১০:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডিমের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না

তেজগাঁও আড়তে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা

◉ চট্টগ্রামে আড়তেও ডিম বিক্রি বন্ধ
◉ বাজারে ডিমের সরবরাহে সমস্যা
◉ ব্যবসায়ীদের দাবি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে

দীর্ঘদিন যাবত নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বর্তমান নিত্যপণ্যের বাজারে মাছ, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুর দাম চড়া হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে সস্তা প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের। এই পরিস্থিতিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যখন বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি ডিমের দাম ১১.৮৭ টাকা বেঁধে দেয়। কিন্তু তাতেও বাজার নিয়ন্ত্রণে না এসে উল্টো দাম আরও বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সাড়ে ৪ কোটি পিস ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে। আমদানির খবরে অবশ্য ডিমের দাম সামান্য কমতে শুরু করলেও ভোক্তাকে এখনো প্রতিটি ডিম ১৪ টাকা বা তারও বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে জানান খুচরা বিক্রেতারা। এই পরিস্থিতে নুতন করে ঢাকার পাইকারি বাজার তেজগাঁও ও চট্টগ্রামে আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। ফার্মের মুরগির ডিমের বাড়তি দামের মধ্যে বাজারে ডিমের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

রাজধানীতে ডিম বিক্রির অন্যতম বড় পাইকারি বাজার হচ্ছে তেজগাঁও আড়ত। দেশের বিভিন্ন স্থানের খামার থেকে ট্রাকে করে এখানে ডিম আসে। এরপর তেজগাঁও থেকে ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লায় ডিম সরবরাহ হয়। বর্তমানে এই আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।
তেজগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তাদের ডিম কিনতে হচ্ছে। কিন্তু কেনা দামের ভিত্তিতে তা বিক্রি করতে পারছেন না। সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তাই ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার ভয়ে তারা মুরগির ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে গতকাল রাতে তেজগাঁওয়ে ডিমের কোনো গাড়ি না আসায় কোনো ডিমও বিক্রি হয়নি।

রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজারে গতকাল সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বাজারে ফার্মের মুরগির এক ডজন বাদামি ডিম ১৮০ টাকা ও সাদা ডিম ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ডিমের সরবরাহ তুলনামূলক কম বলেও জানান বিক্রেতারা।
তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ জানান, সরকার খুচরা পর্যায়ে ডিমের যে দাম নির্ধারণ করেছে, তার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে খামারিদের কাছ থেকে ডিম কিনছেন তারা। এ কারণে বিক্রিও করতে হচ্ছে বাড়তি দামে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গতকাল রাতে তারা পাইকারিতে ডিম বিক্রি করেছেন প্রতিটি ১২ টাকা ৫০ পয়সা দরে। এই ডিম তারা কিনেছেন ১২ টাকা থেকে ১২ টাকা ২০ পয়সা দরে।

আমানত উল্লাহ আরও জানান, তেজগাঁওয়ে দৈনিক ১৪-১৫ লাখ ডিম আসে। ঢাকায় ডিমের চাহিদা এক কোটি। তেজগাঁওয়ের বাইরে কিছু জায়গায় অনেকে ঠিকই উচ্চ দামে ডিম বিক্রি করছেন। কিন্তু বাড়তি দামে কেনাবেচার কারণে শুধু তাদের দায়ী করা হচ্ছে, অভিযান চালানো হচ্ছে। এ জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন তারা।
অন্যদিকে, সরকারের বেঁধে দেয়া দামে বিক্রি করতে না পারায় চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী বাজারের ডিমের আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রোববার থেকেই ব্যবসায়ীরা আড়ত বন্ধ রেখেছেন বলে জানিয়েছেন পাহাড়তলী ডিম আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল শুক্কর লিটন।

আবদুল শুক্কর লিটন বলেন, এ সমস্যার মূলে রয়েছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা ব্যাংক লেনদেনে সরকার নির্ধারিত টাকা আদায় করলেও নগদে আদায় করছেন বাড়তি দাম। এ অবস্থায় বাড়তি দামে ডিম কিনে তা সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। সরকারের উচিত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার নির্ধারিত দামে ডিম বিক্রিতে বাধ্য করা।
এদিকে আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে ডিমের দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নগরের বহদ্দারহাট বাজারে বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজনপ্রতি ১৭০ টাকা আর সাদা ডিমের ডজন ১৬৫ টাকায়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আড়ত বন্ধ রাখলে খুচরা পর্যায়ে দামে প্রভাব পড়বে। এ সময় প্রশাসন, খুচরা-পাইকারি, মধ্যস্বত্বভোগী ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে বসতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সমাধানে আসা জরুরি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ফার্মের মুরগির ডিম এবং ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। বেঁধে দেওয়া দাম অনুসারে, উৎপাদক পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারি পর্যায়ে ১১ টাকা ১ পয়সা ও খুচরা পর্যায়ে তা ১১ টাকা ৮৭ পয়সা হওয়ার কথা। সে হিসাবে খুচরা পর্যায়ে এক ডজন ডিমের দাম হয় ১৪২ টাকা। কিন্তু খুচরা বাজারে এখন ১৭০-১৮০ টাকায় ডিম বিক্রি হচ্ছে। ডিমের এমন উচ্চ দাম বেশ কিছুদিন ধরে চলছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডিম উৎপাদক ও পাইকারি ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেই তারা ডিমের ‘যৌক্তিক দাম’ নির্ধারণ করেছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

