* অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংস্কারের চিন্তা
* ১২১টি সংস্কার প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত
* সংবিধান সংশোধন করে বাস্তবায়নযোগ্য দুই প্রস্তাবও অধ্যাদেশ দিয়ে বাস্তবায়ন
* অধ্যাদেশ দিয়ে সংস্কারে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে বলছেন বিশেষজ্ঞরা
‘অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন সম্ভব। বাংলাদেশে এর আগেও অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ পরবর্তীতে সেটির অনুমোদন দিয়েছে’
অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সহসভাপতি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন
‘অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে যে যুক্তিগুলো আসছে, সবকিছুই তো ডকট্রিন অব নেসেসিটিকে ধরে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকেই হচ্ছে। এগুলো ভবিষ্যতে আসলে কতটুকু টিকবে বা টিকবে না, তা এখনই একবাক্যে বলে দেওয়া মুশকিল’
-জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্দেশ্যে অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে পাঁচটি সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলোর মধ্য থেকে ১২১টি প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নের জন্য চিহ্নিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে দুইটি বিষয়ে সংস্কারে বাধা সংবিধান। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর একটি নিয়ে এরই মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করেছে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধন করে ওই বিষয়গুলো নতুন অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানে সংযোজন করা হবে বলে জানা গেছে। তবে সংবিধান সংশোধন করে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়ে অধ্যাদেশ জারির বিষয়টি ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এ সরকারের নিজেরই সাংবিধানিক বৈধতা নেই। এখন সংবিধান সংশোধন করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হলে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। এটার লিগ্যালেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলছেন তারা।
জানা গেছে, পাঁচটি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ করা ১৬৬টি প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এর বাইরে সংলাপ ছাড়াই ১২১টি প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নের জন্য চিহ্নিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংসদ কার্যকর না থাকায় অধ্যাদেশ জারি করে ওই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত ১৯ মার্চ কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সরকারি দপ্তরকে কমিশনের এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে, তা নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠিও পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর মধ্যে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের দুটি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধন করে বাস্তবায়ন করার কথা। এই দুটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে পরে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্যান্য বিচারক নিয়োগের জন্য স্বাধীন ও স্বতন্ত্র কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। এই সুপারিশ আশু বাস্তবায়নের তালিকায় রেখে আইন ও বিচার বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, সংসদ এবং অর্থ বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে করণীয় হিসেবে নতুন অধ্যাদেশ জারি ও কমিশন গঠন এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী সরকারি দপ্তরগুলোকে এ বিষয়ে সংবিধানের ৯৫(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে বলা আছে।
অন্যদিকে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগে অস্থায়ী ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি স্থায়ী জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত আশু বাস্তবায়নের তালিকায় রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগকে। এদিকে, সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত বলা আছে। একটি স্থায়ী জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার এই অনুচ্ছেদের সঙ্গে নতুন করে ৬৪(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করতে হবে। অন্যদিকে, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া আছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির কাছে আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন মনে হলে তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন। তবে ওই অধ্যাদেশের কারণে সংবিধানের কোনো বিধানের পরিবর্তন বা রহিত হয় এমন অধ্যাদেশ জারি করা যাবে নাÑ এমনটিই বলা আছে সংবিধানে।
এদিকে, সংবিধান সংশোধন করে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হলে তা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এ সরকারের নিজেরই সাংবিধানিক বৈধতা নেই। এখন সংবিধান সংশোধন করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হলে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। এটার লিগ্যালেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলছেন তারা। তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন সম্ভব। বাংলাদেশে এর আগেও অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ পরবর্তীতে সেটির অনুমোদন দিয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, এগুলোর লিগ্যালিটি নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠবে। অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে যে যুক্তিগুলো আসছে, সবকিছুই তো ডকট্রিন অব নেসেসিটিকে ধরে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকেই হচ্ছে। তখন হয়তো সংবিধানের সংশোধনীকে অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে করাকেও জাস্টিফাই করার চেষ্টা করবে। এগুলো ভবিষ্যতে আসলে কতটুকু টিকবে বা টিকবে না, তা এখনই একবাক্যে বলে দেওয়া মুশকিল। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সরকারেরই তো বৈধতা নেই, সেটিকে তো রেকটিফাই করার প্রয়োজনীয়তা আছে।
এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন সম্ভব। বাংলাদেশে এর আগেও অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ পরবর্তীতে সেটির অনুমোদন দিয়েছে।













