০৮:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশজুড়ে এলপি গ্যাসের হাহাকার

* সরবরাহ সংকটে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম
* খুচরা দোকানে দোকানে ঝুলছে তালা, সাঁটার বন্ধ
* কদর বাড়ছে ইলেকট্রিক চুলা-কেরোসিনের, চায়ের কাপে ঝড়
* রেস্তোরাঁয় খাদ্যপণ্যে দামের প্রভাব, বিপাকে গ্রাহকরা

‘‘এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজির সংকট চলছে। সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত’’
– মাহফুজুল হক, সাবেক পরিচালক, চট্টগ্রাম চেম্বার
‘‘এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ’’
– মোহাম্মদ আমিরুল হক, সভাপতি, লোয়াব ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেল্টা এলপি গ্যাস

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র হাহাকার চলছে। সরকার ঘোষিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না। এমনকি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার হাজার টাকার বেশি গুণেও পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে মিলছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন আর সরবরাহ সংকটের অজুহাতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ানো হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। নগরীর পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খুচরা দোকানে দোকানে ঝুলছে তালা, সাঁটার বন্ধ। চাহিদানুযায়ী এলপি গ্যাস না থাকার সুযোগে কদর বেড়েছে ইলেকট্রিক চুলা আর জ¦ালানি তেল কেরোসিনের। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এলপি গ্যাস সংগ্রহে দিনের পর দিন গ্রাহকদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। মালিক সমিতির সিন্ডিকেটের কাছে সরকারের ভোক্তা অধিদপ্তর ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয় বাজার তদারকিতে কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে। তিতাস কোম্পানির পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় এলপিজি’র ওপর ভরসা করেও কেউই স্বস্তি পাচ্ছেন না। বরং চা দোকানগুলোতেও এর প্রভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই ঝড় উঠছে। দ্বিগুণ দামে প্রতিকাপ চা বিক্রি করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিনের বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর রান্না নিয়ে মারাত্মক সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। জরুরি খাদ্যপণ্য সংগ্রহের জন্য ভিড় পড়ছে পাড়া-মহল্লার হোটেলগুলোতে। ফলে দামের প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন খাদ্যপণ্যে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়তই চরম বিপাকে পড়ছেন গ্রাহকরা। গ্যাস বিক্রয়কারী ডিলার বা খুচরা দোকানিরা বলছেন, এলপিজি সেক্টরে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এখন দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে কোনো কোনো ডিস্ট্রিবিউটর দুই গাড়ি গ্যাস পেলে এখন এক গাড়ি পেতে তিন-চারদিন লাগছে। এতে সময় ও ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে। এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হকের মতে, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজি’র সংকট চলছে। সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত। তবে এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাস লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলছেন, এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি বড় কারণ।

 

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র হাহাকার চলছে। এছাড়া তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সরবরাহকৃত পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। যুগ যুগ ধরে গ্যাস না পেয়েও মাসের পর মাস ব্যাংকে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিতাসের গ্রাহকরা। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দেশে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে চলছে এলপিজি ব্যবসায়ীরা। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে সে দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়েও অনেক এলাকায় মিলছে না। অধিকাংশ দোকানগুলোতে বাইরে দিয়ে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সাঁটার বন্ধ রেখে উধাও রয়েছেন খুচরা দোকানিরা। এতে গ্রাহকদের ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে অসন্তোষও। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাড়া-মহল্লা, মার্কেট ও এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির দোকান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সরবরাহ কমায় তারা চাহিদা অনুযায়ী এলপি গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অনেক ডিলারের দোকান ফাঁকা। কোনো কোনো দোকানে সীমিত সংখ্যক সিলিন্ডার থাকলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকা, অন্যদিকে বাড়তি দামেও ডিলার পয়েন্ট থেকে এলপিজি সিলিন্ডার আনতে পারছেন না তারা। সরবরাহ সংকটের কারণে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট চলছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ও নিম্নআয়ের মানুষেরা মাটির চুলা ও কেরোসিনের তেল ব্যবহার করছেন।

