০৭:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীর দখলে পাটুরিয়া ফেরিঘাট

Oplus_131072

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। এসব জেলার মানুষের চলাচলের সুবিধার্তে ২০০২ সালে আরিচা থেকে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট স্থানান্তর করে সরকার। ফেরিঘাট সম্প্রসারণ ও যানবাহনের চাপ সামাল দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ৫টি ঘাট নির্মাণ করা হয় পাটুরিয়াতে। কিন্তু ঘাট নির্মাণের পরপরই ১ ও ২ নম্বর ঘাট চলে যায় স্থানীয় প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ১ ও ২নং ঘাটের জায়গা জুড়ে বিশালাকার বালুর স্তূপ। দখল করে রাখা হয়েছে নদী বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দিনের বেলায় ট্রাক-ট্রলারে চলে বালুর লেনদেন, সেইসাথে চলে দিনরাত বালু পরিবহন। এর ফলে ঘাট এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে। সড়কের পাশে বালু পড়ে থাকায় ধুলোবালিতে নাজেহাল যাত্রী, চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি (২৫ জুন) নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন পাটুরিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে স্পষ্ট নির্দেশনা দেন—ঘাট এলাকা দখলমুক্ত করে ফেরি ও যান চলাচলের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে সেই নির্দেশের তিন সপ্তাহ পার হলেও এখনো কার্যকর হয়নি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মদদে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ঘাট দখল করে প্রকাশ্যে বালু ব্যবসা করে যাচ্ছে। এদিকে, সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা বালু ও ট্রাকের চলাচলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন চালক ও যাত্রীরা। ধুলোবালিতে পথচলা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের।
আনোয়ারুল হক নামের এক পথচারী জানান, ‘এই পথ দিয়ে আমাদের চলাচল করা এখন অনেক কষ্টকর হয়ে গেছে। দিনরাতের অধিকাংশ সময়ই এই পথ দিয়ে বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে। এবং ঘাট এলাকায় বালুর ট্রাকসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদিও রয়েছে। ঝড়ের দিনে বালু উড়ায় খুব সমস্যা।
স্থানীয় রহমান শেখ বলেন, ‘তিন সপ্তাহ আগে পাটুরিয়া ঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি সাতদিনের মধ্যে ঘাট এলাকা থেকে বালু ব্যবসা অপসারণের নির্দেশ দেন। তার কয়েকদিন পর ঘাট এলাকা থেকে বালু ব্যবসা সড়িয়ে নিতে মাইকিং করে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখনো বালু ব্যবসা চলমান রয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘পাটুরিয়ার ৫টির মধ্যে ২টি ঘাটই প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে, বন্ধ রয়েছে ফেরিঘাটের কার্যক্রম। সড়কের পাশে বালু স্তূপ করে রাখায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চালক-যাত্রী ও স্থানীয়দের। বিআইডব্লিউটিএ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আরিফ কাজী, রাসেল মোল্লাসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘাট দখল করে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেন বালু ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, তারা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কাজী আরিফুর রহমান নামে এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা কোনো সরকারি জায়গায় বালু ব্যবসা করছি না। আমরা যেসব জায়গায় বালু ব্যবসা করছি সেগুলো ব্যক্তিমালিকানা জমি। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেছি আমরা।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের আরিচা নদীবন্দরের উপপরিচালক মো. সেলিম শেখ বলেন, ‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মহোদয় ঘাট এলাকা পরিদর্শন করার পর আমাদেরকে ঘাট এলাকা থেকে দ্রুত বালু ব্যবসা সরানোর নির্দেশ দেন। এদিকে, আমাদের কোন ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই। যার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক, ইউএও বরাবর চিঠি দিয়েছি। আশা করছি দ্রুতই তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন।’
এদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন বিআইডব্লিউটিএ চাইলে ভ্ৰাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নেয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা। ইউএনও মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকার জমি বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব মালিকানাধীন হওয়ায় আমরা চাইলে সেখানে এককভাবে কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। যদি বিআইডব্লিউটিএ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও লিখিত অনুরোধ জানায়, তাহলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ঘাট এলাকা জনগণের সম্পদ—এখানে কেউ প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসা চালাতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে, প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।’
ঘাট এলাকার দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ বালু ব্যবসা উচ্ছেদ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী স্থানীয়দের।
এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীর দখলে পাটুরিয়া ফেরিঘাট

