঠিকাদাররা ঠিকমতো সার পরিবহন করছে না ➺আনোয়ার ফারুক, সাবেক সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়
কৃষি জমিতে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকরা যাতে সঠিকভাবে ফসল ফলাতে পারে সেই লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। সুলভ মূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। তবুও সুফল মিলছে না। আমদানিকারক, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারদের অসাধু সিন্ডিকেট, গুদামের সার মজুত ইত্যাদি কারণে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি খরচে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি পর্যায়ে বেড়েছে সারের দাম। অবিলম্বে এ সমস্যার সমাধান না করা গেলে আগামীতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে সার আমদানি হয় সরকারি ও বেসরকারি দুই ভাবেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ইউরিয়া সারের পুরোটাই আমদানি করে বিসিআইসি। সরকারি এ প্রতিষ্ঠান দুটি বছরের যেকোনো সময় চাইলে সার আমদানি করতে পারে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের কেবল মে মাসে দরপত্রে অংশ নেয়ার মাধ্যমে সার আমদানি করতে পারে।
ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি সমন্বয়হীনতা ও জেলা পর্যায়ে নজরদারির অভাবে মাঠ পর্যায়ে সার বিতরণ ব্যবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে লাভবান হচ্ছে। ফলে সারের বাজার অস্থির হচ্ছে নিয়মিত। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারি গুদাম ও কারখানা থেকে সার গায়েবের ঘটনা ঘটছে। গত ১৪ জুন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি বাজার এলাকায় পিকআপভ্যানে করে পাচারের সময় ৬০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ডিলারের নামে মামলা করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় এ রকম ঘটনা প্রতিনিয়ত চলমান। কিন্তু কৃষকদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
সরকার প্রতি কেজি ইউরিয়া এবং টিএসপি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা এবং ডিএপি ২১ টাকা দর নির্ধারণ করে দিলেও তা মানা হচ্ছে না। জমিতে সেচ দিতে চড়া দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে চাষিদের, তার ওপর সারের বাড়তি দাম নিয়ে তাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়েছে। কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি চর পাড়ার কৃষক মো. আনোয়ার এ বছর আট বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষ করেছেন। সারের জন্য ডিলারের দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র এক বস্তা সার পেয়েছেন। যদিও তার প্রয়োজন চার বস্তা। এর আগে তিন দিন এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো সার পাননি বলে জানান তিনি। তার মতো অনেক কৃষকই প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে খোলাবাজারে সার পাওয়া গেলেও তা দামে চড়া। কোথাও কোথাও দ্বিগুণ দাম দিয়েও সার পাচ্ছেন না কৃষকরা।
নড়াইল সদরের আউড়িয়া ইউনিয়নের কৃষক শফিক বলেন, সারের দাম বেশি হলেও কিছুই করার নেই। কৃষক হয়ে জন্মেছি, চাষাবাদ করেই খেতে হবে। ব্যাপকভাবে না হোক নিজের পরিবারের জন্য হলেও কিছু জমি আবাদ করতে হবে। সার ডিলার মোহাম্মাদ হাফিজুর রহমান মল্লিক সারের বাড়তি দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, কোনো ডিলার বাড়তি দাম নিচ্ছেন না। তবে কোনো কোনো সাবডিলার বাকিতে সার বিক্রি করে বেশি দাম নিয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দীপক কুমার রায় বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে থেকে কাজ করছেন। কোনোভাবেই যাতে সারের ন্যায্যমূল্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে সে বিষয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। সারের অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘সারের সংকট নেই সরকারের এ দাবি যেমন সঠিক, তেমনি কৃষকরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছে না এ অভিযোগও সঠিক। মূল সমস্যাটা হচ্ছে, ডিজেলের দাম বাড়ায় সার পরিবহন ঠিকাদাররা ঠিকমতো সার পরিবহন করছে না। তাদের দাবি, ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে তাদের পরিবহন ভাড়া সমন্বয় করতে হবে। এ কারণে সার ঠিকমতো গোডাউনে যাচ্ছে না।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সারে বড় অংকের ভর্তুকি দেয় সরকার। ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া মিলিয়ে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ এ ছয় অর্থবছরে সার খাতে মোট ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫২৩ টন। এছাড়া টিএসপি ৪০ হাজার ১২০ টন, ডিএপি ৮৪ হাজার ১০২ ও এমওপির মজুত রয়েছে ৪৩ হাজার ৮৮১ টন। গত বছরের একই সময়ে ইউরিয়া ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮৫ টন, টিএসপি ৪২ হাজার ৫১২, ডিএপি ৮১ হাজার ৫০৫ ও এমওপি ৩২ হাজার ৪৪৪ টন মজুত ছিল।
