ভোক্তারা বলছেন, তিতাস গ্যাস কোম্পানির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় দেশজুড়ে অবৈধ গ্যাস ব্যবহার ও গ্যাস চুরির মহোৎসব চলছে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাপ কম থাকায় বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকরা নিয়মিত গ্যাস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও খাবারযোগ্য কোনো রান্নাবান্না করতে পারছেন না। অথচ গ্যাস না দিয়েও সরকার মাস শেষে গ্রাহকদের কাছ নিয়মিত বিল আদায় করে নিচ্ছে। তিতাস গ্যাস সরবরাহ না থাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে রান্নার একমাত্র ভরসাই এখন এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ অতিরিক্ত দামে কিনছেন, আবার অনেক পরিবার চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের চা দোকানি আব্দুল হাই ও হক মিয়া দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এক মাস ধরে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার নেই। চায়ের পানি গরম করতে হলে ২৪ ঘন্টাই আমাদের সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। পূর্ব রসুলপুরের ৬ নম্বর গলিতে আমার পাশের দোকানেই (বাবু এন্টারপ্রাইজ) এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়। অথচ সরবরাহ না থাকায় দোকান মালিক একমাস ধরে সেই দোকানটি বন্ধ রেখেছেন। তারা বলেন, লালবাগ, হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকায় মাইলের পর মাইল ঘুরে যদিও দু’একটি গ্যাসের দোকান খোলা পাই, সেখানে ভিড়ও বেশি। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সরকার নির্ধারিত প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা হলেও দোকানিরা তা মানতে নারাজ। তারা এলাকা ও চাহিদাভেদে প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম রাখছেন ন্যূনতম ২১০০ টাকা থেকে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত। নিরুপায় হয়ে গত এক মাসে দুইটি সিলিন্ডার ২৫০০ ও ২৮০০ টাকায় কিনে চা বিক্রি করেছি। তবে আগে প্রতিকাপ চা বিক্রি করতাম ৫ টাকা।

আব্দুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের কথা ও সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বেবচনার প্রেক্ষিতে ৫ টাকার পরিবর্তে ২ টাকা বাড়িয়ে প্রতিকাপ চা বিক্রি করছি ৭ টাকায়। দুই টাকা বাড়ানো নিয়েও প্রতিদিনই বোক্তার সঙ্গে তর্কে জড়াতে হয়। তাই ঝামেলা এড়াতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আগেই চায়ের দাম বলে দিচ্ছি ক্রেতাদের। এখন গ্যাস সিলিন্ডার না পাওয়ায় কেরোসিনের চুলা জ¦ালিয়ে চা বিক্রি করতে হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহের সংকটে জ¦ালানি তেল কেরোসিনের লিটারপ্রতি দামও বেড়েছে ১৫ টাকা। আগে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কিনলেও এখন পাইকারি দরে প্রতিলিটার কেরোসিন তেল কিনতে হচ্ছে ১১০ টাকা থেকে ১২৫ টাকায়। এখানেও একটা বাণিজ্য করে ফায়দা লুটছে কেরোসিন তেল বিক্রেতারা। দেখার কেউ নেই…। লালবাগের নবাবগঞ্জ মদনার খেত গলির চা দোকানি মো. সিদ্দিকুর রহমানও জানালেন একই কথা।

রাজধানীর আজিমপুর এলাকার চা বিক্রেতা সিজান বলেন, চায়ের দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস আমাদের লাগেই। এই এলাকার কোনো দোকান থেকে সিলিন্ডার কিনতে পারছি না। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার কামরাঙ্গীরচর থেকে কিনে এনেছি ২৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৫০০ টাকায়। আরেক দোকানি রুমান বলেন, অনেক বহু জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাতে ২ হাজার ৮০০ টাকায় দুটি সিলিন্ডার পাইছি। দাম তো অনেক বেশি। কিন্তু কিছু করার নেই, দোকান চালাতে হলে গ্যাস তো লাগবেই। এজন্য বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।