আপডেট সময় : ০৫:৩৭:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। এসব জেলার মানুষের চলাচলের সুবিধার্তে ২০০২ সালে আরিচা থেকে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট স্থানান্তর করে সরকার। ফেরিঘাট সম্প্রসারণ ও যানবাহনের চাপ সামাল দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ৫টি ঘাট নির্মাণ করা হয় পাটুরিয়াতে। কিন্তু ঘাট নির্মাণের পরপরই ১ ও ২ নম্বর ঘাট চলে যায় স্থানীয় প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ১ ও ২নং ঘাটের জায়গা জুড়ে বিশালাকার বালুর স্তূপ। দখল করে রাখা হয়েছে নদী বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দিনের বেলায় ট্রাক-ট্রলারে চলে বালুর লেনদেন, সেইসাথে চলে দিনরাত বালু পরিবহন। এর ফলে ঘাট এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে। সড়কের পাশে বালু পড়ে থাকায় ধুলোবালিতে নাজেহাল যাত্রী, চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি (২৫ জুন) নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন পাটুরিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে স্পষ্ট নির্দেশনা দেন—ঘাট এলাকা দখলমুক্ত করে ফেরি ও যান চলাচলের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে সেই নির্দেশের তিন সপ্তাহ পার হলেও এখনো কার্যকর হয়নি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মদদে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ঘাট দখল করে প্রকাশ্যে বালু ব্যবসা করে যাচ্ছে। এদিকে, সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা বালু ও ট্রাকের চলাচলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন চালক ও যাত্রীরা। ধুলোবালিতে পথচলা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের।
আনোয়ারুল হক নামের এক পথচারী জানান, ‘এই পথ দিয়ে আমাদের চলাচল করা এখন অনেক কষ্টকর হয়ে গেছে। দিনরাতের অধিকাংশ সময়ই এই পথ দিয়ে বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে। এবং ঘাট এলাকায় বালুর ট্রাকসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদিও রয়েছে। ঝড়ের দিনে বালু উড়ায় খুব সমস্যা।
স্থানীয় রহমান শেখ বলেন, ‘তিন সপ্তাহ আগে পাটুরিয়া ঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি সাতদিনের মধ্যে ঘাট এলাকা থেকে বালু ব্যবসা অপসারণের নির্দেশ দেন। তার কয়েকদিন পর ঘাট এলাকা থেকে বালু ব্যবসা সড়িয়ে নিতে মাইকিং করে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখনো বালু ব্যবসা চলমান রয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘পাটুরিয়ার ৫টির মধ্যে ২টি ঘাটই প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে, বন্ধ রয়েছে ফেরিঘাটের কার্যক্রম। সড়কের পাশে বালু স্তূপ করে রাখায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে চালক-যাত্রী ও স্থানীয়দের। বিআইডব্লিউটিএ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আরিফ কাজী, রাসেল মোল্লাসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘাট দখল করে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেন বালু ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, তারা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কাজী আরিফুর রহমান নামে এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা কোনো সরকারি জায়গায় বালু ব্যবসা করছি না। আমরা যেসব জায়গায় বালু ব্যবসা করছি সেগুলো ব্যক্তিমালিকানা জমি। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেছি আমরা।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের আরিচা নদীবন্দরের উপপরিচালক মো. সেলিম শেখ বলেন, ‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মহোদয় ঘাট এলাকা পরিদর্শন করার পর আমাদেরকে ঘাট এলাকা থেকে দ্রুত বালু ব্যবসা সরানোর নির্দেশ দেন। এদিকে, আমাদের কোন ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই। যার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক, ইউএও বরাবর চিঠি দিয়েছি। আশা করছি দ্রুতই তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন।’
এদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন বিআইডব্লিউটিএ চাইলে ভ্ৰাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নেয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা। ইউএনও মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকার জমি বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব মালিকানাধীন হওয়ায় আমরা চাইলে সেখানে এককভাবে কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। যদি বিআইডব্লিউটিএ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও লিখিত অনুরোধ জানায়, তাহলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ঘাট এলাকা জনগণের সম্পদ—এখানে কেউ প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসা চালাতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে, প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।’
ঘাট এলাকার দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ বালু ব্যবসা উচ্ছেদ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী স্থানীয়দের।
এমআর/সবা