হালদা ও মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ডুবেছে চট্টগ্রামের অন্তত ৯টি উপজেলা। ক্রমশই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে এসব উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম। স্থানীয়দের অনেকে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে আকুতি জানাচ্ছেন উদ্ধারের। নদীর পানি প্রবেশ করে এরই মধ্যে মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী,পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, কর্ণফুলী ও হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব উপজেলার আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই এবং ফটিকছড়ি উপজেলার ২০ হাজার ১৭৫ পরিবার দুর্যোগ কবলিত। এসব পরিবারের প্রায় ৯৫ হাজার ৯শ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলায় সর্বমোট ১৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ায় ৩১৭৫ পরিবার পানিবন্দি এবং প্রায় ১৫ হাজার ৯শ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মিরসরাই উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নে ১২ হাজার পানিবন্দি পরিবারের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং সীতাকুণ্ড উপজেলায় ৬টি উপদ্রুত ইউনিয়নে ৫ হাজার পরিবারের প্রায় ২০ হাজার জন পানিবন্দি আছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোট ৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন, মিরসরাই উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন, এবং সীতাকুণ্ড উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় ইতোমধ্যে ২৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং গঠিত ১৩৭টি মেডিকেল টিমের সবকয়টি চালু আছে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৬১৭ জন পুরুষ, ৬২০ জন মহিলা এবং ২৫ জন প্রতিবন্ধীসহ মোট ১৭২৫ জন নিরাপদে রয়েছে। এছাড়া ৩৭টি গরু এবং ২৫টি ছাগলসহ ৬২টি গবাদিপশু আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্লাবিত হয়েছে ১২টি ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম। এই উপজেলায় পানিবন্দি হয়েছেন ১২ হাজার পরিবার। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্ধলাখ মানুষ। মুহুরী প্রজেক্ট এলাকার মৎস্য ঘেরের বাঁধ ভেঙে কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্য চাষিরা। এই উপজেলায় ৩০টি নৌযান উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা আমলীঘাট, করেরহাট, হিঙ্গুলী, বারইয়ারহাট পৌরসভা, মিরসরাই পৌরসভার নিম্নাঞ্চল, জোরারগঞ্জ, ধুম, ইছাখালী, কাটাছরা, দুর্গাপুর, মিঠানালা, খৈয়াছড়া, ওসমানপুর, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন স্বেচ্ছসেবী সংগঠন। দুর্ঘটনার আশংকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কিছু এলাকায়। বেশিরভাগ সমস্যা দেখা দিয়েছে বয়োবৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মাহফুজা জেরিন জানান, মিরসরাইয়ে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। গ্রামীণ পর্যায়ে এখনো কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা তিনি জানাতে পারেননি।
তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত ১৭শ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ৩০ টার অধিক স্পিড বোট আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছে।
ফটিকছড়িতে বাড়ি-ঘর ডুবে পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে ২০ হাজার পরিবারের অন্তত লক্ষাধিক মানুষ। উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে রয়েছে উপজেলার মাইজভান্ডার-রাউজান সড়কও।
স্থানীয় সূত্র বলছে, হালদা নদী, সর্তা খাল, ধুরুং খাল, ফটিকছড়ি খাল, মন্দাকিনী খাল, গজারিয়া খাল, তেলপারি খাল, কুতুবছড়ি খাল, লেলাং খালসহ বিভিন্ন খালের বাঁধ ভেঙে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। এতে উপজেলার ফটিকছড়ি পৌরসভা, নাজিরহাট পৌরসভা, সুন্দরপুর, পাইন্দং, হারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, দাঁতমারা, বাগানবাজার, নারায়ণহাট, ভুজপুর, লেলাং, সমিতিরহাট, রোসাংগিরী, জাফতনগর, বক্তপুর, নানুপুরসহ বিভিন্ন স্থানের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোজ্জামেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ফটিকছড়ি দিয়ে প্রবাহিত হালদা নদী ও বেশকিছু খালের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি। আমরা ১৮টি ইউনিয়নের জন্য ১৮ জন কর্মকর্তা নিয়োগ করেছি। লোকজনকে আশ্রয় দিতে আমরা ৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছি।’
সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া এলাকায় শিকদার খালের মুখে বাঁধের প্রায় ১২ মিটার অংশ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৬ ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম। জেলা প্রশাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ৬টি ইউনিয়নে ৫ হাজার পরিবারের প্রায় ২০ হাজার জন পানিবন্দি আছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, বাঁশখালী উপজেলার ৮ ইউনিয়নের অনেক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় পানিবন্দি আছে ১ হাজার ৭৫০ পরিবারের ৮ হাজার ৭৫০ জন মানুষ। এছাড়া উপজেলায় গঠন করা হয়েছে ১৫টি মেডিকেল টিম। যার সবকটিই চালু আছে।