রাজধানীর বাটা সিগন্যাল এলাকার এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা ব্যবসায়ী রিপন বলেন, আমরা আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৩০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন অনেকেই সিলিন্ডার চাচ্ছেন, আমরা দিতে পারছি না। পাইকারি বিক্রেতারা দাম বেশি নিচ্ছেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে বেশি দামেও পাচ্ছি না। আমরা প্রতি সিলিন্ডারে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ করি। ঘরভাড়া, ভ্যানভাড়া ও লেবার খরচ বাদ দিয়ে তেমন লাভ থাকে না।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এলপিজি সংকটের সুযোগ নিয়ে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী বাড়তি দাম রাখছেন। কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক দাম রাখা হচ্ছে।

ধানমন্ডির কাঁঠালবাগান এলাকার পাইকারি এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহিদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা সিলিন্ডার ঠিকমতো পাচ্ছি না। চাহিদা মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সিলিন্ডার আনতে নরসিংদী গাড়ি পাঠাতে হয়। গাড়ি গিয়ে সিরিয়াল দিয়ে ৭-৮ দিন বসে থাকে। গাড়ি ভাড়ার ডেমারেজ দিতে হয়। আমাদের খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। কোম্পানি থেকে সরকারি দামে এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোম্পানি আমাদের থেকে সরকার নির্ধারিত দাম রাখছে। কিন্তু মার্কেটে সাপ্লাই কম, গাড়ি বসে থাকে। এজন্য খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমরাও কিছুটা বাড়তি দাম রাখছি।

রাজধানী ঢাকা ছাপিয়ে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের হাট-বাজার ও খুচরা দোকানের চিত্রও একই। সেখানেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলপি গ্যাসের তীব্র হাহাকার চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে কদর বেড়েছে ইলেকট্রিক চুলা আর জ¦ালানি তেল কেরোসিনের। প্রতিটি সিঙ্গেল চুলা মানভেদে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, ডাবল চুলা মানভেদে ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকায়ও বিক্রি করা হচ্ছে। কেরোসিনের প্রতিলিটারে দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২৫ টাকা। অনেকেই আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিপাকে পড়েছেন আবাসিক ও বাণিজ্যিকের এলপি গ্যাস ব্যবহারকারীরা। প্রতিমাসেই এখন দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি খরচ হচ্ছে শুধু রান্নার কাজে।

 

সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অনেক কোম্পানির ব্যাংকিং জটিলতা চলছে। এতে কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। সবমিলিয়ে সবগুলোর কোম্পানির সরবরাহ কমেছে। আগের বছরের চেয়ে গত ডিসেম্বর মাসে প্রায় প্রত্যেক কোম্পানির ২০ শতাংশের মতো সরবরাহ কমেছে। তিনি বলেন, এলপিজি সেক্টরে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এখন দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে কোনো কোনো ডিস্ট্রিবিউটর দুই গাড়ি গ্যাস পেলে এখন এক গাড়ি পেতে তিন-চারদিন লাগছে। আগে গ্যাস সরবরাহ বেশি ছিল, কিন্তু ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা কম নিতো। বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় ডিলাররা তাদের খালি সব সিলিন্ডার ভরে নিতে চাইছেন। এতে চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে।

বিপিসি ও এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্যমতে, দেশে ৩৪টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসায় জড়িত। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে। এলপিজি খালাসের জন্য তাদের নিজস্ব টার্মিনাল রয়েছে। অন্যরা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে শুধু বটলিং করে বিপণন করে। দেশের এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত দেশের বড় ১০টি কোম্পানি।
সংগঠনের তথ্য বলছে, ২৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে আমদানির অনুমতি থাকলেও গত ডিসেম্বরে মাত্র ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। বিএম এনার্জি, ওমেরা, ফ্রেশ, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও সান। ব্যাংকিং জটিলতার কারণে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাস, ওরিয়ন, জি-গ্যাস ও নাভানা ঋণপত্র খুলতে পারেনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা থাকলেও ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে কম এলপিজি আমদানি হয়েছে। ২০২৪ সালের পুরো বছরে যেখানে ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে এক বছরে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৫ টন। একইভাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের চেয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৮ হাজার ৮৬৬ টন কম আমদানি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৫ টন। আগের বছরের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২ টন।

এদিকে চলতি (জানুয়ারি) মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গত মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫) দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। এর আগের মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা। বিইআরসির নতুন দর অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা। ডিসেম্বর মাসে তা ছিল ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। অর্থাৎ, এ মাসে দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা ৪২ পয়সা।

