০৭:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে এখনো সক্রিয় হরিণ শিকারিরা

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে হরিণ শিকারিরা। তারা নানা কৌশলে বনে ঢুকে নানা ধরনের ফাঁদ পেতে এবং গুলি করে চিত্রা ও মায়া হরিণ শিকার করছে। অভিযোগ রয়েছে, ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর বনভূমির নিরাপত্তায় বনরক্ষী মাত্র ৩৭৫ জন। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সুন্দরবনে বনদস্যু বা হরিণ শিকারিদের চক্রগুলোর উৎপাত বেড়ে গেছে। শিকারিদের ধরতে সুন্দরবনে স্মার্ট প্যাট্রল এবং বন বিভাগের টহল থাকলেও অদৃশ্য কারণে হরিণ শিকার কমছে না। বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে আবার কখনো এদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বনে ঢুকে শিকারিরা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করছে। এরপর বিভিন্ন কৌশলে হরিণের মাংস খুলনা-বাগেরহাট এমনকি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে নানা দামে। তবে বেশি দামে বিক্রি হয় চামড়া। আর এভাবে বিক্রি করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে পথে ঘাটে ধরা পড়ে দুই-একজন শিকারি। ধরা পড়া দুই একজন ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে অর্থ বাণিজ্য করে কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা ও পুলিশ। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধি এসব শিকারিচক্রের কাছ থেকে হরিণের মাংসসহ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করায় দিন দিন সুন্দরবনে হরিণ শিকার বেড়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুন্দরবনে যে অঞ্চলে কেওড়া গাছ বেশি, সেখানে হরিণের বিচরণ বেশি থাকে। তাই সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিরা সুন্দরবনের গহীনে সেসব স্থানে অবস্থান নিয়ে নৌকা, ট্রলার ও গাছে মাচা পেতে হরিণের গতিবিধি লক্ষ্য করে। হরিণ নদী ও খালের চরাঞ্চলে ঘাস খেতে আসে। শিকারিরা এসব স্থানে নানা ধরনের ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। কখনো তারা গুলি ছুড়েও হরিণ শিকার করে। পরে গোপন আস্তানায় মাংস তৈরি করে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে। সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা, শরণখেলা, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছাসহ বনের আশপাশ এলাকায় সবচেয়ে বেশি হরিণের মাংস পাওয়া যায়। এভাবে হরিণ শিকার করে বিক্রি করতে গিয়ে অনেকে ধরাও পড়েন আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে।
জানা যায়, সুন্দরবনের ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর বনভূমির নিরাপত্তায় মাত্র ৩৭৫ জন বনরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অধীনে রয়েছে ৩১টি ইউনিট অফিস। কোরবানির ছুটিতে কেউ ছুটি না নিয়ে তারা টানা এই অভিযান পরিচালনা করেছেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঈদের আগে গত ২ জুন থেকে ঈদ পরবর্তী গত ১৩ জুন পর্যন্ত টানা ১২ দিনে প্রায় ৩০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মোট ৫৮৫টি মালা ফাঁদ, ৬১.৫ কেজি ওজনের মালা ফাঁদের অংশ (প্রতি কেজিতে আনুমানিক ৩০টি ফাঁদ হিসেবে প্রায় ২,৪৩০টি), ৩০টি ছিটকা ফাঁদ, হরিণের ফাঁদ তৈরির জন্য ২ বান্ডেল নাইলনের দড়ি, ২৫টি নিষিদ্ধ চারু, ৫টি বিষের বোতল, ৪টি নৌকা, একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার এবং ২ জনকে আটক করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে একাধিক মামলা করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, অভিযানগুলো পরিচালিত হয় সুন্দরবনের ডিমের চর, বড় বরকত খাল, রূপারগাং, কালামিয়া ভারানী খাল, সূর্যমুখী খাল, কাতলেশ্বর খাল, হুলোর ভারানী খাল ও বয়ারশিং এলাকার শিসা খালসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। এসব অভিযানে পায়ে হেঁটে, স্পিডবোটে এবং কখনো ড্রোনের সহায়তায় গভীর বনের ভেতর অভিযান চালানো হয়। তবে বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেক সময়ই জেলের বেশে থাকা শিকারিরা পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের (মোংলা) ঢাংমারী স্টেশন কর্মকর্তা সুরজিৎ চৌধুরী জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৩ জুন বিকেলে ঢাংমারীর বনের অভ্যন্তরের হুলার ভারানী সংলগ্ন পাশের খালে পায়ে হেঁটে অভিযান চালায় বনপ্রহরীরা। এ সময় ওই এলাকা থেকে হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা ৮২টি মালা (গোলাকৃতি) ফাঁদ জব্দ করে অভিযানকারীরা।
অপরদিকে একইদিন সকালে নন্দবালা টহল ফাঁড়ির সূর্যমুখী খাল সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৩টি মালা ফাঁদ জব্দ করে বনপ্রহরী। এর আগে, গত ১০ জুন সুপতি স্টেশনের আওতাধীন শাপলা ক্যাম্পের ছোট সিন্দুক বারিয়া খালের উত্তর পাশে বনের ভেতর থেকে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ৪৫০টি মালা ফাঁদ জব্দ করে বনরক্ষকীরা।
ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যেও পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জজুড়ে বনবিভাগ পরিচালিত বিশেষ ‘কম্বিং অপারেশন’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এ অভিযানে হরিণ শিকার রোধে চোরা শিকারি চক্রের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার হরিণ ধরার ফাঁদ, চোরাই কাজে ব্যবহৃত নৌকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে একাধিক মামলা দায়ের এবং শিকারিদের গ্রেপ্তার করতেও সক্ষম হয়েছে বনবিভাগ।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ হলেও আইন অমান্য করে হরিণ শিকার করছে একটি চক্র। এতে সুন্দরবনে দিন দিন কমে যাচ্ছে হরিণের সংখ্যা। সাম্প্রতিক সময়ে হরিণ শিকার বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যেখানে বনদস্যু আটক হয়ে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হচ্ছে। সেখানে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার বেড়ে যাচ্ছে। এর পেছনে বনবিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) রানা দেব বলেন, মূলত ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে গেলে জেলে বা মৌয়ালবেশে চোরা শিকারিরা সুন্দরবনে ঢুকে হরিণ শিকার করে থাকে। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ঈদের আগেই সুন্দরবনের সব টহল ফাঁড়ি ও স্টেশনের বন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের বিশেষ নজরদারি চালাতে বলা হয়েছে। বনরক্ষীরা তাদের টহল কার্যক্রম জোরদার করেছেন।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নুরুল করীম বলেন, সুন্দরবনে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। সীমিত করা হয়েছে বনরক্ষীদের ছুটি। বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ছুটি দেওয়া হয়নি। মূলত ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছর চোরা শিকারি চক্র মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে একটি চক্র তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদের প্রতিরোধে বনরক্ষীদের বিশেষ টহল কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে এখনও যত্রতত্র হরিণ ধরার ফাঁদ পাতা রয়েছে। আমাদের বনরক্ষীরা জঙ্গলে হেঁটে সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন। তবে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়, শিকারিদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। এলিট ভোক্তাদের চিহ্নিত করে সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, প্রভাবশালীদের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা।
তিনি আরও বলেন, বনবিভাগ সীমিত সামর্থ্য নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য সব মহলের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বেগম খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনায় ইবি ছাত্রদলের দোয়া মাহফিল

সুন্দরবনে এখনো সক্রিয় হরিণ শিকারিরা

আপডেট সময় : ০৫:০৩:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ জুন ২০২৫

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে হরিণ শিকারিরা। তারা নানা কৌশলে বনে ঢুকে নানা ধরনের ফাঁদ পেতে এবং গুলি করে চিত্রা ও মায়া হরিণ শিকার করছে। অভিযোগ রয়েছে, ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর বনভূমির নিরাপত্তায় বনরক্ষী মাত্র ৩৭৫ জন। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সুন্দরবনে বনদস্যু বা হরিণ শিকারিদের চক্রগুলোর উৎপাত বেড়ে গেছে। শিকারিদের ধরতে সুন্দরবনে স্মার্ট প্যাট্রল এবং বন বিভাগের টহল থাকলেও অদৃশ্য কারণে হরিণ শিকার কমছে না। বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে আবার কখনো এদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বনে ঢুকে শিকারিরা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করছে। এরপর বিভিন্ন কৌশলে হরিণের মাংস খুলনা-বাগেরহাট এমনকি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে নানা দামে। তবে বেশি দামে বিক্রি হয় চামড়া। আর এভাবে বিক্রি করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে পথে ঘাটে ধরা পড়ে দুই-একজন শিকারি। ধরা পড়া দুই একজন ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে অর্থ বাণিজ্য করে কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা ও পুলিশ। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধি এসব শিকারিচক্রের কাছ থেকে হরিণের মাংসসহ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করায় দিন দিন সুন্দরবনে হরিণ শিকার বেড়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুন্দরবনে যে অঞ্চলে কেওড়া গাছ বেশি, সেখানে হরিণের বিচরণ বেশি থাকে। তাই সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিরা সুন্দরবনের গহীনে সেসব স্থানে অবস্থান নিয়ে নৌকা, ট্রলার ও গাছে মাচা পেতে হরিণের গতিবিধি লক্ষ্য করে। হরিণ নদী ও খালের চরাঞ্চলে ঘাস খেতে আসে। শিকারিরা এসব স্থানে নানা ধরনের ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। কখনো তারা গুলি ছুড়েও হরিণ শিকার করে। পরে গোপন আস্তানায় মাংস তৈরি করে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে। সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা, শরণখেলা, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছাসহ বনের আশপাশ এলাকায় সবচেয়ে বেশি হরিণের মাংস পাওয়া যায়। এভাবে হরিণ শিকার করে বিক্রি করতে গিয়ে অনেকে ধরাও পড়েন আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে।