রাউজান উপজেলাও পানিতে প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের বাসিন্দারা পানিবন্দি আছেন।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, পশ্চিম নোয়াপাড়া, মোকামীপাড়া, সাম মাহালদারপাড়া, ছামিদর কোয়াং, কচুখাইন, দক্ষিণ নোয়াপাড়া; উরকিরচর ইউনিয়নের মইশকরম, সওদাগরপাড়া, সুজারপাড়া, পূর্ব উরকিরচর, খলিফার ঘোনা ও বৈইজ্জাখালি, বাগোয়ান, পশ্চিম গুজরা, গহিরা, নোয়াজিশপুর, চিকদাইর, ডাবুয়াসহ কয়েকটি গ্রামে ৩২০ পরিবারের ১৬শ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হালদা নদীর হাটহাজারীর অংশে বেড়িবাঁধ দেওয়া হলেও রাউজান অংশে তা নেই। তাই অমাবস্যা-পূর্ণিমা তিথিতে জোয়ারের উচ্চতা বাড়ার কারণে গ্রামগুলোতে পানি ঢুকে পড়ে। এবার বৃষ্টির কারণে পানি আরও বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।
হাটহাজারী উপজেলায় বন্যায় প্লাবিত এলাকার মধ্যে রয়েছে বুড়িশ্চর, শিকারপুর, গড়দোয়ারা, দক্ষিণ মাদার্শা, উত্তর মাদার্শা, মেখল, পৌরসভার একাধিক ওয়ার্ড, নাঙ্গলমোড়া, ছিপাতলী। হালদা নদীতে পাহাড়ি ঢল বাড়ায় নদীর উপচে পড়ে তীরবর্তী এলাকার বাড়িঘর পানিতে ডুবে রয়েছে।
হাটহাজারীর ইউএনও এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, উপজেলার ৭ থেকে ৮টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী রয়েছেন প্রায় অর্ধলাখ মানুষ।
এছাড়া পটিয়া, বোয়ালখালী এবং কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন জায়গা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়। তথ্য অনুযায়ী, পটিয়া উপজেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড মিলিয়ে ১৮ স্থানে ৬৯৪৬ পরিবারের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। বোয়ালখালী উপজেলায় ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড মিলিয়ে ৩ জায়গায় ১শ পরিবারের প্রায় ৭শ মানুষ পানিবন্দি আছে। কর্ণফুলী উপজেলায় ১শ পরিবারের প্রায় ৫শ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল বারেক সকালে জানিয়েছেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বৃষ্টি কমে আসবে। টানা বৃষ্টি পড়বে না। তবে থেমে থেমে বৃষ্টি পড়বে আরও তিন দিন। এরপর সূর্যের দেখা মিলবে বলে আশা করা যায়।’
কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ দুপুর পর্যন্ত লেকের পানির বর্তমান উচ্চতা ১০৩ ফুট (এমএসএল)। যা গতকাল ছিলো ১০১ ফুট। ২৪ ঘন্টায় পানির উচ্চতা দুই ফুট বেড়েছে। তবে পানির বিপদসীমা ১০৮ ফুট। বিপদসীমার চেয়ে পানি ৫ ফুট কম রয়েছে। ফলে এই মুহুর্তে কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়ার কোন আশঙ্কা নেই। অন্তত আগামী ২ দিনের মধ্যে কাপ্তাই বাঁধ থেকে কোন পানি ছাড়া হবে না। আর যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, পানির উচ্চতা ১০৮ ফুটের কাছাকাছি চলে আসে তবে পূর্বঘোষনা এবং সতর্কতা জারি করে সীমিত পরিসরে পানি ছাড়া হতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্টাফ অফিসার মো. ফাহমুন নবী কে সকালে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম জেলার ৩টি উপজেলা (সীতাকুণ্ড, মিরসরাই এবং ফটিকছড়ি) দুর্যোগ কবলিত। এতে মোট ২০ হাজার ১৭৫ পরিবারের প্রায় ৯৫ হাজার ৯শ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলায় সর্বমোট ১৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ায় ৩১৭৫ পরিবার পানিবন্দী এবং প্রায় ১৫ হাজার ৯শ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মিরসরাই উপজেলায় ১২টি ইউনিয়নে ১২ হাজার পানিবন্দি পরিবারের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং সীতাকুণ্ড উপজেলায় ৬টি ইউনিয়নে ৫ হাজার পরিবারের প্রায় ২০ হাজার জন পানিবন্দি আছে।
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোট ৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন, মিরসরাই উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন, এবং সীতাকুণ্ড উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় ইতোমধ্যে ২৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং গঠিত ১৩৭টি মেডিকেল টিমের সবকয়টি চালু আছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৬১৭ জন পুরুষ, ৬২০ জন মহিলা এবং ২৫ জন প্রতিবন্ধীসহ মোট ১৭২৫ জন নিরাপদে রয়েছে। এছাড়া ৩৭টি গরু এবং ২৫টি ছাগলসহ ৬২টি গবাদিপশু আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাইফুল্লাহ মজুমদার সিভয়েস২৪’কে জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, কর্ণফুলী, হাটহাজারী উপজেলার মোট ৯৩টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৯১৬ পরিবারের ২ লাখ ৪ হাজার ৮৫০ জন বাসিন্দা। তাদের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে ৮৪টি আশ্রয়কেন্দ্র। যেখানে নারী, পুরুষ, শিশু, প্রতিবন্ধিসহ ৩ হাজার ৪১৫ জন। এছাড়া গঠিত ১১৬টি মেডিকেল টিমের ১১১টি চালু আছে। মিরসরাই উপজেলায় ৩০টি এবং ফটিকছড়িতে ৫টি উদ্ধারকারী নৌযান উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।






