 

তবে, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম পূণঃনির্ধারণ ও হয়রানি বন্ধসহ ৫টি দাবিতে গত ৭ জানুয়ারি সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান। পরদিন ৮ জানুয়ারি বিইআরসি ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সংগঠনের ব্যবসায়ী নেতারা। বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনায় সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ ও বিক্রি স্বাভাবিক রাখার ঘোষণা দেন সমিতির সভাপতি সেলিম খান। কিন্তু বাস্তবে সেই ঘোষণা কার্যকর করেনি ব্যবসায়ীরা। এতে সরকার ও গ্রাহদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
এসব বিষয়ে জানতে ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. সেলিম খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তার বক্তব্য মেলেনি।

তবে, এলপিজি ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজির সংকট চলছে। আমাদের এলপিজির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বেশি এলপিজি আমদানি হয়। এর মধ্যে যে কয়টি জাহাজ বাংলাদেশে আমদানি করা এলপিজি বহন করতো, সম্প্রতি আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে এলপিজি বহনকারী কয়েকটি জাহাজও পড়েছে। তিনি বলেন, বটলিং প্ল্যান্ট যাদের আছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। বটলিং পর্যায়ে কেউ দাম বেশি নিচ্ছে না। কিন্তু সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে এমন যুক্তি মানতে নারাজ ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গত বছর এলপিজির আমদানি বাড়ানো এবং প¬্যান্ট সম্প্রসারণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের অনুমতি দেয়নি। অথচ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এলসি করেনি। শীতকালে এলপিজি’র চাহিদা বাড়ে। আমাদের অতিরিক্ত আমদানির অনুমতি দিলে হয়তো এখন ক্রাইসিস (সংকট) তৈরি হতো না। এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ।

এমআর/সবা

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মুগ্ধ হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল, আসামি ২৬

দেশজুড়ে এলপি গ্যাসের হাহাকার

আপডেট সময় : ০৮:৫৬:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

* সরবরাহ সংকটে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম
* খুচরা দোকানে দোকানে ঝুলছে তালা, সাঁটার বন্ধ
* কদর বাড়ছে ইলেকট্রিক চুলা-কেরোসিনের, চায়ের কাপে ঝড়
* রেস্তোরাঁয় খাদ্যপণ্যে দামের প্রভাব, বিপাকে গ্রাহকরা

‘‘এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজির সংকট চলছে। সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত’’
– মাহফুজুল হক, সাবেক পরিচালক, চট্টগ্রাম চেম্বার
‘‘এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ’’
– মোহাম্মদ আমিরুল হক, সভাপতি, লোয়াব ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেল্টা এলপি গ্যাস

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র হাহাকার চলছে। সরকার ঘোষিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না। এমনকি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার হাজার টাকার বেশি গুণেও পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে মিলছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন আর সরবরাহ সংকটের অজুহাতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ানো হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। নগরীর পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খুচরা দোকানে দোকানে ঝুলছে তালা, সাঁটার বন্ধ। চাহিদানুযায়ী এলপি গ্যাস না থাকার সুযোগে কদর বেড়েছে ইলেকট্রিক চুলা আর জ¦ালানি তেল কেরোসিনের। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এলপি গ্যাস সংগ্রহে দিনের পর দিন গ্রাহকদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। মালিক সমিতির সিন্ডিকেটের কাছে সরকারের ভোক্তা অধিদপ্তর ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয় বাজার তদারকিতে কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে। তিতাস কোম্পানির পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় এলপিজি’র ওপর ভরসা করেও কেউই স্বস্তি পাচ্ছেন না। বরং চা দোকানগুলোতেও এর প্রভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই ঝড় উঠছে। দ্বিগুণ দামে প্রতিকাপ চা বিক্রি করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিনের বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর রান্না নিয়ে মারাত্মক সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। জরুরি খাদ্যপণ্য সংগ্রহের জন্য ভিড় পড়ছে পাড়া-মহল্লার হোটেলগুলোতে। ফলে দামের প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন খাদ্যপণ্যে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়তই চরম বিপাকে পড়ছেন গ্রাহকরা। গ্যাস বিক্রয়কারী ডিলার বা খুচরা দোকানিরা বলছেন, এলপিজি সেক্টরে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এখন দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে কোনো কোনো ডিস্ট্রিবিউটর দুই গাড়ি গ্যাস পেলে এখন এক গাড়ি পেতে তিন-চারদিন লাগছে। এতে সময় ও ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে। এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হকের মতে, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজি’র সংকট চলছে। সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত। তবে এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাস লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলছেন, এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি বড় কারণ।