জানা যায়, সুন্দরবনের ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর বনভূমির নিরাপত্তায় মাত্র ৩৭৫ জন বনরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অধীনে রয়েছে ৩১টি ইউনিট অফিস। কোরবানির ছুটিতে কেউ ছুটি না নিয়ে তারা টানা এই অভিযান পরিচালনা করেছেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঈদের আগে গত ২ জুন থেকে ঈদ পরবর্তী গত ১৩ জুন পর্যন্ত টানা ১২ দিনে প্রায় ৩০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মোট ৫৮৫টি মালা ফাঁদ, ৬১.৫ কেজি ওজনের মালা ফাঁদের অংশ (প্রতি কেজিতে আনুমানিক ৩০টি ফাঁদ হিসেবে প্রায় ২,৪৩০টি), ৩০টি ছিটকা ফাঁদ, হরিণের ফাঁদ তৈরির জন্য ২ বান্ডেল নাইলনের দড়ি, ২৫টি নিষিদ্ধ চারু, ৫টি বিষের বোতল, ৪টি নৌকা, একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার এবং ২ জনকে আটক করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে একাধিক মামলা করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, অভিযানগুলো পরিচালিত হয় সুন্দরবনের ডিমের চর, বড় বরকত খাল, রূপারগাং, কালামিয়া ভারানী খাল, সূর্যমুখী খাল, কাতলেশ্বর খাল, হুলোর ভারানী খাল ও বয়ারশিং এলাকার শিসা খালসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। এসব অভিযানে পায়ে হেঁটে, স্পিডবোটে এবং কখনো ড্রোনের সহায়তায় গভীর বনের ভেতর অভিযান চালানো হয়। তবে বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেক সময়ই জেলের বেশে থাকা শিকারিরা পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের (মোংলা) ঢাংমারী স্টেশন কর্মকর্তা সুরজিৎ চৌধুরী জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৩ জুন বিকেলে ঢাংমারীর বনের অভ্যন্তরের হুলার ভারানী সংলগ্ন পাশের খালে পায়ে হেঁটে অভিযান চালায় বনপ্রহরীরা। এ সময় ওই এলাকা থেকে হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা ৮২টি মালা (গোলাকৃতি) ফাঁদ জব্দ করে অভিযানকারীরা।
অপরদিকে একইদিন সকালে নন্দবালা টহল ফাঁড়ির সূর্যমুখী খাল সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৩টি মালা ফাঁদ জব্দ করে বনপ্রহরী। এর আগে, গত ১০ জুন সুপতি স্টেশনের আওতাধীন শাপলা ক্যাম্পের ছোট সিন্দুক বারিয়া খালের উত্তর পাশে বনের ভেতর থেকে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা ৪৫০টি মালা ফাঁদ জব্দ করে বনরক্ষকীরা।
ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যেও পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জজুড়ে বনবিভাগ পরিচালিত বিশেষ ‘কম্বিং অপারেশন’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এ অভিযানে হরিণ শিকার রোধে চোরা শিকারি চক্রের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার হরিণ ধরার ফাঁদ, চোরাই কাজে ব্যবহৃত নৌকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে একাধিক মামলা দায়ের এবং শিকারিদের গ্রেপ্তার করতেও সক্ষম হয়েছে বনবিভাগ।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ হলেও আইন অমান্য করে হরিণ শিকার করছে একটি চক্র। এতে সুন্দরবনে দিন দিন কমে যাচ্ছে হরিণের সংখ্যা। সাম্প্রতিক সময়ে হরিণ শিকার বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যেখানে বনদস্যু আটক হয়ে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হচ্ছে। সেখানে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার বেড়ে যাচ্ছে। এর পেছনে বনবিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) রানা দেব বলেন, মূলত ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে গেলে জেলে বা মৌয়ালবেশে চোরা শিকারিরা সুন্দরবনে ঢুকে হরিণ শিকার করে থাকে। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ঈদের আগেই সুন্দরবনের সব টহল ফাঁড়ি ও স্টেশনের বন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের বিশেষ নজরদারি চালাতে বলা হয়েছে। বনরক্ষীরা তাদের টহল কার্যক্রম জোরদার করেছেন।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নুরুল করীম বলেন, সুন্দরবনে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। সীমিত করা হয়েছে বনরক্ষীদের ছুটি। বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ছুটি দেওয়া হয়নি। মূলত ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছর চোরা শিকারি চক্র মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে একটি চক্র তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদের প্রতিরোধে বনরক্ষীদের বিশেষ টহল কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে এখনও যত্রতত্র হরিণ ধরার ফাঁদ পাতা রয়েছে। আমাদের বনরক্ষীরা জঙ্গলে হেঁটে সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন। তবে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়, শিকারিদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। এলিট ভোক্তাদের চিহ্নিত করে সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, প্রভাবশালীদের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা।
তিনি আরও বলেন, বনবিভাগ সীমিত সামর্থ্য নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য সব মহলের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।