০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঋতুপর্ণার বা পায়ে ইতিহাসে লাল-সবুজ মেয়েরা

  • রুমেল খান
  • আপডেট সময় : ১২:৫৭:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই ২০২৫
  • 145

গোল করে আবেগে মুখ ঢেকে রাখলেও ঋতুপর্ণা চাকমা জোড়া গোল করে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সঙ্গে সতীর্থ মারিয়া মান্দা। ছবি : বাফুফে

‘প্রথমেই বলব, আমরা বাংলাদেশ থেকে একটা লক্ষ্য নিয়ে এসেছি, ম্যাচ বাই ম্যাচ জেতার। আমরা আমাদের যার যার পারফরম্যান্স, তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং সে অনুযায়ী ফল পেয়েছি। সমর্থকদের বলব, সমর্থন করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এখন যেভাবে সমর্থন দিচ্ছেন, আগামীতেও একইভাবে সমর্থন দিয়ে যান।’ কথাগুলো যার তিনি ঋতুপর্ণা চাকমা। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের এক আস্থা-ভরসার নাম। ২১ বছর বয়সী রাঙ্গামাটির এই সুদর্শনা পাহাড়ীকন্যার জোড়া গোলে গতকাল এএফসি নারী এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ ম্যাচে বাংলাদেশ ২-১ গোলে শক্তিশালী-স্বাগতিক মিয়ানামারকে হারিয়েছে। একইদিনে এই গ্রুপের অপর ম্যাচে বাহরাইন-তুর্কমেনিস্তান ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হওয়ায় এক ম্যাচ হাতে রেখেই (২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট) গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার (সি-গ্রুপ) পাশাপাশি এই আসরের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল বাংলাদেশ।
এখন বলা যায় এই আসরের মূলপর্বে ‘দুই পা’-ই দিয়ে ফেলেছে বাংলার বাঘিনীরা। ফলে আগামী ৫ জুলাই তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে হারলেও কোন ক্ষতি হবে না বাংলাদেশের।

গতকালকের ম্যাচে ১৯ ও ৭২তম মিনিটে গোল দুটি করেন লেফট উইঙ্গার ঋতুপর্ণা। প্রথমটি ফ্রি কিকের শট প্রতিপক্ষের দেয়ালে লেগে ফিরে আসার পর ফিরতি বলে বা পায়ের গড়ানো শটে। দ্বিতীয়টি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়ের কাছ থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের গোলসীমানার বা প্রান্ত দিয়ে বা পায়ের উঁচু বাঁকানো শটে। দুটি গোলেই ছিল বুদ্ধিমত্তার ছাপ। যতই সময় গড়াচ্ছে, ততই যেন পরিণত হচ্ছেন ঋতুপর্ণা।

এ নিয়ে ৩০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১১ গোল করলেন ঋতু। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ম্যাচে জোড়া গোল পেলেন। প্রথমবার ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। তারিখটা ছিল ৪ ডিসেম্বর (ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে)। ঋতুর ১১ গোলের সবচেয়ে বেশি এসেছে সাফে ও ফ্রেন্ডলি ম্যাচে (৪টি করে)। এফসি এশিয়ান কাপে এখন পর্যন্ত তিন গোল করেছেন। গত ২৯ জুন বাহরাইনের বিপক্ষে করেছিলেন প্রথমটি।

জেঠিমা নিলোবানু চাকমা বাংলা সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করতেন। ভারতের কোলকাতার নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তার অন্ধভক্ত তিনি। ২০০৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর যখন তার ভাইয়ের একটি ফুটফুটে মেয়ে হলো, তিনি তখন মায়াকাড়া চেহারার ওই শিশুকন্যার নাম রাখলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। জেঠিমার হয়তো সুপ্ত বাসনা ছিলÑ একদিন তার ভাতিজি নামকরা নায়িকা হবে। সময়ের পরিক্রমায় ঋতুপর্ণা নামকরা হয়েছেন ঠিকই, কিন্ত নায়িকা নয়, ফুটবলার! তাছাড়া ঋতুর নিজেরও নায়িকা হওয়ার কোন বাসনা নেই, ‘সিনেমার জগত আমার একদমই ভাল লাগে না। পছন্দ না আমার। নায়িকা হলে তো এখানে (ফুটবল জগতে) আর থাকতাম না।’

বাবার উৎসাহেই ফুটবল জগতে আসা ঋতুর। যখন খেলা শুরু করেন, তখন ঋতুর এলাকার লোকজন তার ফুটবল খেলা নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতো। এদিকে অভাব-অনটনের সংসার। তবে কৃষক বাবা বরজ বাঁশি চাকমা মেয়েকে সমর্থন-উৎসাহ দিতেন। মেয়েকে ধার করে খেলতে যাবার যাতায়াত ভাড়া এনে দিতেন অনেক কষ্টে। বাবার স্বপ্ন ছিল, মেয়ে একদিন জাতীয় দলে খেলবে। ঠিকই খেলেছে তার মেয়ে। কিন্তু সেটা তিনি দেখে যেতে পারেননি। ২০১৫ সালে মারা যান তিনি। আর ২০২২ সালে ছোটভাই পার্বণ চাকমা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুঃখজনকভাবে মারা যান। সেই দুঃখ এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন ঋতু।

মাত্র ৯ বয়সেই মঘাছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে ঋতু খেলেছিলেন বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল। সেবার তার স্কুল রানার্সআপ হয়েছিল। এর পরের দু’বছরও খেলেন। ২০১৩ আসরে তার স্কুল হয়েছিল তৃতীয়। ভাল খেলার সুবাদে ২০১৭ সালে জাতীয় অনুর্ধ-১৫ দলে ডাক পান। এরপর অ-১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ দলেও খেলেন। তারপরেই খেলার সুযোগ পান সিনিয়র বা জাতীয় দলে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ঋতুর স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা। সেই লক্ষ্য দু’বার পূরণ করেছেন। এবারের লক্ষ্যটা আরও বড়-প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলা, অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া। সেই লক্ষ্যপূরণও হয়ে গেল ঋতুর।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঋতুপর্ণার বা পায়ে ইতিহাসে লাল-সবুজ মেয়েরা

আপডেট সময় : ১২:৫৭:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই ২০২৫

‘প্রথমেই বলব, আমরা বাংলাদেশ থেকে একটা লক্ষ্য নিয়ে এসেছি, ম্যাচ বাই ম্যাচ জেতার। আমরা আমাদের যার যার পারফরম্যান্স, তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং সে অনুযায়ী ফল পেয়েছি। সমর্থকদের বলব, সমর্থন করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এখন যেভাবে সমর্থন দিচ্ছেন, আগামীতেও একইভাবে সমর্থন দিয়ে যান।’ কথাগুলো যার তিনি ঋতুপর্ণা চাকমা। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের এক আস্থা-ভরসার নাম। ২১ বছর বয়সী রাঙ্গামাটির এই সুদর্শনা পাহাড়ীকন্যার জোড়া গোলে গতকাল এএফসি নারী এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ ম্যাচে বাংলাদেশ ২-১ গোলে শক্তিশালী-স্বাগতিক মিয়ানামারকে হারিয়েছে। একইদিনে এই গ্রুপের অপর ম্যাচে বাহরাইন-তুর্কমেনিস্তান ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হওয়ায় এক ম্যাচ হাতে রেখেই (২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট) গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার (সি-গ্রুপ) পাশাপাশি এই আসরের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল বাংলাদেশ।
এখন বলা যায় এই আসরের মূলপর্বে ‘দুই পা’-ই দিয়ে ফেলেছে বাংলার বাঘিনীরা। ফলে আগামী ৫ জুলাই তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে হারলেও কোন ক্ষতি হবে না বাংলাদেশের।

গতকালকের ম্যাচে ১৯ ও ৭২তম মিনিটে গোল দুটি করেন লেফট উইঙ্গার ঋতুপর্ণা। প্রথমটি ফ্রি কিকের শট প্রতিপক্ষের দেয়ালে লেগে ফিরে আসার পর ফিরতি বলে বা পায়ের গড়ানো শটে। দ্বিতীয়টি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়ের কাছ থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের গোলসীমানার বা প্রান্ত দিয়ে বা পায়ের উঁচু বাঁকানো শটে। দুটি গোলেই ছিল বুদ্ধিমত্তার ছাপ। যতই সময় গড়াচ্ছে, ততই যেন পরিণত হচ্ছেন ঋতুপর্ণা।

এ নিয়ে ৩০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১১ গোল করলেন ঋতু। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ম্যাচে জোড়া গোল পেলেন। প্রথমবার ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। তারিখটা ছিল ৪ ডিসেম্বর (ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে)। ঋতুর ১১ গোলের সবচেয়ে বেশি এসেছে সাফে ও ফ্রেন্ডলি ম্যাচে (৪টি করে)। এফসি এশিয়ান কাপে এখন পর্যন্ত তিন গোল করেছেন। গত ২৯ জুন বাহরাইনের বিপক্ষে করেছিলেন প্রথমটি।

জেঠিমা নিলোবানু চাকমা বাংলা সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করতেন। ভারতের কোলকাতার নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তার অন্ধভক্ত তিনি। ২০০৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর যখন তার ভাইয়ের একটি ফুটফুটে মেয়ে হলো, তিনি তখন মায়াকাড়া চেহারার ওই শিশুকন্যার নাম রাখলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। জেঠিমার হয়তো সুপ্ত বাসনা ছিলÑ একদিন তার ভাতিজি নামকরা নায়িকা হবে। সময়ের পরিক্রমায় ঋতুপর্ণা নামকরা হয়েছেন ঠিকই, কিন্ত নায়িকা নয়, ফুটবলার! তাছাড়া ঋতুর নিজেরও নায়িকা হওয়ার কোন বাসনা নেই, ‘সিনেমার জগত আমার একদমই ভাল লাগে না। পছন্দ না আমার। নায়িকা হলে তো এখানে (ফুটবল জগতে) আর থাকতাম না।’

বাবার উৎসাহেই ফুটবল জগতে আসা ঋতুর। যখন খেলা শুরু করেন, তখন ঋতুর এলাকার লোকজন তার ফুটবল খেলা নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতো। এদিকে অভাব-অনটনের সংসার। তবে কৃষক বাবা বরজ বাঁশি চাকমা মেয়েকে সমর্থন-উৎসাহ দিতেন। মেয়েকে ধার করে খেলতে যাবার যাতায়াত ভাড়া এনে দিতেন অনেক কষ্টে। বাবার স্বপ্ন ছিল, মেয়ে একদিন জাতীয় দলে খেলবে। ঠিকই খেলেছে তার মেয়ে। কিন্তু সেটা তিনি দেখে যেতে পারেননি। ২০১৫ সালে মারা যান তিনি। আর ২০২২ সালে ছোটভাই পার্বণ চাকমা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুঃখজনকভাবে মারা যান। সেই দুঃখ এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন ঋতু।

মাত্র ৯ বয়সেই মঘাছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে ঋতু খেলেছিলেন বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল। সেবার তার স্কুল রানার্সআপ হয়েছিল। এর পরের দু’বছরও খেলেন। ২০১৩ আসরে তার স্কুল হয়েছিল তৃতীয়। ভাল খেলার সুবাদে ২০১৭ সালে জাতীয় অনুর্ধ-১৫ দলে ডাক পান। এরপর অ-১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ দলেও খেলেন। তারপরেই খেলার সুযোগ পান সিনিয়র বা জাতীয় দলে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ঋতুর স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা। সেই লক্ষ্য দু’বার পূরণ করেছেন। এবারের লক্ষ্যটা আরও বড়-প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলা, অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া। সেই লক্ষ্যপূরণও হয়ে গেল ঋতুর।