বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন। ঢাকায় তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে বিপুল জনসমাগম দেখা যায়, যা ২০২৬ সালের শুরুতে সম্ভাব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দেশে ফিরে উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে দেওয়া প্রথম ভাষণে তারেক রহমান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিভিন্ন জনমত জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার তথ্য সামনে আসছে। এসব জরিপ অনুযায়ী, দলটি যদি সংসদ নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পায়, তাহলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে অন্যতম প্রধান প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের দৃষ্টিতে তারেক রহমান এমন একজন নেতা, যিনি বাংলাদেশকে সর্বাগ্রে রাখার কথা বলেন, তবে একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্বও অস্বীকার করেন না। তিনি আঞ্চলিক বাস্তবতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বোঝেন এবং ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিকে বিশ্লেষকেরা ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানকেন্দ্রিক বলে উল্লেখ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দলটি নিরাপত্তা, জনকল্যাণ, শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনের মতো বিষয়গুলোকে ততটা গুরুত্ব দেয় না, যা তারেক রহমান তাঁর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
তারেক রহমান ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও ধর্মীয় উগ্রবাদের পক্ষে নন। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান অধিকার ও নিরাপত্তা থাকবে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তিনি একটি স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেছেন।
ঢাকার নয়াপল্টনে দেওয়া এক বিশাল সমাবেশে তিনি ঘোষণা দেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’ এই স্লোগানের মাধ্যমে তিনি জানান, বিএনপির নীতিতে দেশের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এবং কোনো পরাশক্তির বলয়ে পড়ে রাজনীতি করা হবে না।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ফারাক্কা পানি চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে আসছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে চুক্তির নবায়নে সংবেদনশীল ও দক্ষ কূটনীতি প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তারেক রহমানের বক্তব্যে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের উল্লেখ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে বলেও আলোচনা রয়েছে। দেশের মাটিতে দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব ঐতিহাসিক অর্জনের পরও দেশে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি কড়া অবস্থান নেন। যেকোনো মূল্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি সবাইকে উসকানির মুখে সংযত থাকার কথা বলেন। পাশাপাশি যুবসমাজকে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা ও গণতন্ত্রের ওপর তারেক রহমানের এই জোর জামায়াতে ইসলামীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের রাজনীতি উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা শিক্রি মনে করেন, ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের উত্থান ঘটাবে। তাঁর ভাষায়, অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোট থাকলেও এবার বিএনপি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে এবং জমিয়তে উলামা-ই-ইসলামের সঙ্গে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করেছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
এমআর/সবা


