আইসিবিতে শুরু হলো প্রাণিস্বাস্থ্য ও মৎস্য খাতের প্রদর্শনী

ডিমের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না

আপডেট সময় : ০৮:০০:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৪

◉ চট্টগ্রামে আড়তেও ডিম বিক্রি বন্ধ
◉ বাজারে ডিমের সরবরাহে সমস্যা
◉ ব্যবসায়ীদের দাবি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে

দীর্ঘদিন যাবত নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বর্তমান নিত্যপণ্যের বাজারে মাছ, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুর দাম চড়া হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে সস্তা প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের। এই পরিস্থিতিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যখন বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি ডিমের দাম ১১.৮৭ টাকা বেঁধে দেয়। কিন্তু তাতেও বাজার নিয়ন্ত্রণে না এসে উল্টো দাম আরও বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সাড়ে ৪ কোটি পিস ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে। আমদানির খবরে অবশ্য ডিমের দাম সামান্য কমতে শুরু করলেও ভোক্তাকে এখনো প্রতিটি ডিম ১৪ টাকা বা তারও বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে জানান খুচরা বিক্রেতারা। এই পরিস্থিতে নুতন করে ঢাকার পাইকারি বাজার তেজগাঁও ও চট্টগ্রামে আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। ফার্মের মুরগির ডিমের বাড়তি দামের মধ্যে বাজারে ডিমের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

রাজধানীতে ডিম বিক্রির অন্যতম বড় পাইকারি বাজার হচ্ছে তেজগাঁও আড়ত। দেশের বিভিন্ন স্থানের খামার থেকে ট্রাকে করে এখানে ডিম আসে। এরপর তেজগাঁও থেকে ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লায় ডিম সরবরাহ হয়। বর্তমানে এই আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।
তেজগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তাদের ডিম কিনতে হচ্ছে। কিন্তু কেনা দামের ভিত্তিতে তা বিক্রি করতে পারছেন না। সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তাই ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার ভয়ে তারা মুরগির ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে গতকাল রাতে তেজগাঁওয়ে ডিমের কোনো গাড়ি না আসায় কোনো ডিমও বিক্রি হয়নি।

রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজারে গতকাল সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বাজারে ফার্মের মুরগির এক ডজন বাদামি ডিম ১৮০ টাকা ও সাদা ডিম ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ডিমের সরবরাহ তুলনামূলক কম বলেও জানান বিক্রেতারা।
তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ জানান, সরকার খুচরা পর্যায়ে ডিমের যে দাম নির্ধারণ করেছে, তার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে খামারিদের কাছ থেকে ডিম কিনছেন তারা। এ কারণে বিক্রিও করতে হচ্ছে বাড়তি দামে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গতকাল রাতে তারা পাইকারিতে ডিম বিক্রি করেছেন প্রতিটি ১২ টাকা ৫০ পয়সা দরে। এই ডিম তারা কিনেছেন ১২ টাকা থেকে ১২ টাকা ২০ পয়সা দরে।

আমানত উল্লাহ আরও জানান, তেজগাঁওয়ে দৈনিক ১৪-১৫ লাখ ডিম আসে। ঢাকায় ডিমের চাহিদা এক কোটি। তেজগাঁওয়ের বাইরে কিছু জায়গায় অনেকে ঠিকই উচ্চ দামে ডিম বিক্রি করছেন। কিন্তু বাড়তি দামে কেনাবেচার কারণে শুধু তাদের দায়ী করা হচ্ছে, অভিযান চালানো হচ্ছে। এ জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ রেখেছেন তারা।
অন্যদিকে, সরকারের বেঁধে দেয়া দামে বিক্রি করতে না পারায় চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী বাজারের ডিমের আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রোববার থেকেই ব্যবসায়ীরা আড়ত বন্ধ রেখেছেন বলে জানিয়েছেন পাহাড়তলী ডিম আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল শুক্কর লিটন।

আবদুল শুক্কর লিটন বলেন, এ সমস্যার মূলে রয়েছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা ব্যাংক লেনদেনে সরকার নির্ধারিত টাকা আদায় করলেও নগদে আদায় করছেন বাড়তি দাম। এ অবস্থায় বাড়তি দামে ডিম কিনে তা সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। সরকারের উচিত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার নির্ধারিত দামে ডিম বিক্রিতে বাধ্য করা।
এদিকে আড়তে ডিম বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে ডিমের দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নগরের বহদ্দারহাট বাজারে বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজনপ্রতি ১৭০ টাকা আর সাদা ডিমের ডজন ১৬৫ টাকায়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আড়ত বন্ধ রাখলে খুচরা পর্যায়ে দামে প্রভাব পড়বে। এ সময় প্রশাসন, খুচরা-পাইকারি, মধ্যস্বত্বভোগী ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে বসতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সমাধানে আসা জরুরি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ফার্মের মুরগির ডিম এবং ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। বেঁধে দেওয়া দাম অনুসারে, উৎপাদক পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারি পর্যায়ে ১১ টাকা ১ পয়সা ও খুচরা পর্যায়ে তা ১১ টাকা ৮৭ পয়সা হওয়ার কথা। সে হিসাবে খুচরা পর্যায়ে এক ডজন ডিমের দাম হয় ১৪২ টাকা। কিন্তু খুচরা বাজারে এখন ১৭০-১৮০ টাকায় ডিম বিক্রি হচ্ছে। ডিমের এমন উচ্চ দাম বেশ কিছুদিন ধরে চলছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডিম উৎপাদক ও পাইকারি ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেই তারা ডিমের ‘যৌক্তিক দাম’ নির্ধারণ করেছিল।