* প্রশস্ত সড়কে সরু ব্রিজ, নেই নজরদারি * বেপরোয়া-দ্রুতগতিতে বাড়ছে দুর্ঘটনা * ১৯ মাসে ৭৪৫ দুর্ঘটনায় ৪৭৯ প্রাণহানি

ফরিদপুর মহাসড়কে মৃত্যুফাঁদ

সবুজ বাংলা রিপোর্ট
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

“ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং একই সড়কে দ্রুত ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল, রাস্তার স্বল্পতা, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতার ফলে প্রতিনিয়তই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা রোধে দায়িত্বশীলদের নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই”  
— প্রবীর কান্তি বালা, সাধারণ সম্পাদক, ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চ

“জনবল সংকট থাকলেও মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে হাইওয়ে পুলিশ। বেপরোয়া যানবাহন ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা”
— মোমতাজুল এহসান আহমেদ হুমায়ুন, পুলিশ সুপার, হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর রিজিয়ন 

 

কিছুতেই থামছে না ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে ফরিদপুরের সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী ছোট-বড় যানবাহন। অনেক সময় পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে, কখনো অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন উল্টে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। গত ১৯ মাসে জেলায় ৭৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪৭৯ জনের, আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ২৩১ জন। মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি ও পুলিশের তৎপরতা থাকলেও বেপরোয়া গতি এবং অবৈধ যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে না আসায় দুর্ঘটনার লাগাম টানা যাচ্ছে না। এর মধ্যে জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হয়ে উঠেছে ভাঙ্গা। সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা বলছেন, হাইওয়ে পুলিশের যথাযথ তদারকির অভাবে এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং একই সড়কে দ্রুত ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল, রাস্তার স্বল্পতা, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতার ফলে প্রতিনিয়তই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। তবে দুর্ঘটনা রোধে দায়িত্বশীলদের নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই। এদিকে হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকট থাকলেও মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে হাইওয়ে পুলিশ। বেপরোয়া যানবাহন ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।
  
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর রিজিয়নের ৯৮৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ফরিদপুর মহাসড়ক অংশে রয়েছে ৯টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি। এসব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে মহাসড়কে বেপরোয়া গতির যানবাহন, অবৈধ যান চলাচলসহ নানা অনিয়ম বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমার বদলে দিন দিন বাড়ছে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণবঙ্গগামী মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়েছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো অবৈধ থ্রি-হুইলার ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় একদিকে যেমন ঝরছে প্রাণ, অন্যদিকে যানবাহন নষ্টসহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত মোট ১৯ মাসে ফরিদপুরে বিভিন্ন মহাসড়কে ৭৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭৯ জন। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ২৩১ জন। এ সব দুর্ঘটনার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৭১টি। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ২২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯১ জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১৬০, মহিলা ২৪, শিশু ৭। জখম হয়েছেন ৩৯৩ জন। আর এসব দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪৯টি।

ভাঙ্গা সদরের বাসিন্দা মো. আব্দুল মান্নান মাতুব্বর বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর ভাঙ্গা এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করা হলেও বেশ কয়েকটি ব্রিজ সরু রয়েছে, ফলে ব্রিজগুলোর ওপর দিয়ে দ্রুতগামী যানবাহনগুলো চলাচলের সময় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়া ভাঙ্গা হাইওয়ে ও এক্সপ্রেসওয়েতে দ্রুতগামী বিভিন্ন যানবাহন, বিশেষ করে নিয়ম না মেনে বেপরোয়া গতীর মোটরসাইকেলের কারণে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। ফরিদপুরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্ঘটনা ঘটে ভাঙ্গায়।
পরিবহন চালক আজাহার শেখ বলেন, সড়কের ত্রুটি ও দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর কারণে অনেক সময় চালকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এর সঙ্গে ছোট যানবাহনের এলোমেলো ও বেপরোয়া চলাচলের কারনে দুর্ঘটনার ঘটে। আরেক বাস চালক আফছার উদ্দিন বলেন, অনেক সময় গাড়ি আছে কিনা, তা না দেখেই পথচারীরা রাস্তা পার হন। ছোট যানবাহনও নিয়ম না মেনে চলাচল করে। দুর্ঘটনা ঘটলে বেশিরভাগ সময় সব দায় চালকের ওপর চাপানো হয়।

ফরিদপুর জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেলিমুজ্জামান রুকু বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অসাবধানতা ও ক্লান্তি, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং মহাসড়কে ধীরগতির ও ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি পথচারীদের অসচেতনতা, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা ও হাটবাজারও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
ফরিদপুরের মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী শিপ্রা গোস্বামী বলেন, চালকের ক্লান্তি ও অসুস্থতা সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ হতে পারে। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পর চালকের মনোযোগ কমে যায় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা ঘটতে পারে।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে চালকের অসাবধানতা, অদক্ষতা, লাইসেন্সবিহীন চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের স্বল্পতা ও অপ্রশস্ততা, পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো এবং ওভারটেকিংয়ের মতো কারণ রয়েছে। লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, রাস্তার স্বল্পতা, বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতার কারনে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে জানান নাগরিক নেতারা।

ফরিদপুর জেলা বাস মালিক সমিতির নেতা মো. মুরাদ হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না। যাত্রী ও পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, মহাসড়কের পাশে দোকানপাট, স্কুল বা জনবসতি থাকলে অনেক সময় শিশু ও বয়স্করা হঠাৎ রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া ধীরগতির নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদেরও মহাসড়কে চলাচলের নিয়ম মানতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর রিজিয়নের ফরিদপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মোমতাজুল এহসান আহমেদ হুমায়ুন বলেন, মহাসড়গুলোতে চলাচলকারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন হাইওয়ে পুলিশের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। বেপরোয়া বা আইন অমান্য করে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বেপরোয়া বা আইন অমান্য করে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জনবল সংকট থাকলেও মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। বেপরোয়া যানবাহন ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL