রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচনায়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম ঘোষণা হতে পারে। আর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর পদ থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক সপ্তাহে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে।
তবে এখনো রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। গত ১ আগস্ট দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। ফলে এখন অপেক্ষা শীর্ষ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের।
এদিকে, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় থাকার মধ্যেই মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। তাকে শুভেচ্ছা জানাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আসেন বেশ কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানানোর চেষ্টা করেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে মির্জা ফখরুলকে খুব একটা উৎসাহী দেখা যায়নি। শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে হোক, তারপর।’
এরপরও তিনি উপস্থিত সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ে অফিস করার পর বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে যান তিনি। সেখানেও সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতি ছিল।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে আজ অথবা আগামীকালই তার শেষ কর্মদিবস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কিছু দায়িত্ব পালনের সুযোগ তার থাকতে পারে। আগামী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে তার মন্ত্রিসভা ও দলের সাংগঠনিক দায়িত্বে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, এখন রাজনৈতিক মহলের নজর সেদিকেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েক দিন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানের নাম নিয়েও দলের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানের ওপর দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও মির্জা ফখরুলের নামই বেশি আলোচিত।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দল ও স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
দলের ভেতরে মির্জা ফখরুলের নাম গুরুত্ব পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা বলা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে এক দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিতির পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
দলের নেতাকর্মীদের মতে, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির নানা প্রতিকূল সময়ে তিনি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। পরে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সজ্জন ও তুলনামূলক সংযত রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও দলের বাইরে তার একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়া মির্জা ফখরুল ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর থেকে দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে নিজের সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে মির্জা ফখরুল এখনো সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে এই মুহূর্তে কিছু বলার নেই। ১৩ আগস্টের পর দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। লুকোচুরির কিছু নেই। দলের সর্বোচ্চ ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, মনোনয়ন ফরম তোলার ক্ষেত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতির বিষয় নেই; স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে অতিউৎসাহী হয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট। ওই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার জাতীয় সংসদের সদস্যরা। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই পদ্ধতি চালু হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের বিধান থাকায় কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন থাকে না।
এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ কার্যত খুবই সীমিত।
সব মিলিয়ে, বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা হলে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই তার মন্ত্রিসভার দায়িত্ব ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মহাসচিব পদটিতেও পরিবর্তনের আলোচনা নতুন করে সামনে আসবে।