 

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র হাহাকার চলছে। এছাড়া তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সরবরাহকৃত পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ না থাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। যুগ যুগ ধরে গ্যাস না পেয়েও মাসের পর মাস ব্যাংকে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিতাসের গ্রাহকরা। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দেশে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে চলছে এলপিজি ব্যবসায়ীরা। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে সে দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়েও অনেক এলাকায় মিলছে না। অধিকাংশ দোকানগুলোতে বাইরে দিয়ে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সাঁটার বন্ধ রেখে উধাও রয়েছেন খুচরা দোকানিরা। এতে গ্রাহকদের ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে অসন্তোষও। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাড়া-মহল্লা, মার্কেট ও এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির দোকান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সরবরাহ কমায় তারা চাহিদা অনুযায়ী এলপি গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অনেক ডিলারের দোকান ফাঁকা। কোনো কোনো দোকানে সীমিত সংখ্যক সিলিন্ডার থাকলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকা, অন্যদিকে বাড়তি দামেও ডিলার পয়েন্ট থেকে এলপিজি সিলিন্ডার আনতে পারছেন না তারা। সরবরাহ সংকটের কারণে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট চলছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ও নিম্নআয়ের মানুষেরা মাটির চুলা ও কেরোসিনের তেল ব্যবহার করছেন।

ভোক্তারা বলছেন, তিতাস গ্যাস কোম্পানির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় দেশজুড়ে অবৈধ গ্যাস ব্যবহার ও গ্যাস চুরির মহোৎসব চলছে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাপ কম থাকায় বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকরা নিয়মিত গ্যাস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও খাবারযোগ্য কোনো রান্নাবান্না করতে পারছেন না। অথচ গ্যাস না দিয়েও সরকার মাস শেষে গ্রাহকদের কাছ নিয়মিত বিল আদায় করে নিচ্ছে। তিতাস গ্যাস সরবরাহ না থাকায় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়িতে রান্নার একমাত্র ভরসাই এখন এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ অতিরিক্ত দামে কিনছেন, আবার অনেক পরিবার চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের চা দোকানি আব্দুল হাই ও হক মিয়া দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এক মাস ধরে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার নেই। চায়ের পানি গরম করতে হলে ২৪ ঘন্টাই আমাদের সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। পূর্ব রসুলপুরের ৬ নম্বর গলিতে আমার পাশের দোকানেই (বাবু এন্টারপ্রাইজ) এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়। অথচ সরবরাহ না থাকায় দোকান মালিক একমাস ধরে সেই দোকানটি বন্ধ রেখেছেন। তারা বলেন, লালবাগ, হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকায় মাইলের পর মাইল ঘুরে যদিও দু’একটি গ্যাসের দোকান খোলা পাই, সেখানে ভিড়ও বেশি। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সরকার নির্ধারিত প্রতি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা হলেও দোকানিরা তা মানতে নারাজ। তারা এলাকা ও চাহিদাভেদে প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম রাখছেন ন্যূনতম ২১০০ টাকা থেকে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত। নিরুপায় হয়ে গত এক মাসে দুইটি সিলিন্ডার ২৫০০ ও ২৮০০ টাকায় কিনে চা বিক্রি করেছি। তবে আগে প্রতিকাপ চা বিক্রি করতাম ৫ টাকা।

