০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ডয়চে ভেলে’র প্রতিবেদন

বাংলাদেশ যেন এক ‘মবের মুল্লুক’

দেশে এখন ‘মবের মুল্লুক’ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা মব সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনায় তিনি ডয়চে ভেলের কাছে এই মন্তব্য করেন। আর বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, সরকার যা-ই বলুক না কেন, তারা মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম নূরুল হুদা। তার বাসা উত্তরায়। গত রোববার বিকালে তার বাসার সামনে মব তৈরি করা হয়। এরপর একদল লোক বাসায় ঢুকে তাকে বের করে আনে। বাসার সামনে প্রকাশ্যে তার গলায় জুতার মালা পরানো হয়। করা হয় জুতাপেটা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, নূরুল হুদা সাদা টি-শার্ট ও লুঙ্গি পরা। তাকে ঘিরে রয়েছে একদল লোক। তারা নূরুল হুদাকে একটি জুতার মালা পরিয়ে রেখেছে। এক ব্যক্তিকে জুতা দিয়ে তাকে আঘাত করতেও দেখা যায়। তখন পুলিশ খুব কাছেই দাঁড়ানো। ভিডিওতে আরো দেখা যায়, কেউ কেউ নূরুল হুদার দিকে ডিম ছুঁড়ে মারছে এবং নানাভাবে তাকে হেনস্তা করা হচ্ছে। হেনস্তার পর নূরুল হুদাকে পুলিশে দেওয়া হয়। এই মব সন্ত্রাস চলে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে।
পরে বিএনপির করা একটি মামলায় নূরুল হুদাকে গ্রেপ্তার দেখায় উত্তরা পশ্চিম থানা। রাতে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-র কার্যালয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার আদালতে হাজির করে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এর আগে সকালেই বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকার শেরে বাংলা নগর থানায় সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ২৪ জনের নামে ভোটারবিহীন এবং রাতের ভোটের অভিযোগে মামলা করা হয়। মব সন্ত্রাসের পর একই দিনে ওই মামলাতেই নূরুল হুদাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের তৎকালীন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি এ কে এম নূরুল হুদা ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালকে আসামি করা হয়েছে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজির আহমেদ ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও আসামি করা হয়েছে এই মামলায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সারা দেশে অসংখ্য মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মবসন্ত্রাসীরা বিনা বাধায়ই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবীদের। লুটপাট, দখলের ঘটনা ঘটেছে অনেক। মব সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহতও হয়েছেন অনেকে। সাবেক সিইসি মব সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার পর গত রোববার রাতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২২ জুন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদাকে একটি সুনির্দিষ্ট মামলায় রাজধানীর উত্তরা থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ সময় ‘মব’ কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও অভিযুক্তকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে।’
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২-২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ৯ মাসে মব মন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ২০২টি। এসব ঘটনায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২০২ জন। আর গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে মোট ৭৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালে। গত বছর এ ধরনের ঘটনায় ১৭৯ জন নিহত হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ছয় মাসেরও কম সময়ে মব ভায়োলেন্সে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৩ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ২২৫টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৭০টি ছিল বড় ধরনের আক্রমণ। পুলিশের সদর দপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে পুলিশের বিরুদ্ধে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪টি, নভেম্বরে ৪৯টি, ডিসেম্বরে ৪৩টি, জানুয়ারিতে ৩৮টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, এখানে তো সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারা মব করেছে, তাদের তো ছবি আছে। ভিডিওতে তাদের তো দেখা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেয়া যায়। খালি সরকার বিবৃতি দিলে তো কাজ হবে না। আসলে সরকার ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের মব ভায়োলেন্স বন্ধ হবে না। মব সন্ত্রাস তো একটা ক্রাইম। বিবৃতি দিয়ে কী হবে? দরকার কঠোর ব্যবস্থা।

জনপ্রিয় সংবাদ

৫ মাসেও উদ্ধার হয়নি পুলিশের সেই ‘হ্যান্ডকাফ’

ডয়চে ভেলে’র প্রতিবেদন

বাংলাদেশ যেন এক ‘মবের মুল্লুক’

আপডেট সময় : ০৭:৩৫:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫

দেশে এখন ‘মবের মুল্লুক’ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা মব সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনায় তিনি ডয়চে ভেলের কাছে এই মন্তব্য করেন। আর বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, সরকার যা-ই বলুক না কেন, তারা মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম নূরুল হুদা। তার বাসা উত্তরায়। গত রোববার বিকালে তার বাসার সামনে মব তৈরি করা হয়। এরপর একদল লোক বাসায় ঢুকে তাকে বের করে আনে। বাসার সামনে প্রকাশ্যে তার গলায় জুতার মালা পরানো হয়। করা হয় জুতাপেটা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, নূরুল হুদা সাদা টি-শার্ট ও লুঙ্গি পরা। তাকে ঘিরে রয়েছে একদল লোক। তারা নূরুল হুদাকে একটি জুতার মালা পরিয়ে রেখেছে। এক ব্যক্তিকে জুতা দিয়ে তাকে আঘাত করতেও দেখা যায়। তখন পুলিশ খুব কাছেই দাঁড়ানো। ভিডিওতে আরো দেখা যায়, কেউ কেউ নূরুল হুদার দিকে ডিম ছুঁড়ে মারছে এবং নানাভাবে তাকে হেনস্তা করা হচ্ছে। হেনস্তার পর নূরুল হুদাকে পুলিশে দেওয়া হয়। এই মব সন্ত্রাস চলে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে।
পরে বিএনপির করা একটি মামলায় নূরুল হুদাকে গ্রেপ্তার দেখায় উত্তরা পশ্চিম থানা। রাতে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-র কার্যালয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার আদালতে হাজির করে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এর আগে সকালেই বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকার শেরে বাংলা নগর থানায় সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ২৪ জনের নামে ভোটারবিহীন এবং রাতের ভোটের অভিযোগে মামলা করা হয়। মব সন্ত্রাসের পর একই দিনে ওই মামলাতেই নূরুল হুদাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের তৎকালীন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি এ কে এম নূরুল হুদা ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালকে আসামি করা হয়েছে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজির আহমেদ ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও আসামি করা হয়েছে এই মামলায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সারা দেশে অসংখ্য মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মবসন্ত্রাসীরা বিনা বাধায়ই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবীদের। লুটপাট, দখলের ঘটনা ঘটেছে অনেক। মব সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহতও হয়েছেন অনেকে। সাবেক সিইসি মব সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার পর গত রোববার রাতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২২ জুন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদাকে একটি সুনির্দিষ্ট মামলায় রাজধানীর উত্তরা থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ সময় ‘মব’ কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও অভিযুক্তকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে।’
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২-২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ৯ মাসে মব মন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ২০২টি। এসব ঘটনায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২০২ জন। আর গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে মোট ৭৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালে। গত বছর এ ধরনের ঘটনায় ১৭৯ জন নিহত হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ছয় মাসেরও কম সময়ে মব ভায়োলেন্সে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৩ জন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ২২৫টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৭০টি ছিল বড় ধরনের আক্রমণ। পুলিশের সদর দপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে পুলিশের বিরুদ্ধে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪টি, নভেম্বরে ৪৯টি, ডিসেম্বরে ৪৩টি, জানুয়ারিতে ৩৮টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, এখানে তো সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারা মব করেছে, তাদের তো ছবি আছে। ভিডিওতে তাদের তো দেখা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেয়া যায়। খালি সরকার বিবৃতি দিলে তো কাজ হবে না। আসলে সরকার ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের মব ভায়োলেন্স বন্ধ হবে না। মব সন্ত্রাস তো একটা ক্রাইম। বিবৃতি দিয়ে কী হবে? দরকার কঠোর ব্যবস্থা।