আব্দুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের কথা ও সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বেবচনার প্রেক্ষিতে ৫ টাকার পরিবর্তে ২ টাকা বাড়িয়ে প্রতিকাপ চা বিক্রি করছি ৭ টাকায়। দুই টাকা বাড়ানো নিয়েও প্রতিদিনই বোক্তার সঙ্গে তর্কে জড়াতে হয়। তাই ঝামেলা এড়াতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আগেই চায়ের দাম বলে দিচ্ছি ক্রেতাদের। এখন গ্যাস সিলিন্ডার না পাওয়ায় কেরোসিনের চুলা জ¦ালিয়ে চা বিক্রি করতে হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহের সংকটে জ¦ালানি তেল কেরোসিনের লিটারপ্রতি দামও বেড়েছে ১৫ টাকা। আগে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কিনলেও এখন পাইকারি দরে প্রতিলিটার কেরোসিন তেল কিনতে হচ্ছে ১১০ টাকা থেকে ১২৫ টাকায়। এখানেও একটা বাণিজ্য করে ফায়দা লুটছে কেরোসিন তেল বিক্রেতারা। দেখার কেউ নেই…। লালবাগের নবাবগঞ্জ মদনার খেত গলির চা দোকানি মো. সিদ্দিকুর রহমানও জানালেন একই কথা।

রাজধানীর আজিমপুর এলাকার চা বিক্রেতা সিজান বলেন, চায়ের দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস আমাদের লাগেই। এই এলাকার কোনো দোকান থেকে সিলিন্ডার কিনতে পারছি না। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার কামরাঙ্গীরচর থেকে কিনে এনেছি ২৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৫০০ টাকায়। আরেক দোকানি রুমান বলেন, অনেক বহু জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাতে ২ হাজার ৮০০ টাকায় দুটি সিলিন্ডার পাইছি। দাম তো অনেক বেশি। কিন্তু কিছু করার নেই, দোকান চালাতে হলে গ্যাস তো লাগবেই। এজন্য বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।

রাজধানীর বাটা সিগন্যাল এলাকার এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা ব্যবসায়ী রিপন বলেন, আমরা আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৩০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন অনেকেই সিলিন্ডার চাচ্ছেন, আমরা দিতে পারছি না। পাইকারি বিক্রেতারা দাম বেশি নিচ্ছেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে বেশি দামেও পাচ্ছি না। আমরা প্রতি সিলিন্ডারে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ করি। ঘরভাড়া, ভ্যানভাড়া ও লেবার খরচ বাদ দিয়ে তেমন লাভ থাকে না।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এলপিজি সংকটের সুযোগ নিয়ে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী বাড়তি দাম রাখছেন। কোথাও কোথাও অস্বাভাবিক দাম রাখা হচ্ছে।

ধানমন্ডির কাঁঠালবাগান এলাকার পাইকারি এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহিদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা সিলিন্ডার ঠিকমতো পাচ্ছি না। চাহিদা মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সিলিন্ডার আনতে নরসিংদী গাড়ি পাঠাতে হয়। গাড়ি গিয়ে সিরিয়াল দিয়ে ৭-৮ দিন বসে থাকে। গাড়ি ভাড়ার ডেমারেজ দিতে হয়। আমাদের খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। কোম্পানি থেকে সরকারি দামে এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোম্পানি আমাদের থেকে সরকার নির্ধারিত দাম রাখছে। কিন্তু মার্কেটে সাপ্লাই কম, গাড়ি বসে থাকে। এজন্য খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমরাও কিছুটা বাড়তি দাম রাখছি।

রাজধানী ঢাকা ছাপিয়ে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের হাট-বাজার ও খুচরা দোকানের চিত্রও একই। সেখানেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলপি গ্যাসের তীব্র হাহাকার চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে কদর বেড়েছে ইলেকট্রিক চুলা আর জ¦ালানি তেল কেরোসিনের। প্রতিটি সিঙ্গেল চুলা মানভেদে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, ডাবল চুলা মানভেদে ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকায়ও বিক্রি করা হচ্ছে। কেরোসিনের প্রতিলিটারে দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২৫ টাকা। অনেকেই আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিপাকে পড়েছেন আবাসিক ও বাণিজ্যিকের এলপি গ্যাস ব্যবহারকারীরা। প্রতিমাসেই এখন দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি খরচ হচ্ছে শুধু রান্নার কাজে।

 

সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অনেক কোম্পানির ব্যাংকিং জটিলতা চলছে। এতে কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। সবমিলিয়ে সবগুলোর কোম্পানির সরবরাহ কমেছে। আগের বছরের চেয়ে গত ডিসেম্বর মাসে প্রায় প্রত্যেক কোম্পানির ২০ শতাংশের মতো সরবরাহ কমেছে। তিনি বলেন, এলপিজি সেক্টরে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এখন দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, আগে কোনো কোনো ডিস্ট্রিবিউটর দুই গাড়ি গ্যাস পেলে এখন এক গাড়ি পেতে তিন-চারদিন লাগছে। আগে গ্যাস সরবরাহ বেশি ছিল, কিন্তু ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা কম নিতো। বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় ডিলাররা তাদের খালি সব সিলিন্ডার ভরে নিতে চাইছেন। এতে চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে।

বিপিসি ও এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্যমতে, দেশে ৩৪টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসায় জড়িত। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে। এলপিজি খালাসের জন্য তাদের নিজস্ব টার্মিনাল রয়েছে। অন্যরা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিনে শুধু বটলিং করে বিপণন করে। দেশের এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত দেশের বড় ১০টি কোম্পানি।
সংগঠনের তথ্য বলছে, ২৩ প্রতিষ্ঠানের কাছে আমদানির অনুমতি থাকলেও গত ডিসেম্বরে মাত্র ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। বিএম এনার্জি, ওমেরা, ফ্রেশ, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও সান। ব্যাংকিং জটিলতার কারণে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাস, ওরিয়ন, জি-গ্যাস ও নাভানা ঋণপত্র খুলতে পারেনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা থাকলেও ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে কম এলপিজি আমদানি হয়েছে। ২০২৪ সালের পুরো বছরে যেখানে ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে এক বছরে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৫ টন। একইভাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের চেয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৮ হাজার ৮৬৬ টন কম আমদানি হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৫ টন। আগের বছরের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২ টন।

এদিকে চলতি (জানুয়ারি) মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। গত মাসে (ডিসেম্বর ২০২৫) দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। এর আগের মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা। বিইআরসির নতুন দর অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা। ডিসেম্বর মাসে তা ছিল ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। অর্থাৎ, এ মাসে দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা ৪২ পয়সা।

 

তবে, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম পূণঃনির্ধারণ ও হয়রানি বন্ধসহ ৫টি দাবিতে গত ৭ জানুয়ারি সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান। পরদিন ৮ জানুয়ারি বিইআরসি ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সংগঠনের ব্যবসায়ী নেতারা। বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনায় সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ ও বিক্রি স্বাভাবিক রাখার ঘোষণা দেন সমিতির সভাপতি সেলিম খান। কিন্তু বাস্তবে সেই ঘোষণা কার্যকর করেনি ব্যবসায়ীরা। এতে সরকার ও গ্রাহদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
এসব বিষয়ে জানতে ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. সেলিম খানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তার বক্তব্য মেলেনি।

তবে, এলপিজি ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে এলপিজির সংকট চলছে। আমাদের এলপিজির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বেশি এলপিজি আমদানি হয়। এর মধ্যে যে কয়টি জাহাজ বাংলাদেশে আমদানি করা এলপিজি বহন করতো, সম্প্রতি আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে এলপিজি বহনকারী কয়েকটি জাহাজও পড়েছে। তিনি বলেন, বটলিং প্ল্যান্ট যাদের আছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। বটলিং পর্যায়ে কেউ দাম বেশি নিচ্ছে না। কিন্তু সরবররাহ ঘাটতির সুযোগে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে এমন যুক্তি মানতে নারাজ ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা পাঁচটি প্রতিষ্ঠান গত বছর এলপিজির আমদানি বাড়ানো এবং প¬্যান্ট সম্প্রসারণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের অনুমতি দেয়নি। অথচ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এলসি করেনি। শীতকালে এলপিজি’র চাহিদা বাড়ে। আমাদের অতিরিক্ত আমদানির অনুমতি দিলে হয়তো এখন ক্রাইসিস (সংকট) তৈরি হতো না। এবার চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাও একটি কারণ।

এমআর/সবা